চুম্বকত্বের তৃতীয় রূপ খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
চুম্বকত্বের তৃতীয় রূপ খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা

চুম্বকত্বের প্রচলিত ধারণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে বিজ্ঞানীরা। চুম্বকত্বের তৃতীয় রূপ হিসেবে পরিচিত ‘অলটারম্যাগনেটিজম’-এর পরীক্ষামূলক প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকরা।

সম্প্রতি ‘নেচার কমিউনিকেশনস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় কোবাল্ট, ট্যানটালাম ও সেলেনিয়াম দিয়ে তৈরি বিশেষ এক ধরনের পদার্থে এই বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীদের আশা, ভবিষ্যতে এই আবিষ্কার কম বিদ্যুৎ খরচে আরও দ্রুতগতির ইলেকট্রনিক যন্ত্র তৈরিতে সাহায্য করবে।

চুম্বকত্বের দুটি পরিচিত ধরন রয়েছে। প্রথমটি ফেরোম্যাগনেটিজম। এ ধরনের চুম্বক শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে। তবে এই ক্ষেত্র আশপাশের সংবেদনশীল ইলেকট্রনিক যন্ত্রের কাজে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। দ্বিতীয়টি অ্যান্টিফেরোম্যাগনেটিজম। এতে পদার্থের ভেতরের ক্ষুদ্র চৌম্বকীয় দিকগুলো বিপরীতমুখীভাবে সাজানো থাকে। ফলে বাইরে উল্লেখযোগ্য চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয় না। এতে ইলেকট্রনিক যন্ত্রে চৌম্বকীয় বিঘ্ন কমানোর সুবিধা পাওয়া যায়। তবে ইলেকট্রনের স্পিন কাজে লাগিয়ে তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

এই দুই ধরনের চুম্বকত্বের সুবিধা একসঙ্গে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে অলটারম্যাগনেটিজম। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইলেকট্রনের ‘স্পিন’। স্পিন হলো ইলেকট্রনের একটি মৌলিক কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্য, যা চৌম্বকীয় আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে ইলেকট্রনিক যন্ত্রে তথ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ করা সম্ভব।

অলটারম্যাগনেটের বিশেষত্ব হলো, এতে বাইরে উল্লেখযোগ্য চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি না করেও ইলেকট্রনের স্পিনের পার্থক্য কাজে লাগানো যায়। ফলে একদিকে যেমন আশপাশের যন্ত্রে চৌম্বকীয় বিঘ্ন কমানোর সুযোগ রয়েছে, তেমনি ইলেকট্রনের স্পিন ব্যবহার করে তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সম্ভাবনাও তৈরি হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক মাধব নেউপানের নেতৃত্বে গবেষক দলটি কোবাল্ট, ট্যানটালাম ও সেলেনিয়ামের সমন্বয়ে বিশেষ স্তরযুক্ত একটি স্ফটিক তৈরি করেন। উপাদানটি প্রস্তুত করতে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে ৯০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এরপর গবেষকরা কম্পিউটারভিত্তিক কোয়ান্টাম মডেলিং এবং এআরপিইএস নামের একটি উন্নত পরীক্ষাপদ্ধতি ব্যবহার করে পদার্থটির বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করেন। এআরপিইএসের সাহায্যে আলো প্রয়োগের মাধ্যমে পদার্থের ভেতরের ইলেকট্রনের শক্তি ও আচরণ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। এসব বিশ্লেষণ অলটারম্যাগনেটিজমের উপস্থিতির পরীক্ষামূলক প্রমাণ দিতে সহায়তা করে।

গবেষণাটির প্রধান লেখক ও পরীক্ষামূলক কোয়ান্টাম পদার্থবিদ মিলো স্প্রাগ বলেন, এই আবিষ্কার ইলেকট্রনের স্পিন ব্যবহার করে নতুন ধরনের প্রযুক্তি তৈরির গবেষণায় সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। ভবিষ্যতে অলটারম্যাগনেটিজম কাজে লাগিয়ে আরও দ্রুতগতির মেমোরি, উন্নত স্পিনট্রনিকস যন্ত্র, টেরাহার্জ প্রযুক্তি এবং কম বিদ্যুৎ খরচে বেশি কাজ করতে সক্ষম ইলেকট্রনিক ডিভাইস তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি বলেন, স্পিনট্রনিকস হলো এমন প্রযুক্তি, যেখানে ইলেকট্রনের বৈদ্যুতিক চার্জের পাশাপাশি তার স্পিনও কাজে লাগানো হয়। তবে এই আবিষ্কারের সুফল সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত প্রযুক্তিতে পৌঁছাতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। নতুন উপাদানটি বাস্তবে কতটা কার্যকর ও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য হবে, তা সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হবে। তারপরও অলটারম্যাগনেটিজমের পরীক্ষামূলক প্রমাণ ভবিষ্যতের দ্রুতগতির ও শক্তি-সাশ্রয়ী ইলেকট্রনিক প্রযুক্তি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

/এসবি/