শিরোনাম

আয়নাঘরে বন্দিদের হাত-চোখ বেঁধে রাখা হতো: চিফ প্রসিকিউটর

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
আয়নাঘরে বন্দিদের হাত-চোখ বেঁধে রাখা হতো: চিফ প্রসিকিউটর
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম

র‌্যাবের ‘আয়নাঘরে’ বন্দিদের হাত-চোখ বেঁধে রাখা হতো বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। শনিবার (১ আগস্ট) রাজধানীর উত্তরায় র‌্যাব-১ এর ‘আয়নাঘর’ বা টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেল পরিদর্শন শেষে এ কথা জানান তিনি।

এদিন বেলা ১১টার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদার ও অন্য দুই সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীকে নিয়ে টিএফআই সেল পরিদর্শনে যান চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।

এসময় তারা গোপন বন্দিশালাগুলোর গোপন কক্ষগুলো ঘুরে ঘুরে দেখেন।

পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আজকে অত্যন্ত ভয়াবহ চিত্র আপনারা দেখেছেন। এই র‌্যাব-১ এর বন্দিশালায় আমরা ছোট-বড় ২২টি কক্ষ পেয়েছি। এসব কক্ষে যাদের রাখা হতো, তাদের মাসের পর মাস মানবেতর অবস্থায় আটকে রাখা হতো। তদন্তে আমরা জানতে পেরেছি, এসব আয়নাঘরে ভুক্তভোগীদের হাত ও চোখ বেঁধে রাখা হতো। এ অবস্থায় তাদের ওপর বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন চালানো হতো। কাউকে কাউকে দীর্ঘদিন পরে বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় ছেড়ে দেওয়া হতো, আবার অনেককে হত্যা করা হতো।’

তিনি বলেন, ‘অনেকের কাছে আয়নাঘর একটি রূপকথার গল্পের মতো মনে হতো। কিন্তু এটি যে কোনো রূপকথা নয়, বরং এক ভয়াবহ বাস্তবতা—তা আজ প্রমাণিত হয়েছে। তৎকালীন সরকার ও রাষ্ট্র যে ফ্যাসিবাদী ছিল এবং যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তারা কতটা ফ্যাসিবাদী চরিত্রের অধিকারী ছিলেন, আজ তাদের সেই চরিত্র উন্মোচিত হয়েছে।’

আয়নাঘরে বন্দিদের হাত-চোখ বাঁধে রাখা হতো_ চিফ প্রসিকিউটর ২
র‍্যাবের ‘আয়নাঘর’ পরিদর্শনে ট্রাইব্যুনালের বিচারক-আইনজীবীরা

চিফ প্রসিকিউটর জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর উদ্ধার হওয়া কয়েকজন ভুক্তভোগী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করেছেন। তাদের মধ্যে ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমান অন্যতম। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে টিএফআই সেলে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার বিচার চলছে। তবে এখনো গুম ও হত্যার শিকার প্রায় ২৫০ জনের বেশি মানুষের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। নিখোঁজদের তালিকায় ইলিয়াস আলী ও সুমনের নামও রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকেও একসময় এই আয়নাঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। টিএফআই সেলের একটি কক্ষে তাকে বন্দি রাখা হয় এবং পরে ভারতে নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। সাক্ষীদের বর্ণনা ও তদন্তে এমন তথ্য উঠে এসেছে।’

পরিদর্শনকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদ, শাইখ মাহদী, সহিদুল ইসলাম সরদার, তাসমিরুল ইসলাম, আসামিপক্ষের আইনজীবী, গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলামকে তুলি, মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে, গত ২১ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর র‍্যাব, ডিজিএফআই এবং ডিবির (ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চ) গোপন বন্দিশালাগুলো পরিদর্শনের জন্য ট্রাইব্যুনালে একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন জানান। ওই আবেদনের শুনানিতে তিনি বিগত সরকারের আমলে এসব গোপন সেলে বিরোধী রাজনৈতিক ও মতাদর্শের মানুষদের বেআইনিভাবে আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন ও গুম করার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন।

প্রসিকিউশনের সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই ট্রাইব্যুনাল-১ এই পরিদর্শনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ প্রদান করেন।

/এফআর/