ডেঙ্গুর প্রকোপে কাঁপছে দেশ, রাজধানীর বাইরে সামান্য বাজেটেও তছরুপ

ডেঙ্গুর প্রকোপে কাঁপছে দেশ, রাজধানীর বাইরে সামান্য বাজেটেও তছরুপ
জুবায়ের আহমেদ

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শুয়ে আছে ১৩ বছরের শিশু জিহাদ হাসান। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ায় তার রক্তে প্লাটিলেট কমছে। এর সঙ্গে তার তীব্র পেটব্যথা ও বমি হচ্ছে। পাশেই বসেই কাঁদছিলেন মা শিউলি বেগম। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তিন দিন আগে টঙ্গী থেকে তাকে এই হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে।
শিউলি বেগমের সঙ্গে গতকাল বুধবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কথা হয় এই প্রতিনিধির। ছেলের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তাদের এলাকার ড্রেন ময়লায় ভরা। বাসার আশপাশও নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। মশার উপদ্রব থেকে বাঁচার উপায় নেই। শেষ পর্যন্ত সেই মশাবাহিত রোগেই সংকটাপন্ন তার সন্তান।
জিহাদ হাসানের এই সংকটাপন্ন অবস্থা এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। ডেঙ্গুর প্রকোপ ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। তবে আক্রান্তের সংখ্যা কোনো জেলায় খুব বেশি আবার কোনো জেলায় কম।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্র অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরের বাইরে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। অর্থাৎ ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে ১ লাখ ১৮ হাজারের বেশি রোগী রাজধানীর বাইরের। এদের মধ্যে মারা গেছেন ২৪১ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা রাজধানীর বাইরের অঞ্চলগুলোতে অনেক বেশি। অথচ এসব এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণের বরাদ্দ সীমিত। তার ওপর স্থানীয় পর্যায়ে বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কোথাও বরাদ্দ ছাড়ের তথ্য থাকলেও মাঠপর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকায় শত শত কোটি, বাইরে সীমিত অর্থ বরাদ্দ
মশা নিয়ন্ত্রণে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের বরাদ্দের সঙ্গে দেশের অন্যান্য এলাকার বরাদ্দের ব্যবধান অনেক। এই কাজে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ৩২২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রেখেছে। এর মধ্যে উত্তর সিটি ২০৮ কোটি ৮৫ লাখ এবং দক্ষিণ সিটি ১১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। দক্ষিণ সিটিতে শুধু কীটনাশক কেনার জন্যই বরাদ্দ ৫০ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন গত পাঁচ অর্থবছরে মশা নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৬০৫ কোটি টাকা ব্যয় করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডেঙ্গু ও মশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ হলেও সেই তুলনায় বাইরের পৌরসভাগুলোর জন্য বরাদ্দ খুব সামান্য। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটে পৌরসভার মশক নিধনের কার্যক্রম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, প্রচার এবং পৌরসভার নিয়ন্ত্রণাধীন স্থাপনাসমূহের সংস্কার, সম্প্রসারণ ও নির্মাণ বাবদ ৪১ কোটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে অর্থ বিভাগের মাধ্যমে ছাড়কৃত টাকার ৪র্থ কিস্তি বাবদ দেশের ৩৩০টি পৌরসভার অনুকূলে মাত্র ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দের তথ্য পাওয়া গেছে।
কিন্তু এই অর্থ মাঠপর্যায়ে কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, কী পরিমাণ কীটনাশক কেনা হচ্ছে, কোথায় মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা হচ্ছে – এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না।
শত কোটি টাকা খরচের পরও থামছে না মৃত্যু
মশা নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক ছিটানো, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও প্রজননস্থল ধ্বংসের কর্মসূচি নেওয়া হয়। কিন্তু এসব উদ্যোগে মশার ঘনত্ব কতটা কমছে, কীটনাশক কার্যকর কি না এবং সংক্রমণের ঝুঁকি কতটা হ্রাস পাচ্ছে তার নিয়মিত মূল্যায়ন নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রাসেল রহমান সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘আমাদের বরাদ্দের অর্থ যথাযথ ব্যয় হচ্ছে। ফলে এখানে রোগীর সংখ্যা কম। ঢাকার ডেঙ্গু রোগীর একটি অংশ মূলত ঢাকার বাইরে থেকে আসেন। সেটিকে ঢাকার হিসেবে গণ্য করা ঠিক হবে না।‘
তিনি বলেন, ‘আমরা নিয়মিত পরিষ্কার-পরিছন্নতার কাজ করি। এক্ষেত্রে নাগরিকদেও সচেতন হতে হবে। তাছাড়া নিয়ম করেই মশার ওষুধ ছিটানো হয়।‘
জাতীয় প্রতিষ্ঠান গঠন ও ঝুঁকিভিত্তিক বাজেটের প্রস্তাব
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দেশে একটি শক্তিশালী জাতীয় প্রতিষ্ঠান বা কেন্দ্রীয় সমন্বয়ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এবিষয়ে কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘বর্তমানে বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা নিজ নিজ উদ্যোগে মশা নিয়ন্ত্রণের কাজ করে। কিন্তু সব এলাকায় সমানভাবে অর্থ, জনবল ও কারিগরি সক্ষমতা নেই। একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান থাকলে দেশের সব অঞ্চলের ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজন অনুযায়ী বাজেট বণ্টন এবং মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের সমন্বয় করা সম্ভব হবে।’
আগামীতে ঢাকার বাইরে রোগী আরও বাড়বে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ঢাকায় ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ শনাক্ত হয়ে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে সংক্রমণ চলায় ঢাকার অনেক মানুষ এক বা একাধিকবার আক্রান্ত হয়েছেন, ফলে পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণত কমে। অন্যদিকে, যেসব এলাকায় ডেঙ্গুর বিস্তার তুলনামূলক নতুন, সেখানে আগে আক্রান্ত না হওয়া মানুষের সংখ্যা বেশি থাকতে পারে। ফলে নতুন করে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগও বেশি হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, শুধু জনসংখ্যা বা আগের বছরের বরাদ্দের ভিত্তিতে নয়, বরং ডেঙ্গু সংক্রমণের হার, মৃত্যুর ঝুঁকি, মশার ঘনত্ব এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বিবেচনায় বাজেট বণ্টন করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে একটি জাতীয় সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান গঠন করতে হবে, যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সমন্বয় করবে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শুয়ে আছে ১৩ বছরের শিশু জিহাদ হাসান। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ায় তার রক্তে প্লাটিলেট কমছে। এর সঙ্গে তার তীব্র পেটব্যথা ও বমি হচ্ছে। পাশেই বসেই কাঁদছিলেন মা শিউলি বেগম। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তিন দিন আগে টঙ্গী থেকে তাকে এই হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে।
শিউলি বেগমের সঙ্গে গতকাল বুধবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কথা হয় এই প্রতিনিধির। ছেলের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তাদের এলাকার ড্রেন ময়লায় ভরা। বাসার আশপাশও নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। মশার উপদ্রব থেকে বাঁচার উপায় নেই। শেষ পর্যন্ত সেই মশাবাহিত রোগেই সংকটাপন্ন তার সন্তান।
জিহাদ হাসানের এই সংকটাপন্ন অবস্থা এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। ডেঙ্গুর প্রকোপ ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। তবে আক্রান্তের সংখ্যা কোনো জেলায় খুব বেশি আবার কোনো জেলায় কম।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্র অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরের বাইরে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। অর্থাৎ ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে ১ লাখ ১৮ হাজারের বেশি রোগী রাজধানীর বাইরের। এদের মধ্যে মারা গেছেন ২৪১ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা রাজধানীর বাইরের অঞ্চলগুলোতে অনেক বেশি। অথচ এসব এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণের বরাদ্দ সীমিত। তার ওপর স্থানীয় পর্যায়ে বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কোথাও বরাদ্দ ছাড়ের তথ্য থাকলেও মাঠপর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকায় শত শত কোটি, বাইরে সীমিত অর্থ বরাদ্দ
মশা নিয়ন্ত্রণে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের বরাদ্দের সঙ্গে দেশের অন্যান্য এলাকার বরাদ্দের ব্যবধান অনেক। এই কাজে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ৩২২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রেখেছে। এর মধ্যে উত্তর সিটি ২০৮ কোটি ৮৫ লাখ এবং দক্ষিণ সিটি ১১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। দক্ষিণ সিটিতে শুধু কীটনাশক কেনার জন্যই বরাদ্দ ৫০ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন গত পাঁচ অর্থবছরে মশা নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৬০৫ কোটি টাকা ব্যয় করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডেঙ্গু ও মশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ হলেও সেই তুলনায় বাইরের পৌরসভাগুলোর জন্য বরাদ্দ খুব সামান্য। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটে পৌরসভার মশক নিধনের কার্যক্রম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, প্রচার এবং পৌরসভার নিয়ন্ত্রণাধীন স্থাপনাসমূহের সংস্কার, সম্প্রসারণ ও নির্মাণ বাবদ ৪১ কোটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে অর্থ বিভাগের মাধ্যমে ছাড়কৃত টাকার ৪র্থ কিস্তি বাবদ দেশের ৩৩০টি পৌরসভার অনুকূলে মাত্র ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দের তথ্য পাওয়া গেছে।
কিন্তু এই অর্থ মাঠপর্যায়ে কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, কী পরিমাণ কীটনাশক কেনা হচ্ছে, কোথায় মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা হচ্ছে – এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না।
শত কোটি টাকা খরচের পরও থামছে না মৃত্যু
মশা নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক ছিটানো, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও প্রজননস্থল ধ্বংসের কর্মসূচি নেওয়া হয়। কিন্তু এসব উদ্যোগে মশার ঘনত্ব কতটা কমছে, কীটনাশক কার্যকর কি না এবং সংক্রমণের ঝুঁকি কতটা হ্রাস পাচ্ছে তার নিয়মিত মূল্যায়ন নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রাসেল রহমান সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘আমাদের বরাদ্দের অর্থ যথাযথ ব্যয় হচ্ছে। ফলে এখানে রোগীর সংখ্যা কম। ঢাকার ডেঙ্গু রোগীর একটি অংশ মূলত ঢাকার বাইরে থেকে আসেন। সেটিকে ঢাকার হিসেবে গণ্য করা ঠিক হবে না।‘
তিনি বলেন, ‘আমরা নিয়মিত পরিষ্কার-পরিছন্নতার কাজ করি। এক্ষেত্রে নাগরিকদেও সচেতন হতে হবে। তাছাড়া নিয়ম করেই মশার ওষুধ ছিটানো হয়।‘
জাতীয় প্রতিষ্ঠান গঠন ও ঝুঁকিভিত্তিক বাজেটের প্রস্তাব
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দেশে একটি শক্তিশালী জাতীয় প্রতিষ্ঠান বা কেন্দ্রীয় সমন্বয়ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এবিষয়ে কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘বর্তমানে বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা নিজ নিজ উদ্যোগে মশা নিয়ন্ত্রণের কাজ করে। কিন্তু সব এলাকায় সমানভাবে অর্থ, জনবল ও কারিগরি সক্ষমতা নেই। একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান থাকলে দেশের সব অঞ্চলের ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজন অনুযায়ী বাজেট বণ্টন এবং মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের সমন্বয় করা সম্ভব হবে।’
আগামীতে ঢাকার বাইরে রোগী আরও বাড়বে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ঢাকায় ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ শনাক্ত হয়ে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে সংক্রমণ চলায় ঢাকার অনেক মানুষ এক বা একাধিকবার আক্রান্ত হয়েছেন, ফলে পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণত কমে। অন্যদিকে, যেসব এলাকায় ডেঙ্গুর বিস্তার তুলনামূলক নতুন, সেখানে আগে আক্রান্ত না হওয়া মানুষের সংখ্যা বেশি থাকতে পারে। ফলে নতুন করে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগও বেশি হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, শুধু জনসংখ্যা বা আগের বছরের বরাদ্দের ভিত্তিতে নয়, বরং ডেঙ্গু সংক্রমণের হার, মৃত্যুর ঝুঁকি, মশার ঘনত্ব এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বিবেচনায় বাজেট বণ্টন করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে একটি জাতীয় সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান গঠন করতে হবে, যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সমন্বয় করবে।

ডেঙ্গুর প্রকোপে কাঁপছে দেশ, রাজধানীর বাইরে সামান্য বাজেটেও তছরুপ
জুবায়ের আহমেদ

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শুয়ে আছে ১৩ বছরের শিশু জিহাদ হাসান। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ায় তার রক্তে প্লাটিলেট কমছে। এর সঙ্গে তার তীব্র পেটব্যথা ও বমি হচ্ছে। পাশেই বসেই কাঁদছিলেন মা শিউলি বেগম। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তিন দিন আগে টঙ্গী থেকে তাকে এই হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে।
শিউলি বেগমের সঙ্গে গতকাল বুধবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কথা হয় এই প্রতিনিধির। ছেলের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তাদের এলাকার ড্রেন ময়লায় ভরা। বাসার আশপাশও নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। মশার উপদ্রব থেকে বাঁচার উপায় নেই। শেষ পর্যন্ত সেই মশাবাহিত রোগেই সংকটাপন্ন তার সন্তান।
জিহাদ হাসানের এই সংকটাপন্ন অবস্থা এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। ডেঙ্গুর প্রকোপ ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। তবে আক্রান্তের সংখ্যা কোনো জেলায় খুব বেশি আবার কোনো জেলায় কম।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্র অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরের বাইরে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। অর্থাৎ ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে ১ লাখ ১৮ হাজারের বেশি রোগী রাজধানীর বাইরের। এদের মধ্যে মারা গেছেন ২৪১ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা রাজধানীর বাইরের অঞ্চলগুলোতে অনেক বেশি। অথচ এসব এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণের বরাদ্দ সীমিত। তার ওপর স্থানীয় পর্যায়ে বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কোথাও বরাদ্দ ছাড়ের তথ্য থাকলেও মাঠপর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকায় শত শত কোটি, বাইরে সীমিত অর্থ বরাদ্দ
মশা নিয়ন্ত্রণে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের বরাদ্দের সঙ্গে দেশের অন্যান্য এলাকার বরাদ্দের ব্যবধান অনেক। এই কাজে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ৩২২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রেখেছে। এর মধ্যে উত্তর সিটি ২০৮ কোটি ৮৫ লাখ এবং দক্ষিণ সিটি ১১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। দক্ষিণ সিটিতে শুধু কীটনাশক কেনার জন্যই বরাদ্দ ৫০ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন গত পাঁচ অর্থবছরে মশা নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৬০৫ কোটি টাকা ব্যয় করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডেঙ্গু ও মশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ হলেও সেই তুলনায় বাইরের পৌরসভাগুলোর জন্য বরাদ্দ খুব সামান্য। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটে পৌরসভার মশক নিধনের কার্যক্রম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, প্রচার এবং পৌরসভার নিয়ন্ত্রণাধীন স্থাপনাসমূহের সংস্কার, সম্প্রসারণ ও নির্মাণ বাবদ ৪১ কোটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে অর্থ বিভাগের মাধ্যমে ছাড়কৃত টাকার ৪র্থ কিস্তি বাবদ দেশের ৩৩০টি পৌরসভার অনুকূলে মাত্র ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দের তথ্য পাওয়া গেছে।
কিন্তু এই অর্থ মাঠপর্যায়ে কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, কী পরিমাণ কীটনাশক কেনা হচ্ছে, কোথায় মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা হচ্ছে – এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না।
শত কোটি টাকা খরচের পরও থামছে না মৃত্যু
মশা নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক ছিটানো, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও প্রজননস্থল ধ্বংসের কর্মসূচি নেওয়া হয়। কিন্তু এসব উদ্যোগে মশার ঘনত্ব কতটা কমছে, কীটনাশক কার্যকর কি না এবং সংক্রমণের ঝুঁকি কতটা হ্রাস পাচ্ছে তার নিয়মিত মূল্যায়ন নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রাসেল রহমান সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘আমাদের বরাদ্দের অর্থ যথাযথ ব্যয় হচ্ছে। ফলে এখানে রোগীর সংখ্যা কম। ঢাকার ডেঙ্গু রোগীর একটি অংশ মূলত ঢাকার বাইরে থেকে আসেন। সেটিকে ঢাকার হিসেবে গণ্য করা ঠিক হবে না।‘
তিনি বলেন, ‘আমরা নিয়মিত পরিষ্কার-পরিছন্নতার কাজ করি। এক্ষেত্রে নাগরিকদেও সচেতন হতে হবে। তাছাড়া নিয়ম করেই মশার ওষুধ ছিটানো হয়।‘
জাতীয় প্রতিষ্ঠান গঠন ও ঝুঁকিভিত্তিক বাজেটের প্রস্তাব
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দেশে একটি শক্তিশালী জাতীয় প্রতিষ্ঠান বা কেন্দ্রীয় সমন্বয়ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এবিষয়ে কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘বর্তমানে বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা নিজ নিজ উদ্যোগে মশা নিয়ন্ত্রণের কাজ করে। কিন্তু সব এলাকায় সমানভাবে অর্থ, জনবল ও কারিগরি সক্ষমতা নেই। একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান থাকলে দেশের সব অঞ্চলের ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজন অনুযায়ী বাজেট বণ্টন এবং মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের সমন্বয় করা সম্ভব হবে।’
আগামীতে ঢাকার বাইরে রোগী আরও বাড়বে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ঢাকায় ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ শনাক্ত হয়ে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে সংক্রমণ চলায় ঢাকার অনেক মানুষ এক বা একাধিকবার আক্রান্ত হয়েছেন, ফলে পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণত কমে। অন্যদিকে, যেসব এলাকায় ডেঙ্গুর বিস্তার তুলনামূলক নতুন, সেখানে আগে আক্রান্ত না হওয়া মানুষের সংখ্যা বেশি থাকতে পারে। ফলে নতুন করে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগও বেশি হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, শুধু জনসংখ্যা বা আগের বছরের বরাদ্দের ভিত্তিতে নয়, বরং ডেঙ্গু সংক্রমণের হার, মৃত্যুর ঝুঁকি, মশার ঘনত্ব এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বিবেচনায় বাজেট বণ্টন করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে একটি জাতীয় সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান গঠন করতে হবে, যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সমন্বয় করবে।

ডেঙ্গুতে একদিনে সর্বোচ্চ ১১ জনের মৃত্যু, মোট ৪০০
ডেঙ্গুতে একদিনে ৭ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে রোগী ভর্তির রেকর্ড







