শিরোনাম
আজ বিশ্ব বাঘ দিবস

সুন্দরবনে বাঘের শরীরে নীরব ঘাতক, গবেষণা যা জানা গেলো

সিজেডএন  ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
সুন্দরবনে বাঘের শরীরে নীরব ঘাতক, গবেষণা যা জানা গেলো
সুন্দরবনে বাঘ

সুন্দরবনে থাকা বাঘের শরীরে চার ধরনের পরজীবীর সংক্রমণ ছড়িয়েছে। একই সঙ্গে বাঘ যেসব প্রাণী শিকার করে যেমন হরিণ, বন্য শূকর, বানরের শরীরেও পরজীবীর সংক্রমণ পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই সংক্রমণ বাঘকে দুর্বল করে শিকার সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। এতে কমতে পারে বাঘের ক্ষিপ্রতা।

আজ ২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস। বাঘ সংরক্ষণে সচেতনতা তৈরি করার লক্ষ্যে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয়। বাংলাদেশে এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘সবাই হই সচেতন, বাঘ করি সংরক্ষণ’।

সুন্দরবনে বাঘের পরজীবী সংক্রমণ, অন্যান্য সংক্রামক রোগ, সংশ্লিষ্ট রোগজীবাণু ও এসব সংক্রমণের বিস্তার নিয়ে গবেষণাটি করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, সুন্দরবনের বাঘের শরীরে গোলকৃমি, ফিতাকৃমি, পাতাকৃমি ও এককোষী পরজীবীর সংক্রমণ ঘটছে। এর মধ্যে ফিতাকৃমির সংক্রমণ ঘটছে সবচেয়ে বেশি। ফিতাকৃমি পাওয়া গেছে ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ। এরপর ৫৩ শতাংশ গোলকৃমির সংক্রমণ।

শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্য কেন্দ্রের টাইগার পয়েন্ট এলাকায় বাঘের দেখা মিললো
শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্য কেন্দ্রের টাইগার পয়েন্ট এলাকায় বাঘের দেখা মিললো

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) পাঁচজন গবেষক যৌথভাবে গবেষণাটি করেন। গত জানুয়ারিতে রাজধানীর বন ভবনে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সামনে গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়।

গবেষণাটির জন্য ২০২৪ এর মার্চ থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সুন্দরবন থেকে কয়েক দফায় বাঘসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণীর মল ও রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

গবেষণায় নেতৃত্ব দেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি ও ইমিউনোলজি বিভাগের অধ্যাপক সুলতান আহমেদ। তিনি বলেন, বাঘের শরীরে সংক্রমণ ঘটানো এসব পরজীবীকে বলা হয় নীরব ঘাতক। এরা সরাসরি মৃত্যু ঘটায় না। তবে অন্যান্য জটিলতা থাকলে মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠতে পারে। পরজীবীর পরিমাণ শরীরে বেড়ে গেলে বাঘ দুর্বল হয়ে পড়বে। দুর্বল হলে শিকার সক্ষমতা কমে আসবে এবং বাঘের শরীরে অপুষ্টিজনিত সমস্যা তৈরি হবে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, পরজীবীগুলো বাঘের পরিপাকতন্ত্রে বাস করে খাদ্য থেকে পুষ্টি শোষণ করে। ফলে বাঘ অপুষ্টিতে ভুগতে পারে, ওজন কমে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। দীর্ঘদিন সংক্রমণ চলতে থাকলে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়। এতে অন্য সংক্রামক রোগে আক্রান্তের ঝুঁকিও বাড়ে। প্রজননক্ষমতা ও শাবকের বেঁচে থাকতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী খাল সাঁতরে পার হচ্ছে একটি বাঘ
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী খাল সাঁতরে পার হচ্ছে একটি বাঘ

গবেষক অধ্যাপক সুলতান আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বাঘের মলে আমরা নেমাটোড গ্রুপের টক্সোকেরা ক্যাটি নামের মারাত্মক পরজীবী পেয়েছি। এ পরজীবী বাঘের বাচ্চার মৃত্যু ঘটাতে পারে। কারণ, বাচ্চার রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকে। আরও পেয়েছি এনসাইক্লোসটমা সিয়ালেনিকাম নামের কৃমি, যেটি অন্ত্রে রক্ত চুষে ডায়রিয়া ঘটায়। এ ছাড়া ট্রেমাটোড গ্রুপের লিভার ফ্লুক (কলিজা কৃমি) পরজীবী, যেটা বাঘের লিভারের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করতে পারে।

বাঘের শরীরে কীভাবে পরজীবী সংক্রমণ ঘটছে, তার উদাহরণ দিয়ে অধ্যাপক সুলতান আহমেদ বলেন, শামুকে লিভার ফ্লুক পরজীবী থাকে। শামুক যখন ঘাসে উঠে আসে, তখন সেখানে লিভার ফ্লুক জায়গা করে নেয়। ঘাসের মাধ্যমে হরিণের শরীরে ঢোকে। বাঘ যখন হরিণকে শিকার করে, তখন এর মাধ্যমে বাঘের অন্ত্রে চলে যায় পরজীবীটি। এভাবে সংক্রমণ হতে থাকে বাঘের শরীরে। এ ছাড়া মানুষ আর গবাদিপশুর মল– এসব থেকেও সুন্দরবনে বিভিন্ন পরজীবী ছড়িয়ে পড়তে পারে।

গবেষকেরা সুন্দরবনের ৪টি রেঞ্জের ৬৫টি স্থান থেকে দুই ধাপে বাঘের মলের নমুনা সংগ্রহ করেন। পরে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষাগারে সংগৃহীত নমুনায় পরজীবী, ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের উপস্থিতি এবং জীবাণুর ধরনগুলো নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়। বাঘ ও তাদের শিকার প্রাণী মিলিয়ে ৩৯৯টি প্রাণীর মলের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল এ দুই পরীক্ষাগারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, হরিণের মধ্যে ৪৩ দশমিক ৪ শতাংশ গোলকৃমির সংক্রমণ পাওয়া গেছে। বানরের মধ্যে গোলকৃমি ও এককোষী অণুজীবের সংক্রমণ উভয়ই ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ। বন্য শূকরে গোলকৃমির সংক্রমণ ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ এবং এককোষী পরজীবী সংক্রমণ ছিল ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ।

অধ্যাপক সুলতান আহমদ বলেন, ‘বাঘের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক সংক্রমণ হতে পারে ক্যানাইন ডিস্টেম্পার ভাইরাস।সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার কুকুরে রক্তের নমুনায় ক্যানাইন ডিস্টেম্পার পাওয়া গেছে। তবে ভৌগোলিকভাবে সুন্দরবন এমনভাবে সুরক্ষিত যে বাঘের কুকুরের সংস্পর্শে আসার আশঙ্কা নেই। তবু ঝুঁকি না নিতে সুন্দরবন সংলগ্ন এক কিলোমিটার এলাকা থেকে কুকুর সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছি।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বাঘবিশেষজ্ঞ এম এ আজিজ বলেন, এখন এই গবেষণায় পাওয়া তথ্য-উপাত্ত সামনে রেখে বাঘের ওপর হুমকি কীভাবে কমিয়ে আনা যায়, সেই কৌশলগুলো সাজাতে হবে।

/এসআর/