এনসিপি কেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ চাইছে

এনসিপি কেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ চাইছে
সিজেডএন ডেস্ক

দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও জ্বালানি খাতের সংকট নিয়ে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে হত্যা, গণপিটুনি ও চাঁদাবাজির ঘটনা জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অন্যদিকে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ও দাম বাড়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। এসব কারণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের পদত্যাগ দাবি করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
দলটির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, গত সাত মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং জ্বালানি খাতের সংকট মোকাবিলায় সরকার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এই কারণে ওই দুই মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আগামী ৩০ অক্টোবর রাজধানীর শাহবাগে গণবিক্ষোভের ডাক দিয়েছে এনসিপি।
কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কী বলছে? আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের ব্যর্থতা কতটা? আর দুই মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি কতটা যৌক্তিক?। এসব প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা হয়েছে এখানে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কেন
সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ড দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
গত ২২ অক্টোবর খুলনায় গুলি করে দুজনকে হত্যা করা হয়। একই দিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খুলনা সফর ছিল। এর আগে ওই দিনই রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ‘শিশু চোর’ সন্দেহে আলম শেখ নামের এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তাঁর পরিবার জানিয়েছে, তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন।
এরপর ২৫ অক্টোবর রংপুরের গঙ্গাচড়ায় অটোরিকশা চুরির অভিযোগে দুজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এসব ঘটনা দেখিয়েছে, একদিকে সশস্ত্র অপরাধের ঝুঁকি রয়েছে, অন্যদিকে সন্দেহের বশে মানুষকে পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে। অর্থাৎ মব করে মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মানুষের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা ঠেকানোও সরকারের দায়িত্ব। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে হবে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব আদালতের। সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে হত্যা করার অধিকার কারও নেই।
এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে পুলিশের তৎপরতা, অপরাধের দ্রুত তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে গুজব ও মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে যাতে কেউ সহিংসতায় জড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। অপরাধ দমন, পুলিশের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এবং নাগরিকের নিরাপত্তা রক্ষা এই মন্ত্রণালয়ের কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এনসিপির অভিযোগ, দেশে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বাড়লেও সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। নাহিদ ইসলাম বলেছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দিকে যথেষ্ট মনোযোগ না দিয়ে সংবিধান সংশোধন নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন। এ কারণে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন।
তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা নয়, সামগ্রিক অপরাধের প্রবণতা, পুলিশের তৎপরতা, অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং মামলার বিচার কতটা এগোচ্ছে-সেসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
কোনো অপরাধ ঘটলেই সরাসরি মন্ত্রীকে দায়ী করা যায় না। কিন্তু একই ধরনের অপরাধ বারবার ঘটলে, অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলে কিংবা আইন প্রয়োগে দলীয় প্রভাবের অভিযোগ উঠলে সরকারের জবাবদিহি জরুরি হয়ে পড়ে।
জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির চাপ
আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি জ্বালানি খাতের পরিস্থিতি নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। গত কয়েক মাসে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ, পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন এবং দাম বাড়ানোর কারণে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।
গত ১৮ এপ্রিল ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়। পরে ২০ সেপ্টেম্বর ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু ব্যক্তিগত গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালকদের ব্যয় বাড়ে না, বরং পণ্য পরিবহন, কৃষি উৎপাদন ও গণপরিবহনের খরচেও এর প্রভাব পড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই চাপ পণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর গিয়ে পড়ে।
সরকারের যুক্তি হতে পারে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম, আমদানি ব্যয় এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এসব বিষয় বাস্তব হলেও সংকট মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি কতটা ছিল, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত, বিকল্প উৎস থেকে আমদানি, দ্রুত বিতরণ এবং মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কমানোর ব্যবস্থা সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি দিয়ে সব দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি কেন
এনসিপির অভিযোগ, গত সাত মাসে জ্বালানি খাতের সংকট মোকাবিলায় সরকার কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি। নাহিদ ইসলামের মতে, জ্বালানিমন্ত্রীও এই ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারেন না।
তবে জ্বালানি খাতে মন্ত্রীর সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করতে হলে কয়েকটি বিষয় দেখতে হবে। সংকটের সময় সরবরাহ কতটা স্বাভাবিক ছিল, আমদানি ও মজুত ব্যবস্থাপনা কেমন ছিল, মূল্যবৃদ্ধির কারণ কতটা স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে একই সংকট ঠেকাতে কী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের কারণে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। কিন্তু সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি না থাকলে সরকারের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। আবার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ সফল হলে সেটিও মূল্যায়নে বিবেচনা করতে হবে।
অর্থাৎ, জ্বালানি সংকটের পুরো দায় এককভাবে মন্ত্রীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অজুহাতে সরকারের দায়িত্বও এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
শুধু মন্ত্রী বদলালেই কি সমস্যার সমাধান হবে
দুই মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে এনসিপি। নাহিদ ইসলাম বলেছেন, সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। তাঁর ভাষায়, ‘ড্রাইভার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু মেশিনটা হয়নি।’
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, শুধু ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। পুলিশ, প্রশাসন, নির্বাচনব্যবস্থা ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ও দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে হবে।
এনসিপির আরও অভিযোগ, গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকার যথাযথ উদ্যোগ নিচ্ছে না। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়েও দলটি প্রশ্ন তুলেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও কারসাজির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন নাহিদ ইসলাম।
এসব অভিযোগের জবাব সরকারের দেওয়া প্রয়োজন। তবে অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকাও জরুরি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কারের দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা চললেও আইনশৃঙ্খলা ও জ্বালানি সংকটের মতো বড় সমস্যাগুলোর সমাধানের বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।
৩০ অক্টোবর শাহবাগে গণবিক্ষোভ
স্বরাষ্ট্র ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগসহ চার দফা দাবিতে আগামী ৩০ অক্টোবর বেলা তিনটায় রাজধানীর শাহবাগে গণবিক্ষোভ করবে এনসিপি।
দলটির অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, সংবিধান সংশোধন কমিটি বিলুপ্ত করে গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, সাইবার আইনসহ কর্তৃত্ববাদী আইন বাতিল এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার সম্পন্ন করা।
এনসিপির নেতাদের মতে, সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনতে রাজপথে আন্দোলন প্রয়োজন। তবে এই কর্মসূচি কতটা জনসমর্থন পাবে এবং সরকারের সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে মানুষের অংশগ্রহণ ও দাবিগুলোর প্রতি জনসমর্থনের ওপর।
সরকারের সামনে এখন কী চ্যালেঞ্জ
সাম্প্রতিক বেশকিছু হত্যাকাণ্ডের ঘটনা, গণপিটুনি, চাঁদাবাজির অভিযোগ এবং জ্বালানি নিয়ে ভোগান্তি সরকারের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। প্রথমত, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, জ্বালানির সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখা।
এসব ক্ষেত্রে সরকারের পদক্ষেপ কতটা কার্যকর, তা বোঝা যাবে অপরাধের তদন্ত ও বিচার, পুলিশের জবাবদিহি, গণপিটুনি প্রতিরোধ এবং জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা দেখে।
স্বরাষ্ট্র ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হতে পারে। কিন্তু মানুষের নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও জ্বালানি খাতের সংকট নিয়ে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে হত্যা, গণপিটুনি ও চাঁদাবাজির ঘটনা জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অন্যদিকে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ও দাম বাড়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। এসব কারণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের পদত্যাগ দাবি করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
দলটির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, গত সাত মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং জ্বালানি খাতের সংকট মোকাবিলায় সরকার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এই কারণে ওই দুই মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আগামী ৩০ অক্টোবর রাজধানীর শাহবাগে গণবিক্ষোভের ডাক দিয়েছে এনসিপি।
কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কী বলছে? আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের ব্যর্থতা কতটা? আর দুই মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি কতটা যৌক্তিক?। এসব প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা হয়েছে এখানে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কেন
সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ড দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
গত ২২ অক্টোবর খুলনায় গুলি করে দুজনকে হত্যা করা হয়। একই দিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খুলনা সফর ছিল। এর আগে ওই দিনই রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ‘শিশু চোর’ সন্দেহে আলম শেখ নামের এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তাঁর পরিবার জানিয়েছে, তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন।
এরপর ২৫ অক্টোবর রংপুরের গঙ্গাচড়ায় অটোরিকশা চুরির অভিযোগে দুজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এসব ঘটনা দেখিয়েছে, একদিকে সশস্ত্র অপরাধের ঝুঁকি রয়েছে, অন্যদিকে সন্দেহের বশে মানুষকে পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে। অর্থাৎ মব করে মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মানুষের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা ঠেকানোও সরকারের দায়িত্ব। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে হবে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব আদালতের। সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে হত্যা করার অধিকার কারও নেই।
এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে পুলিশের তৎপরতা, অপরাধের দ্রুত তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে গুজব ও মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে যাতে কেউ সহিংসতায় জড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। অপরাধ দমন, পুলিশের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এবং নাগরিকের নিরাপত্তা রক্ষা এই মন্ত্রণালয়ের কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এনসিপির অভিযোগ, দেশে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বাড়লেও সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। নাহিদ ইসলাম বলেছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দিকে যথেষ্ট মনোযোগ না দিয়ে সংবিধান সংশোধন নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন। এ কারণে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন।
তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা নয়, সামগ্রিক অপরাধের প্রবণতা, পুলিশের তৎপরতা, অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং মামলার বিচার কতটা এগোচ্ছে-সেসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
কোনো অপরাধ ঘটলেই সরাসরি মন্ত্রীকে দায়ী করা যায় না। কিন্তু একই ধরনের অপরাধ বারবার ঘটলে, অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলে কিংবা আইন প্রয়োগে দলীয় প্রভাবের অভিযোগ উঠলে সরকারের জবাবদিহি জরুরি হয়ে পড়ে।
জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির চাপ
আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি জ্বালানি খাতের পরিস্থিতি নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। গত কয়েক মাসে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ, পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন এবং দাম বাড়ানোর কারণে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।
গত ১৮ এপ্রিল ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়। পরে ২০ সেপ্টেম্বর ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু ব্যক্তিগত গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালকদের ব্যয় বাড়ে না, বরং পণ্য পরিবহন, কৃষি উৎপাদন ও গণপরিবহনের খরচেও এর প্রভাব পড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই চাপ পণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর গিয়ে পড়ে।
সরকারের যুক্তি হতে পারে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম, আমদানি ব্যয় এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এসব বিষয় বাস্তব হলেও সংকট মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি কতটা ছিল, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত, বিকল্প উৎস থেকে আমদানি, দ্রুত বিতরণ এবং মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কমানোর ব্যবস্থা সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি দিয়ে সব দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি কেন
এনসিপির অভিযোগ, গত সাত মাসে জ্বালানি খাতের সংকট মোকাবিলায় সরকার কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি। নাহিদ ইসলামের মতে, জ্বালানিমন্ত্রীও এই ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারেন না।
তবে জ্বালানি খাতে মন্ত্রীর সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করতে হলে কয়েকটি বিষয় দেখতে হবে। সংকটের সময় সরবরাহ কতটা স্বাভাবিক ছিল, আমদানি ও মজুত ব্যবস্থাপনা কেমন ছিল, মূল্যবৃদ্ধির কারণ কতটা স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে একই সংকট ঠেকাতে কী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের কারণে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। কিন্তু সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি না থাকলে সরকারের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। আবার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ সফল হলে সেটিও মূল্যায়নে বিবেচনা করতে হবে।
অর্থাৎ, জ্বালানি সংকটের পুরো দায় এককভাবে মন্ত্রীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অজুহাতে সরকারের দায়িত্বও এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
শুধু মন্ত্রী বদলালেই কি সমস্যার সমাধান হবে
দুই মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে এনসিপি। নাহিদ ইসলাম বলেছেন, সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। তাঁর ভাষায়, ‘ড্রাইভার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু মেশিনটা হয়নি।’
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, শুধু ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। পুলিশ, প্রশাসন, নির্বাচনব্যবস্থা ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ও দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে হবে।
এনসিপির আরও অভিযোগ, গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকার যথাযথ উদ্যোগ নিচ্ছে না। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়েও দলটি প্রশ্ন তুলেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও কারসাজির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন নাহিদ ইসলাম।
এসব অভিযোগের জবাব সরকারের দেওয়া প্রয়োজন। তবে অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকাও জরুরি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কারের দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা চললেও আইনশৃঙ্খলা ও জ্বালানি সংকটের মতো বড় সমস্যাগুলোর সমাধানের বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।
৩০ অক্টোবর শাহবাগে গণবিক্ষোভ
স্বরাষ্ট্র ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগসহ চার দফা দাবিতে আগামী ৩০ অক্টোবর বেলা তিনটায় রাজধানীর শাহবাগে গণবিক্ষোভ করবে এনসিপি।
দলটির অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, সংবিধান সংশোধন কমিটি বিলুপ্ত করে গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, সাইবার আইনসহ কর্তৃত্ববাদী আইন বাতিল এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার সম্পন্ন করা।
এনসিপির নেতাদের মতে, সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনতে রাজপথে আন্দোলন প্রয়োজন। তবে এই কর্মসূচি কতটা জনসমর্থন পাবে এবং সরকারের সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে মানুষের অংশগ্রহণ ও দাবিগুলোর প্রতি জনসমর্থনের ওপর।
সরকারের সামনে এখন কী চ্যালেঞ্জ
সাম্প্রতিক বেশকিছু হত্যাকাণ্ডের ঘটনা, গণপিটুনি, চাঁদাবাজির অভিযোগ এবং জ্বালানি নিয়ে ভোগান্তি সরকারের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। প্রথমত, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, জ্বালানির সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখা।
এসব ক্ষেত্রে সরকারের পদক্ষেপ কতটা কার্যকর, তা বোঝা যাবে অপরাধের তদন্ত ও বিচার, পুলিশের জবাবদিহি, গণপিটুনি প্রতিরোধ এবং জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা দেখে।
স্বরাষ্ট্র ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হতে পারে। কিন্তু মানুষের নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

এনসিপি কেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ চাইছে
সিজেডএন ডেস্ক

দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও জ্বালানি খাতের সংকট নিয়ে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে হত্যা, গণপিটুনি ও চাঁদাবাজির ঘটনা জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অন্যদিকে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ও দাম বাড়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। এসব কারণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের পদত্যাগ দাবি করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
দলটির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, গত সাত মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং জ্বালানি খাতের সংকট মোকাবিলায় সরকার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এই কারণে ওই দুই মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আগামী ৩০ অক্টোবর রাজধানীর শাহবাগে গণবিক্ষোভের ডাক দিয়েছে এনসিপি।
কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কী বলছে? আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের ব্যর্থতা কতটা? আর দুই মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি কতটা যৌক্তিক?। এসব প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা হয়েছে এখানে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কেন
সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ড দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
গত ২২ অক্টোবর খুলনায় গুলি করে দুজনকে হত্যা করা হয়। একই দিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খুলনা সফর ছিল। এর আগে ওই দিনই রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ‘শিশু চোর’ সন্দেহে আলম শেখ নামের এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তাঁর পরিবার জানিয়েছে, তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন।
এরপর ২৫ অক্টোবর রংপুরের গঙ্গাচড়ায় অটোরিকশা চুরির অভিযোগে দুজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এসব ঘটনা দেখিয়েছে, একদিকে সশস্ত্র অপরাধের ঝুঁকি রয়েছে, অন্যদিকে সন্দেহের বশে মানুষকে পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে। অর্থাৎ মব করে মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মানুষের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা ঠেকানোও সরকারের দায়িত্ব। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে হবে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব আদালতের। সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে হত্যা করার অধিকার কারও নেই।
এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে পুলিশের তৎপরতা, অপরাধের দ্রুত তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে গুজব ও মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে যাতে কেউ সহিংসতায় জড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। অপরাধ দমন, পুলিশের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এবং নাগরিকের নিরাপত্তা রক্ষা এই মন্ত্রণালয়ের কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এনসিপির অভিযোগ, দেশে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বাড়লেও সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। নাহিদ ইসলাম বলেছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দিকে যথেষ্ট মনোযোগ না দিয়ে সংবিধান সংশোধন নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন। এ কারণে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন।
তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা নয়, সামগ্রিক অপরাধের প্রবণতা, পুলিশের তৎপরতা, অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং মামলার বিচার কতটা এগোচ্ছে-সেসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
কোনো অপরাধ ঘটলেই সরাসরি মন্ত্রীকে দায়ী করা যায় না। কিন্তু একই ধরনের অপরাধ বারবার ঘটলে, অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলে কিংবা আইন প্রয়োগে দলীয় প্রভাবের অভিযোগ উঠলে সরকারের জবাবদিহি জরুরি হয়ে পড়ে।
জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির চাপ
আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি জ্বালানি খাতের পরিস্থিতি নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। গত কয়েক মাসে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ, পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন এবং দাম বাড়ানোর কারণে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।
গত ১৮ এপ্রিল ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়। পরে ২০ সেপ্টেম্বর ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু ব্যক্তিগত গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালকদের ব্যয় বাড়ে না, বরং পণ্য পরিবহন, কৃষি উৎপাদন ও গণপরিবহনের খরচেও এর প্রভাব পড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই চাপ পণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর গিয়ে পড়ে।
সরকারের যুক্তি হতে পারে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম, আমদানি ব্যয় এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এসব বিষয় বাস্তব হলেও সংকট মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি কতটা ছিল, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত, বিকল্প উৎস থেকে আমদানি, দ্রুত বিতরণ এবং মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কমানোর ব্যবস্থা সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি দিয়ে সব দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি কেন
এনসিপির অভিযোগ, গত সাত মাসে জ্বালানি খাতের সংকট মোকাবিলায় সরকার কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি। নাহিদ ইসলামের মতে, জ্বালানিমন্ত্রীও এই ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারেন না।
তবে জ্বালানি খাতে মন্ত্রীর সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করতে হলে কয়েকটি বিষয় দেখতে হবে। সংকটের সময় সরবরাহ কতটা স্বাভাবিক ছিল, আমদানি ও মজুত ব্যবস্থাপনা কেমন ছিল, মূল্যবৃদ্ধির কারণ কতটা স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে একই সংকট ঠেকাতে কী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের কারণে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। কিন্তু সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি না থাকলে সরকারের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। আবার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ সফল হলে সেটিও মূল্যায়নে বিবেচনা করতে হবে।
অর্থাৎ, জ্বালানি সংকটের পুরো দায় এককভাবে মন্ত্রীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অজুহাতে সরকারের দায়িত্বও এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
শুধু মন্ত্রী বদলালেই কি সমস্যার সমাধান হবে
দুই মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে এনসিপি। নাহিদ ইসলাম বলেছেন, সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। তাঁর ভাষায়, ‘ড্রাইভার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু মেশিনটা হয়নি।’
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, শুধু ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। পুলিশ, প্রশাসন, নির্বাচনব্যবস্থা ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ও দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে হবে।
এনসিপির আরও অভিযোগ, গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকার যথাযথ উদ্যোগ নিচ্ছে না। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়েও দলটি প্রশ্ন তুলেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও কারসাজির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন নাহিদ ইসলাম।
এসব অভিযোগের জবাব সরকারের দেওয়া প্রয়োজন। তবে অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকাও জরুরি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কারের দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা চললেও আইনশৃঙ্খলা ও জ্বালানি সংকটের মতো বড় সমস্যাগুলোর সমাধানের বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।
৩০ অক্টোবর শাহবাগে গণবিক্ষোভ
স্বরাষ্ট্র ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগসহ চার দফা দাবিতে আগামী ৩০ অক্টোবর বেলা তিনটায় রাজধানীর শাহবাগে গণবিক্ষোভ করবে এনসিপি।
দলটির অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, সংবিধান সংশোধন কমিটি বিলুপ্ত করে গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, সাইবার আইনসহ কর্তৃত্ববাদী আইন বাতিল এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার সম্পন্ন করা।
এনসিপির নেতাদের মতে, সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনতে রাজপথে আন্দোলন প্রয়োজন। তবে এই কর্মসূচি কতটা জনসমর্থন পাবে এবং সরকারের সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে মানুষের অংশগ্রহণ ও দাবিগুলোর প্রতি জনসমর্থনের ওপর।
সরকারের সামনে এখন কী চ্যালেঞ্জ
সাম্প্রতিক বেশকিছু হত্যাকাণ্ডের ঘটনা, গণপিটুনি, চাঁদাবাজির অভিযোগ এবং জ্বালানি নিয়ে ভোগান্তি সরকারের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। প্রথমত, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, জ্বালানির সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখা।
এসব ক্ষেত্রে সরকারের পদক্ষেপ কতটা কার্যকর, তা বোঝা যাবে অপরাধের তদন্ত ও বিচার, পুলিশের জবাবদিহি, গণপিটুনি প্রতিরোধ এবং জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা দেখে।
স্বরাষ্ট্র ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হতে পারে। কিন্তু মানুষের নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

স্বরাষ্ট্র ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে গণবিক্ষোভ করবে এনসিপি
৩০ অক্টোবর শাহবাগে এনসিপির গণবিক্ষোভ







