মতিউর রহমানের বক্তব্য বিভ্রান্তিকর: শফিকুল আলম

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
মতিউর রহমানের বক্তব্য বিভ্রান্তিকর: শফিকুল আলম
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম

সম্প্রতি প্রথম আলোর সম্পাদক দাবি করেছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বাংলাদেশের সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অন্যান্য গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে গিয়ে যথেষ্ট সমস্যার মুখে পড়েছিলো। তবে তার এ দাবিকে ‘অর্ধসত্য, ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তিকর মন্তব্য’ বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এ কথা বলেন তিনি।

পোস্টে শফিকুল আলম লিখেন, সম্প্রতি প্রথম আলোর সম্পাদক দাবি করেছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বাংলাদেশের সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অন্যান্য গণমাধ্যম ‘স্বাধীনভাবে কাজ করতে গিয়ে যথেষ্ট সমস্যার মুখে পড়েছিলো’। তার অভিযোগ, বিভিন্ন ধরনের চাপ ও ভয়ের কারণে গণমাধ্যমের মালিকপক্ষ ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করেছে, সম্পাদক বদলেছে এবং অনেক সাংবাদিককে চাকরি ছাড়তে হয়েছে। এ কারণে সাংবাদিকরা অনিশ্চয়তা ও স্ব-নিয়ন্ত্রণের পরিবেশে কাজ করেছেন বলেও তিনি দাবি করেন।

মতিউর রহমানের বক্তব্যের জবাবে তিনি লিখেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কখনো সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করেনি। কোনো সংবাদপত্র বন্ধ বা কোনো প্রতিবেদন সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়নি।

শফিকুল আলম লিখেন, বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় গণমাধ্যমকে মিথ্যা বা ভুল তথ্যসমৃদ্ধ প্রতিবেদন সংশোধনের অনুরোধ করা হয়েছিল। তার ভাষ্য, শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ওঠা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করার স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

তিনি লিখেন, সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমগুলো সরকারকে সমালোচনা করাসহ যেকোনো বিষয়ে স্বাধীনভাবে প্রতিবেদন প্রকাশের সুযোগ পেয়েছে। তার দাবি, বিভিন্ন গণমাধ্যমে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও টকশোর অতিথিরা ভুল তথ্য ও মিথ্যা বক্তব্য প্রচার করলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেনি বা এসব বক্তব্য প্রচার বন্ধ করতে কোনো সংবাদমাধ্যমকে ফোন করেনি।

সাবেক প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব লিখেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জুলাই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের ‘উগ্রপন্থী’ ও ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে বর্ণনা করা গণমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়ার জন্য সরকারের ওপর চাপ ছিল। তবে কোনো সংবাদমাধ্যম বন্ধ করা হয়নি। বরং শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া কিছু সংবাদমাধ্যমকে আবার কার্যক্রম শুরু করার সুযোগ দেওয়া হয়।

তিনি লিখেন, শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলে অনেক সংবাদমাধ্যম আওয়ামী লীগ ও সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। এসব মাধ্যমে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মতো বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে নানা তথ্য প্রচার করা হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন।

শফিকুল আলম লিখেন, ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে গেলে অনেক গণমাধ্যমের মালিকপক্ষ শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনে এবং আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে পরিচিত সাংবাদিকদের সরিয়ে দেয়। তবে এসব পরিবর্তনের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কোনো নির্দেশ দেয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি লিখেন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের মালিকেরা নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ ও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য স্বেচ্ছায় এসব পরিবর্তন করেছেন। প্রথম আলোর মতামত পাতাতেও আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে বিবেচিত কিছু মতকে গুরুত্ব কম দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।

সাবেক প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব লিখেন, গণমাধ্যমে যে ‘ভয়ের পরিবেশের’ কথা বলা হচ্ছে, তার সঙ্গে শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলে বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে করা সাংবাদিকতার সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং প্রয়াত খালেদা জিয়াসহ বিভিন্ন বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা এসব গণমাধ্যমের সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান ভুক্তভোগী ছিলেন।

তিনি লিখেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার পর এসব গণমাধ্যমের মালিক ও বিতর্কিত সাংবাদিকদের অনেকে আশঙ্কায় পড়েন। এরপর বিরোধী দলের নেতাকর্মী এবং জুলাইয়ের সহিংসতায় নিহতদের পরিবারের সদস্যরা কয়েকজন সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেন। এসব মামলা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার করেনি।

শফিকুল আলম লিখেন, অতীতের সাংবাদিকতার ধরন নিয়ে অভিযুক্ত গণমাধ্যমগুলো চাইলে নিজেদের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা করতে পারতো এবং জনগণের স্বার্থবিরোধী সাংবাদিকতার জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে পারত। কিন্তু তার বদলে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে ও ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষায় অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের নিউজরুমে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে ১৮ ডিসেম্বরের হামলা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ। পুলিশের এসব হামলা ঠেকানো উচিত ছিল।

তিনি লিখেন, ১৮ ডিসেম্বরের কয়েক মাস আগে প্রথম আলোয় একই ধরনের হামলার একটি চেষ্টা পুলিশ সফলভাবে ঠেকিয়েছিলো। পরবর্তী হামলার পর পুলিশ সংবাদ সম্মেলন করে তাদের অবস্থানও জানিয়েছিলো। হামলার ঘটনায় পরে কয়েক ডজন মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগও আনা হয়েছে। তাই হামলা ঠেকাতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ‘দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা’ সরাসরি ও কার্যকর নির্দেশ দেননি বলে মতিউর রহমান যে দাবি করেছেন, তার ভিত্তি স্পষ্ট নয়।

শফিকুল আলম লিখেন, দুটি সংবাদপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি সেনাবাহিনীকেও মোতায়েন করা হয়েছিলো। এমনকি ডেইলি স্টারের ভেতরে আটকে পড়া সাংবাদিকদের নিরাপদে বের করে আনতে সেনাবাহিনীর সদস্যরা সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছিলেন।

/এসবি/