বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেল বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেল বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১
বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১

গাজীপুরের জয়দেবপুরে স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশনের নিয়ন্ত্রণকক্ষে ৯ আগস্ট সন্ধ্যায় নাসা থেকে এক জরুরি সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। নাসার ট্র্যাকিং সিস্টেম জানায়, মহাকাশে ভাসতে থাকা ভারতের চার দশক পুরোনো এক স্যাটেলাইটের বিপজ্জনক ধ্বংসাবশেষ প্রচণ্ড গতিতে ধেয়ে আসছে ‘বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১’ (বিএস-১)-এর দিকে।

বার্তা পৌঁছানোর পরপরই গ্রাউন্ড স্টেশনে শুরু হয় চার দিনের এক টানা স্নায়ুচাপের লড়াই। রাজধানীর বাংলামোটরে বিএসসিএল কার্যালয়ে সেই উত্তেজনাকর অভিজ্ঞতার বিবরণ দেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান। তিনি বলেন, ওই কয়েকটি দিন খুবই উদ্বেগের মধ্যে কেটেছে। হাতে সময় কম। আবার বিএস-১ কে সরানোর সুযোগও ছিল সীমিত। তবে শেষ পর্যন্ত বিপদ হয়নি। স্যাটেলাইটটি রক্ষা করা গেছে।

মহাকাশ সচল কৃত্রিম উপগ্রহের বিচরণক্ষেত্র নয়। কক্ষপথ ছেয়ে আছে বহু বছরের পুরোনো অকেজো স্যাটেলাইট, রকেটের খণ্ডাংশ ও নিয়ন্ত্রণ হারানো যন্ত্রাংশে।এগুলোকে ‘স্পেস ডেব্রিস’ বা মহাকাশ বর্জ্য বলা হয়। এসব বর্জ্য কতটা মারাত্মক হতে পারে, তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল ২০০৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। রাশিয়ার অকেজো স্যাটেলাইট কসমস-২২৫১ এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইরিডিয়াম-৩৩ স্যাটেলাইটের মুখোমুখি সংঘর্ষে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল স্যাটেলাইট দুটি।

নাসার দেওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণ করে বিএসসিএল জানতে পারে, এ ধাতব খণ্ডটি মূলত ১৯৮২ সালের ১০ এপ্রিল উৎক্ষেপণ করা ভারতের ‘ইনস্যাট-১এ’ স্যাটেলাইটের অংশ। উৎক্ষেপণের মাত্র কয়েক মাসের মাথায়, অর্থাৎ ১৯৮২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর কার্যক্ষমতা হারিয়ে সেটি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।

বিএস-১ নির্মাণে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। ২০১৮ সালের ১২ মে ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা এ স্যাটেলাইটটির মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে মহাকাশে নিজস্ব মালিকানা নিশ্চিত করে।

শুরুতে এটি ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ নামে পরিচিত থাকলেও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১’ রাখা হয়। স্যাটেলাইটটি রক্ষার চ্যালেঞ্জ অবশ্য একেবারে নতুন নয়। এর আগে ২০২১ সালে রাশিয়ান স্যাটেলাইটের বর্জ্য এবং ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সচল স্যাটেলাইট এর খুব কাছাকাছি চলে আসে।

ফরাসি কোম্পানি থালেস অ্যালেনিয়া স্পেসের তৈরি এ স্যাটেলাইট পরিচালনার প্রথম তিন বছর বিদেশি কারিগরি সহায়তা থাকলেও ২০২১ সাল থেকে এর সম্পূর্ণ দায়িত্ব বাংলাদেশিদের হাতে। গাজীপুরের জয়দেবপুরের প্রধান নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে ৫০ জনেরও বেশি দেশি প্রকৌশলী দিনে-রাতে তিন শিফটে ভাগ হয়ে সার্বক্ষণিক স্যাটেলাইটটির গতিপথ পাহারা দেন।

নাসার বার্তা পাওয়ার পরপরই গাজীপুর স্টেশনে জরুরি সতর্কতা জারি করে কর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়। বর্জ্যটির সুনির্দিষ্ট অবস্থান জানিয়ে নাসা থেকেও ঘন ঘন আপডেট পাঠানো হচ্ছিল।

সবচেয়ে জটিল হিসাবটি ছিল বিএস-১ কে সরাতে গেলে কোন দিকে সরাতে হবে এবং কতটুকু সরানো নিরাপদ? একটু ভুল হিসাব হলেই নতুন কোনো বিপদের মুখে পড়ার আশঙ্কা ছিল। চার দিনের সূক্ষ্ম গাণিতিক বিশ্লেষণ শেষে গত ১৩ আগস্ট প্রকৌশলীরা চূড়ান্ত ঝুঁকি নেন। বিএস-১ কে কক্ষপথে সামান্য বাঁ দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়। অবশেষে বর্জ্যের টুকরোটি বিএস-১-এর মাত্র ৮৫২ মিটার দূর দিয়ে অতিক্রম করে। বিপদ কাটার পর স্যাটেলাইটটিকে আবার আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনা হয়।

পুরো কার্যক্রমে কোনো ধরনের ক্ষতি ছাড়াই বড় দুর্ঘটনা এড়ানোকে দেশি প্রকৌশলীদের জন্য বিরাট এক মাইলফলক বলে মনে করছেন বিএসসিএল পরিচালনা পর্ষদ। ৪০টি ট্রান্সপন্ডার সম্বলিত স্যাটেলাইটের ২০টি দেশের নিজস্ব প্রয়োজন মেটায় (বিশেষ করে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর বার্তা পাঠাতে) এবং বাকি ২০টি বিদেশে ইজারা দিয়ে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ রয়েছে।

বিএসসিএলের মহাব্যবস্থাপক (বিক্রয় ও বিপণন), শাহ আহমেদুল কবির বলেন, ‘এ ঘটনা আমাদের ইঞ্জিনিয়ারদের সাফল্য। তাদের দক্ষ পরিচালনার ফলে স্যাটেলাইটটির জ্বালানি সাশ্রয় হয়েছে এবং বিদ্যমান জ্বালানিতেই এটি অতিরিক্ত ১৭ মাস চালানো সম্ভব হবে।’

/এমএকে/