সাত মাসে ৬৪১ নারী-শিশু ধর্ষণের শিকার: আসক

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
সাত মাসে ৬৪১ নারী-শিশু ধর্ষণের শিকার: আসক
নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় অংশীজনদের নিয়ে আসকের সংলাপ অনুষ্ঠিত

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত দেশে ৬৪১টি নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার ও সেবা প্রদান জোরদারকরণ বিষয়ক অংশীজনদের নিয়ে আয়োজিত সংলাপে এতথ্য জানিয়েছে সংস্থাটি।

সংলাপে অংশ নেওয়া অংশীজনেরা বলেন, নারী ও শিশু সুরক্ষায় দেশে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সেবা এবং সহায়তা ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সেগুলোর মধ্যে সমন্বয়, সহজে সেবা পাওয়ার সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে গ্রাম ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ আইনগত সহায়তা ও সুরক্ষা সেবা সম্পর্কে কম জানেন। ফলে প্রয়োজনের সময় অনেকেই এসব সেবা নিতে পারছেন না।

আসকের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত দেশে ৪০০ টি নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ধর্ষণের পর হত্যা ৩৭ এবং ধর্ষণচেষ্টার ১৫২টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ৬০৬টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৪১টি ধর্ষণ এবং ২১৩টি শিশু হত্যার ঘটনা রয়েছে। নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তের ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে ১৯১ টি। মানব পাচারের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।

তিনি বলেন, নারী, শিশু ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য আইনগত সহায়তা, চিকিৎসা, মনোসামাজিক সহায়তা, আশ্রয়, পুনর্বাসনসহ বিভিন্ন সেবা চালু রয়েছে। তবে এসব সেবা অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হওয়ায় ভুক্তভোগীদের এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। ফলে প্রয়োজনীয় সেবা পেতে সময় ও অর্থ দুটিই ব্যয় হয়।

জাতীয় আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যের বরাত দিয়ে সংলাপে জানানো হয়, ২০০৯ সাল থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত মোট ১৮ লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৯ জন সংস্থাটির আইনগত সহায়তা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে উপকৃত হয়েছেন। এর মধ্যে ৩১ হাজার ২২২ জন সুপ্রিম কোর্ট আইনগত সহায়তা কার্যালয়ের মাধ্যমে এবং ১৩ লাখ ৩৩ হাজার ৭৭৭ জন দেশের ৬৪টি জেলা আইনগত সহায়তা কার্যালয়ের মাধ্যমে সেবা পেয়েছেন।

সংলাপের নিবন্ধে জানানো হয়, আইনগত সহায়তা পাওয়ার জন্য আবেদন প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে জটিল ও সময়সাপেক্ষ। আবেদনকারীদের একাধিক অনুমোদনের ধাপ অতিক্রম করতে হয়। সরকারি পর্যায়ে অনুমোদনকারী কমিটি নিয়মিত সভা না করায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবেদন নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়। আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে আপিলের ব্যবস্থাও অনেকের জন্য জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। বিশেষ করে অসচ্ছল বিচারপ্রার্থীদের পক্ষে এই ব্যয় বহন করা কঠিন। অনলাইন আবেদন ও হেল্পলাইন চালু থাকলেও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেটের সীমিত সুযোগ এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতার ঘাটতির কারণে ডিজিটাল আইনগত সহায়তার ব্যবহার এখনো কম।

এতে বলা হয়, গ্রামাঞ্চলে সরকারি প্রচার-প্রচারণাও শহরের তুলনায় কম। ফলে বিনা মূল্যে আইনগত পরামর্শ, আইনজীবী নিয়োগ, মামলা পরিচালনা ও আদালতভিত্তিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ সম্পর্কে অনেক মানুষ জানেন না। জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য দেশে ৯৫টি ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) ও সেল থাকলেও প্রতিটি কেন্দ্রে চিকিৎসা, ফরেনসিক, আইনগত সহায়তা, মনোসামাজিক সহায়তা ও পুনর্বাসনসহ সমন্বিত সেবা নিশ্চিত করা যায়নি। অনেক কেন্দ্রে ২৪ ঘণ্টা সেবা, নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক ল্যাব এবং পৃথক কাউন্সেলিংয়ের স্থানও পর্যাপ্ত নয়।

সংলাপে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জিএফএ কনসালটিং গ্রুপের নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড প্রকল্পের ডেপুটি টিম লিডার ক্যাটরিনা কইনিগ, উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার লিজা বেগম, মহিলা ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তরের আইন কর্মকর্তা (যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ) আইভি আক্তার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসির কো–অর্ডিনেটর ডা. তাইয়েবা সুলতানা, নারীপক্ষের প্রোগ্রাম ম্যানেজার কামরুন্নাহার প্রমুখ অংশ নেন ।

/এসবি/