নারীদের নিয়ে অশালীন মন্তব্য করলেই ফাঁস করা হচ্ছে পরিচয়

নারীদের নিয়ে অশালীন মন্তব্য করলেই ফাঁস করা হচ্ছে পরিচয়
নিজস্ব প্রতিবেদক

অনলাইনে নারীদের নিয়ে অশালীন মন্তব্য, যৌন হয়রানিকে সমর্থন কিংবা ভুক্তভোগীকে দোষারোপ– এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সরব হয়েছে ‘নো মোর সাইলেন্স’ নামের একটি গ্রুপ।
নারীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা ব্যক্তিদের ছবি, পরিচয় ও ফেসবুক আইডির লিংক প্রকাশ করছে গ্রুপটি। তাদের দাবি, এ পর্যন্ত শতাধিক ব্যক্তির মন্তব্য জনসমক্ষে তুলে ধরা হয়েছে। তবে পরিচয় প্রকাশের আগে তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্বও সামনে এসেছে।
নারীর প্রতি সহিংসতার খবরেও অশালীন মন্তব্য
পৃথিবী থেকে ২৪ ঘণ্টার জন্য সব পুরুষ উধাও হয়ে গেলে কী করবেন– সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন এক প্রশ্নের উত্তরে এক তরুণী বলেছিলেন, তিনি রাত ৩টায় একা হাঁটতে বের হবেন। তার এই উত্তর নারীর নিরাপদে ও স্বাধীনভাবে চলাচলের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে এনেছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার এ মন্তব্য অনেক আলোড়ন তৈরি করেছিল।
কিন্তু বাস্তবে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার পরিবর্তে অনেক সময় ভুক্তভোগীকেই অপমানের শিকার হতে হয়। সম্প্রতি কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানখেতে প্রাণ হারানো ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায়ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন মন্তব্য দেখা গেছে।
এ ধরনের মন্তব্যের বিরুদ্ধে কাজ করছে ‘নো মোর সাইলেন্স’। গ্রুপটির প্রতিষ্ঠাতা আবির আহম্মেদ পিয়াস একজন লেখক ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট। জানা যায়, গত বছরের ২ নভেম্বর যাত্রা শুরু করা গ্রুপটির সদস্যসংখ্যা বর্তমানে ৩০ হাজারের বেশি।
গ্রুপটির দাবি, নারীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা শতাধিক ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে। কিছু ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও মন্তব্যের স্ক্রিনশট পাঠানো হয়েছে।
যেভাবে শুরু
হবিগঞ্জের একটি কনসার্টে নারীদের যৌন হয়রানির ঘটনা থেকে গ্রুপটি গড়ে ওঠে। বৃন্দাবন সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের রজতজয়ন্তী উপলক্ষে জালাল স্টেডিয়ামে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে নারীদের হেনস্তার খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক নারীকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করার ঘটনা নিয়ে অশালীন মন্তব্য করা হয়। মন্তব্যটি দেখে ক্ষুব্ধ হন আবির আহম্মেদ পিয়াস ও তার দুই সহযোগী। তাদের উদ্যোগেই গ্রুপটি চালু হয়।
আবির আহম্মেদ পিয়াসের মতে, অনলাইনে যা খুশি বলা যায় এবং এর কোনো পরিণতি নেই– এমন ধারণা বদলানো প্রয়োজন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি অন্যের মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রতিও দায়িত্বশীল থাকা জরুরি।
আলোচিত ঘটনায় মন্তব্যকারীদের পরিচয় প্রকাশ
কক্সবাজারের একটি হোটেলের শৌচাগারে এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের খবরের নিচে অশালীন মন্তব্য করা ছয় ব্যক্তির ছবি ও পরিচয় প্রকাশ করে গ্রুপটি।
একইভাবে, সাভারে বাসের মধ্যে এক যাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগসংক্রান্ত খবরের নিচে ধর্ষণের পক্ষে মন্তব্য করা ৫ ব্যক্তির পরিচয়ও প্রকাশ করা হয়।
রাজধানীর ইসিবি চত্বরে ফুটপাত দিয়ে মোটরসাইকেল চালানো নিয়ে কনটেন্ট ক্রিয়েটর শারমিন রিয়ার সঙ্গে এক চালকের বাদানুবাদের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে লক্ষ্য করে গালিগালাজ ও অশালীন মন্তব্য করা হয়েছিল। এসব মন্তব্যের কিছু তুলে ধরে মন্তব্যকারীদের ছবি ও আইডির লিংক প্রকাশ করে গ্রুপটি।
ভুল পরিচয় প্রকাশের ঝুঁকিও রয়েছে
অনলাইনে অশালীন মন্তব্যের বিরুদ্ধে উদ্যোগটির পাশাপাশি পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কুমিল্লার কিশোরীর হত্যার বিচার চেয়ে তার মায়ের বক্তব্যসংবলিত একটি সংবাদে অশালীন মন্তব্য করা এক ব্যক্তি নিজেকে রাজধানীর সানরাইজ প্লাজার বিশ্বরঙ শোরুমের বিক্রয়কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু গ্রুপে তার পরিচয় প্রকাশের পর বিশ্বরঙ এক বিবৃতিতে জানায়, ওই নামে তাদের কোনো কর্মী নেই।
এ ঘটনা দেখায়, যথাযথ যাচাই ছাড়া পরিচয় প্রকাশ করলে নির্দোষ ব্যক্তিও সামাজিক ও পেশাগত ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। ভুয়া অ্যাকাউন্ট কিংবা অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে মন্তব্য করার সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
অনলাইনে হয়রানি ঠেকাতে কী বলছে আইন?
নারীকে অপমান করা, যৌন হয়রানি করা কিংবা ছবি বিকৃত করে নিপীড়নমূলক উপাদান তৈরি ও প্রচারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আইনে বিভিন্ন অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে।
দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারায় কোনো নারীর শালীনতা বা মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে শব্দ, অঙ্গভঙ্গি বা কোনো কিছু প্রদর্শনের মাধ্যমে অপমান করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এ ধারায় এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর ২৫ ধারায় ডিজিটাল মাধ্যমে ব্ল্যাকমেলিং, যৌন হয়রানি, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি, ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়নসংক্রান্ত উপাদান বা সেক্সটর্শনের উদ্দেশ্যে ক্ষতিকর বা ভীতিপ্রদ উপাদান প্রকাশের বিষয়ে শাস্তির বিধান আছে। এ ধারায় নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত হলে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
প্রতিবাদ যেমন জরুরি, দায়িত্বশীলতাও তেমন
নারীদের লক্ষ্য করে অশালীন মন্তব্যের বিরুদ্ধে ‘নো মোর সাইলেন্স’-এর মতো উদ্যোগ অনলাইনে জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে ধর্ষণ, হত্যা কিংবা যৌন হয়রানির মতো গুরুতর ঘটনার খবরেও ভুক্তভোগীকে অপমান করার প্রবণতা কেন দেখা যায়, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নারীর নিরাপত্তা শুধু রাস্তাঘাটে চলাচলের প্রশ্ন নয়; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় প্রতিবাদ, সচেতনতা, আইন প্রয়োগ এবং দায়িত্বশীল অনলাইন আচরণ সবকিছুরই প্রয়োজন রয়েছে।

অনলাইনে নারীদের নিয়ে অশালীন মন্তব্য, যৌন হয়রানিকে সমর্থন কিংবা ভুক্তভোগীকে দোষারোপ– এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সরব হয়েছে ‘নো মোর সাইলেন্স’ নামের একটি গ্রুপ।
নারীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা ব্যক্তিদের ছবি, পরিচয় ও ফেসবুক আইডির লিংক প্রকাশ করছে গ্রুপটি। তাদের দাবি, এ পর্যন্ত শতাধিক ব্যক্তির মন্তব্য জনসমক্ষে তুলে ধরা হয়েছে। তবে পরিচয় প্রকাশের আগে তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্বও সামনে এসেছে।
নারীর প্রতি সহিংসতার খবরেও অশালীন মন্তব্য
পৃথিবী থেকে ২৪ ঘণ্টার জন্য সব পুরুষ উধাও হয়ে গেলে কী করবেন– সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন এক প্রশ্নের উত্তরে এক তরুণী বলেছিলেন, তিনি রাত ৩টায় একা হাঁটতে বের হবেন। তার এই উত্তর নারীর নিরাপদে ও স্বাধীনভাবে চলাচলের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে এনেছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার এ মন্তব্য অনেক আলোড়ন তৈরি করেছিল।
কিন্তু বাস্তবে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার পরিবর্তে অনেক সময় ভুক্তভোগীকেই অপমানের শিকার হতে হয়। সম্প্রতি কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানখেতে প্রাণ হারানো ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায়ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন মন্তব্য দেখা গেছে।
এ ধরনের মন্তব্যের বিরুদ্ধে কাজ করছে ‘নো মোর সাইলেন্স’। গ্রুপটির প্রতিষ্ঠাতা আবির আহম্মেদ পিয়াস একজন লেখক ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট। জানা যায়, গত বছরের ২ নভেম্বর যাত্রা শুরু করা গ্রুপটির সদস্যসংখ্যা বর্তমানে ৩০ হাজারের বেশি।
গ্রুপটির দাবি, নারীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা শতাধিক ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে। কিছু ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও মন্তব্যের স্ক্রিনশট পাঠানো হয়েছে।
যেভাবে শুরু
হবিগঞ্জের একটি কনসার্টে নারীদের যৌন হয়রানির ঘটনা থেকে গ্রুপটি গড়ে ওঠে। বৃন্দাবন সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের রজতজয়ন্তী উপলক্ষে জালাল স্টেডিয়ামে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে নারীদের হেনস্তার খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক নারীকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করার ঘটনা নিয়ে অশালীন মন্তব্য করা হয়। মন্তব্যটি দেখে ক্ষুব্ধ হন আবির আহম্মেদ পিয়াস ও তার দুই সহযোগী। তাদের উদ্যোগেই গ্রুপটি চালু হয়।
আবির আহম্মেদ পিয়াসের মতে, অনলাইনে যা খুশি বলা যায় এবং এর কোনো পরিণতি নেই– এমন ধারণা বদলানো প্রয়োজন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি অন্যের মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রতিও দায়িত্বশীল থাকা জরুরি।
আলোচিত ঘটনায় মন্তব্যকারীদের পরিচয় প্রকাশ
কক্সবাজারের একটি হোটেলের শৌচাগারে এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের খবরের নিচে অশালীন মন্তব্য করা ছয় ব্যক্তির ছবি ও পরিচয় প্রকাশ করে গ্রুপটি।
একইভাবে, সাভারে বাসের মধ্যে এক যাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগসংক্রান্ত খবরের নিচে ধর্ষণের পক্ষে মন্তব্য করা ৫ ব্যক্তির পরিচয়ও প্রকাশ করা হয়।
রাজধানীর ইসিবি চত্বরে ফুটপাত দিয়ে মোটরসাইকেল চালানো নিয়ে কনটেন্ট ক্রিয়েটর শারমিন রিয়ার সঙ্গে এক চালকের বাদানুবাদের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে লক্ষ্য করে গালিগালাজ ও অশালীন মন্তব্য করা হয়েছিল। এসব মন্তব্যের কিছু তুলে ধরে মন্তব্যকারীদের ছবি ও আইডির লিংক প্রকাশ করে গ্রুপটি।
ভুল পরিচয় প্রকাশের ঝুঁকিও রয়েছে
অনলাইনে অশালীন মন্তব্যের বিরুদ্ধে উদ্যোগটির পাশাপাশি পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কুমিল্লার কিশোরীর হত্যার বিচার চেয়ে তার মায়ের বক্তব্যসংবলিত একটি সংবাদে অশালীন মন্তব্য করা এক ব্যক্তি নিজেকে রাজধানীর সানরাইজ প্লাজার বিশ্বরঙ শোরুমের বিক্রয়কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু গ্রুপে তার পরিচয় প্রকাশের পর বিশ্বরঙ এক বিবৃতিতে জানায়, ওই নামে তাদের কোনো কর্মী নেই।
এ ঘটনা দেখায়, যথাযথ যাচাই ছাড়া পরিচয় প্রকাশ করলে নির্দোষ ব্যক্তিও সামাজিক ও পেশাগত ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। ভুয়া অ্যাকাউন্ট কিংবা অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে মন্তব্য করার সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
অনলাইনে হয়রানি ঠেকাতে কী বলছে আইন?
নারীকে অপমান করা, যৌন হয়রানি করা কিংবা ছবি বিকৃত করে নিপীড়নমূলক উপাদান তৈরি ও প্রচারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আইনে বিভিন্ন অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে।
দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারায় কোনো নারীর শালীনতা বা মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে শব্দ, অঙ্গভঙ্গি বা কোনো কিছু প্রদর্শনের মাধ্যমে অপমান করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এ ধারায় এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর ২৫ ধারায় ডিজিটাল মাধ্যমে ব্ল্যাকমেলিং, যৌন হয়রানি, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি, ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়নসংক্রান্ত উপাদান বা সেক্সটর্শনের উদ্দেশ্যে ক্ষতিকর বা ভীতিপ্রদ উপাদান প্রকাশের বিষয়ে শাস্তির বিধান আছে। এ ধারায় নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত হলে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
প্রতিবাদ যেমন জরুরি, দায়িত্বশীলতাও তেমন
নারীদের লক্ষ্য করে অশালীন মন্তব্যের বিরুদ্ধে ‘নো মোর সাইলেন্স’-এর মতো উদ্যোগ অনলাইনে জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে ধর্ষণ, হত্যা কিংবা যৌন হয়রানির মতো গুরুতর ঘটনার খবরেও ভুক্তভোগীকে অপমান করার প্রবণতা কেন দেখা যায়, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নারীর নিরাপত্তা শুধু রাস্তাঘাটে চলাচলের প্রশ্ন নয়; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় প্রতিবাদ, সচেতনতা, আইন প্রয়োগ এবং দায়িত্বশীল অনলাইন আচরণ সবকিছুরই প্রয়োজন রয়েছে।

নারীদের নিয়ে অশালীন মন্তব্য করলেই ফাঁস করা হচ্ছে পরিচয়
নিজস্ব প্রতিবেদক

অনলাইনে নারীদের নিয়ে অশালীন মন্তব্য, যৌন হয়রানিকে সমর্থন কিংবা ভুক্তভোগীকে দোষারোপ– এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সরব হয়েছে ‘নো মোর সাইলেন্স’ নামের একটি গ্রুপ।
নারীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা ব্যক্তিদের ছবি, পরিচয় ও ফেসবুক আইডির লিংক প্রকাশ করছে গ্রুপটি। তাদের দাবি, এ পর্যন্ত শতাধিক ব্যক্তির মন্তব্য জনসমক্ষে তুলে ধরা হয়েছে। তবে পরিচয় প্রকাশের আগে তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্বও সামনে এসেছে।
নারীর প্রতি সহিংসতার খবরেও অশালীন মন্তব্য
পৃথিবী থেকে ২৪ ঘণ্টার জন্য সব পুরুষ উধাও হয়ে গেলে কী করবেন– সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন এক প্রশ্নের উত্তরে এক তরুণী বলেছিলেন, তিনি রাত ৩টায় একা হাঁটতে বের হবেন। তার এই উত্তর নারীর নিরাপদে ও স্বাধীনভাবে চলাচলের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে এনেছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার এ মন্তব্য অনেক আলোড়ন তৈরি করেছিল।
কিন্তু বাস্তবে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার পরিবর্তে অনেক সময় ভুক্তভোগীকেই অপমানের শিকার হতে হয়। সম্প্রতি কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানখেতে প্রাণ হারানো ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায়ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন মন্তব্য দেখা গেছে।
এ ধরনের মন্তব্যের বিরুদ্ধে কাজ করছে ‘নো মোর সাইলেন্স’। গ্রুপটির প্রতিষ্ঠাতা আবির আহম্মেদ পিয়াস একজন লেখক ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট। জানা যায়, গত বছরের ২ নভেম্বর যাত্রা শুরু করা গ্রুপটির সদস্যসংখ্যা বর্তমানে ৩০ হাজারের বেশি।
গ্রুপটির দাবি, নারীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা শতাধিক ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে। কিছু ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও মন্তব্যের স্ক্রিনশট পাঠানো হয়েছে।
যেভাবে শুরু
হবিগঞ্জের একটি কনসার্টে নারীদের যৌন হয়রানির ঘটনা থেকে গ্রুপটি গড়ে ওঠে। বৃন্দাবন সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের রজতজয়ন্তী উপলক্ষে জালাল স্টেডিয়ামে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে নারীদের হেনস্তার খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক নারীকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করার ঘটনা নিয়ে অশালীন মন্তব্য করা হয়। মন্তব্যটি দেখে ক্ষুব্ধ হন আবির আহম্মেদ পিয়াস ও তার দুই সহযোগী। তাদের উদ্যোগেই গ্রুপটি চালু হয়।
আবির আহম্মেদ পিয়াসের মতে, অনলাইনে যা খুশি বলা যায় এবং এর কোনো পরিণতি নেই– এমন ধারণা বদলানো প্রয়োজন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি অন্যের মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রতিও দায়িত্বশীল থাকা জরুরি।
আলোচিত ঘটনায় মন্তব্যকারীদের পরিচয় প্রকাশ
কক্সবাজারের একটি হোটেলের শৌচাগারে এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের খবরের নিচে অশালীন মন্তব্য করা ছয় ব্যক্তির ছবি ও পরিচয় প্রকাশ করে গ্রুপটি।
একইভাবে, সাভারে বাসের মধ্যে এক যাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগসংক্রান্ত খবরের নিচে ধর্ষণের পক্ষে মন্তব্য করা ৫ ব্যক্তির পরিচয়ও প্রকাশ করা হয়।
রাজধানীর ইসিবি চত্বরে ফুটপাত দিয়ে মোটরসাইকেল চালানো নিয়ে কনটেন্ট ক্রিয়েটর শারমিন রিয়ার সঙ্গে এক চালকের বাদানুবাদের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে লক্ষ্য করে গালিগালাজ ও অশালীন মন্তব্য করা হয়েছিল। এসব মন্তব্যের কিছু তুলে ধরে মন্তব্যকারীদের ছবি ও আইডির লিংক প্রকাশ করে গ্রুপটি।
ভুল পরিচয় প্রকাশের ঝুঁকিও রয়েছে
অনলাইনে অশালীন মন্তব্যের বিরুদ্ধে উদ্যোগটির পাশাপাশি পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কুমিল্লার কিশোরীর হত্যার বিচার চেয়ে তার মায়ের বক্তব্যসংবলিত একটি সংবাদে অশালীন মন্তব্য করা এক ব্যক্তি নিজেকে রাজধানীর সানরাইজ প্লাজার বিশ্বরঙ শোরুমের বিক্রয়কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু গ্রুপে তার পরিচয় প্রকাশের পর বিশ্বরঙ এক বিবৃতিতে জানায়, ওই নামে তাদের কোনো কর্মী নেই।
এ ঘটনা দেখায়, যথাযথ যাচাই ছাড়া পরিচয় প্রকাশ করলে নির্দোষ ব্যক্তিও সামাজিক ও পেশাগত ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। ভুয়া অ্যাকাউন্ট কিংবা অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে মন্তব্য করার সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
অনলাইনে হয়রানি ঠেকাতে কী বলছে আইন?
নারীকে অপমান করা, যৌন হয়রানি করা কিংবা ছবি বিকৃত করে নিপীড়নমূলক উপাদান তৈরি ও প্রচারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আইনে বিভিন্ন অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে।
দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারায় কোনো নারীর শালীনতা বা মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে শব্দ, অঙ্গভঙ্গি বা কোনো কিছু প্রদর্শনের মাধ্যমে অপমান করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এ ধারায় এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর ২৫ ধারায় ডিজিটাল মাধ্যমে ব্ল্যাকমেলিং, যৌন হয়রানি, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি, ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়নসংক্রান্ত উপাদান বা সেক্সটর্শনের উদ্দেশ্যে ক্ষতিকর বা ভীতিপ্রদ উপাদান প্রকাশের বিষয়ে শাস্তির বিধান আছে। এ ধারায় নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত হলে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
প্রতিবাদ যেমন জরুরি, দায়িত্বশীলতাও তেমন
নারীদের লক্ষ্য করে অশালীন মন্তব্যের বিরুদ্ধে ‘নো মোর সাইলেন্স’-এর মতো উদ্যোগ অনলাইনে জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে ধর্ষণ, হত্যা কিংবা যৌন হয়রানির মতো গুরুতর ঘটনার খবরেও ভুক্তভোগীকে অপমান করার প্রবণতা কেন দেখা যায়, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নারীর নিরাপত্তা শুধু রাস্তাঘাটে চলাচলের প্রশ্ন নয়; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় প্রতিবাদ, সচেতনতা, আইন প্রয়োগ এবং দায়িত্বশীল অনলাইন আচরণ সবকিছুরই প্রয়োজন রয়েছে।

বাঁচার জন্য কয়েকটি ধানক্ষেতে দৌড়েছিল তাজমিন







