বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী আজ

সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী আজ
শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমান

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বকনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমানের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ। ১৯৭১ সালের এই দিনে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার দলই সীমান্তে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি বাঙ্কারে গ্রেনেড হামলা চালান তিনি। তবে ফেরার পথে পাক সেনাদের গুলিতে শাহাদতবরণ করেন তিনি। তখন তার বয়স হয়েছিল মাত্র ১৮ বছর। দেশের প্রতি অগাধ ভালোবাসার প্রমাণ রেখে গেছেন কিশোর বয়সে।

২৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার খোরদা খালিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সিপাহি হামিদুর রহমান। তার পারিবারিক নাম মোহাম্মদ হামিদুর রহমান। তার পিতার নাম আক্কাস আলী মন্ডল এবং মাতার নাম মোসাম্মাৎ কায়মুন্নেসা। তিনি শৈশবে খালিশপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং পরবর্তীকালে স্থানীয় নাইট স্কুলে লেখাপড়া করেন।

১৯৭১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি হামিদুর রহমান সেনাবাহিনীতে সিপাহী পদে যোগ দেন৷ তার প্রথম ও শেষ ইউনিট ছিল ১ নম্বর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট৷ সেনাবাহিনীতে ভর্তির পরই প্রশিক্ষণের জন্য তাকে পাঠানো হয় চট্টগ্রামের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সেন্টারে৷ ২৫ মার্চের রাতে চট্টগ্রামের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ওখানকার আরও কয়েকটি ইউনিটের সমন্বয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়৷

যুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ হামিদুর রহমানকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তিনি ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠ পদকপ্রাপ্ত শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ।

১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসের শেষদিকে কমলগঞ্জের দলই সীমান্ত এলাকায় প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছিল। চারদিকে চা বাগান আর মাঝখানে দলই সীমান্ত চৌকি। এই চৌকি থেকে দক্ষিণ-পূর্বদিকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কমলপুর শহরে ছিল মুক্তিবাহিনীর সাবসেক্টর ক্যাম্প। প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সি কোম্পানির হয়ে দলই সীমান্তের ফাঁড়ি দখল করার অভিযানে অংশ নেন সিপাহি হামিদুর রহমান।

সব প্রস্তুতি নিয়ে ২৮ অক্টোবর ভোর রাতে লেফটেন্যান্ট কাইয়ুমের নেতৃত্বে ১২৫ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল পাকিস্তানি সেনাদের ওপর চতুর্দিক থেকে সাঁড়াশি আক্রমণ চালায়। বাঙালি যোদ্ধাদের ব্যাপক গোলাবর্ষণে পাক সেনাদের ক্যাম্পে আগুন ধরে যায়। শত্রুর অবস্থানের কাছাকাছি পৌঁছালে একটি মাইন বিস্ফোরিত হয়। এ সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীও মেশিনগান দিয়ে তীব্র গুলিবর্ষণ শুরু করে। এ কারণে মুক্তিবাহিনী সামনে অগ্রসর হতে পারছিল না। তখন পাকিস্তানি মেশিনগান পোস্টে গ্রেনেড হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর এই ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয় হামিদুর রহমানকে।

পাহাড়ি খালের মধ্য দিয়ে ক্রলিং করে (বুকে হেঁটে) গ্রেনেড নিয়ে আক্রমণ শুরু করেন তিনি। তার ছোড়া দুটি গ্রেনেড সফলভাবে মেশিনগান পোস্টে আঘাত হানে। এর পরই তিনি গুলিবিদ্ধ হন। সেই অবস্থাতেই মেশিনগান পোস্টে গিয়ে সেখানকার দুই পাকিস্তানি সেনার সঙ্গে তার হাতাহাতি শুরু হয়। একপর্যায়ে তিনি মেশিনগান পোস্টটি অকার্যকর করে দিতে সক্ষম হন। তার এই বীরত্বপূর্ণ কাজের জন্য ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযোদ্ধারা বিজয়ী হয়ে সীমান্ত ফাঁড়ি দখল করেন। তবে তিনি বিজয়োল্লাস করতে পারেননি। ফাঁড়ি দখলের পর সহযোদ্ধারা তার মরদেহ উদ্ধার করেন। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সীমান্তের অল্প দূরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের হাতিমেরছড়া গ্রামের স্থানীয় এক পরিবারের পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করা হয়।

স্বাধীনতার পর দলই সীমান্ত ফাঁড়ির বিজিবির (তৎকালীন বিডিআর) পক্ষ থেকে স্থানীয়ভাবে একটি নামফলকসহ স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়। ২০০৫ সালে স্থায়ী স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে স্থানীয় সাংবাদিকদের লিখিত আবেদন ও এলাকাবাসীর দাবিতে ২০০৭ সালের ২৭ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকার শহীদ হামিদুর রহমানের দেহাবশেষ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। এরই অংশ হিসেবে ওই বছরের ১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ রাইফেলসের একটি দল ত্রিপুরা সীমান্তে তার দেহাবশেষ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানকে ঢাকার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

/জেএইচ/