বিবিএসের তথ্যে আস্থার ঘাটতি, সংস্কারেও ধীরগতি

বিবিএসের তথ্যে আস্থার ঘাটতি, সংস্কারেও ধীরগতি
নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের অর্থনীতি, জনসংখ্যা, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি ও শিল্প উৎপাদনসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব খাতের নীতিনির্ধারণে ভিত্তি হিসেবে কাজ করে সরকারি পরিসংখ্যান। এসব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও প্রকাশের দায়িত্ব বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস)। যদিও দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মহলে সংস্থাটির প্রকাশিত তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আজ জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস। তবে শারদীয় দুর্গা পূজা উপলক্ষে সরকারি ছুটি থাকায় দিবসটির আনুষ্ঠানিকতা নভেম্বরে পালিত হবে।
অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের অভিযোগ, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে অর্থনৈতিক অগ্রগতির চিত্র ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তুলে ধরতে জিডিপির আকার ও প্রবৃদ্ধিসহ কিছু সূচকে অতিরঞ্জিত তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। সে সময়ের মূল্যস্ফীতির প্রকৃত চাপ পরিসংখ্যানে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়েছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বিবিএসের পরিসংখ্যান নিয়ে আস্থার সংকটের বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংস্থার মূল্যায়নেও উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালের জানুয়ারির ‘ডেটা অ্যাডিকুয়েসি অ্যাসেসমেন্ট’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জাতীয় হিসাব বা জিডিপি-সংক্রান্ত পরিসংখ্যানকে ‘সি’ রেটিং দেয়া হয়েছে। সংস্থাটির মূল্যায়নে পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা, সাপ্লাই অ্যান্ড ইউজ টেবিল নিয়মিত হালনাগাদ না করা এবং তথ্য প্রকাশে বিলম্বের বিষয়গুলো উঠে এসেছে। মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান সামগ্রিকভাবে ‘বি’ রেটিং পেলেও এর পরিধি বা ব্যাপ্তির ক্ষেত্রে দেওয়া হয়েছে ‘সি’ রেটিং। সরকারি আর্থিক পরিসংখ্যানের সময়োপযোগিতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল বলে উল্লেখ করেছে আইএমএফ।
অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত স্ট্যাটিস্টিক্যাল পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটরসে (এসপিআই) বাংলাদেশের স্কোর ১০০-এর মধ্যে ৭১ দশমিক ৬। জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থার সক্ষমতা, তথ্যের উৎস, প্রাপ্যতা এবং নীতিনির্ধারণে তথ্যের ব্যবহার মূল্যায়ন করে এ সূচক। স্কোরে এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে জাপান, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, শ্রীলংকা ও ভারত।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১২ সুপারিশ
বিবিএসের পরিসংখ্যানের গুণগত মান, স্বচ্ছতা ও প্রাপ্যতা পর্যালোচনায় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্স ১২টি সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে স্বাধীন পরিসংখ্যান ব্যুরো গঠন, সংস্থাটির নাম পরিবর্তন করে ‘স্ট্যাটিসটিকস বাংলাদেশ’ বা ‘স্ট্যাটবিডি’ করা, সাত সদস্যের ‘ট্রাস্ট অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সি কাউন্সিল অব স্ট্যাটিসটিকস’ গঠন এবং পরিসংখ্যান আইন ২০১৩ সংশোধনের প্রস্তাব ছিল। পাশাপাশি জরিপ পরিচালনা, তথ্যের গুণগত মান, উন্মুক্ত তথ্যপ্রবাহ, জবাবদিহিতা ও মহাপরিচালক নিয়োগ পদ্ধতিতে সংস্কারের বিষয়ও গুরুত্ব পায়। কিন্তু সেই অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
টাস্কফোর্সের সুপারিশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বিবিএসের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সংস্থাটির প্রধান হিসেবে একজন পেশাদার পরিসংখ্যানবিদ নিয়োগ। বর্তমানে প্রশাসন ক্যাডার থেকে মহাপরিচালক নিয়োগ দেওয়ার চর্চা নিয়ে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিএসের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, সুপারিশ বাস্তবায়নের পথে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের মতে, স্বাধীন পরিসংখ্যান ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা গেলে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর পাশাপাশি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হতো।
ব্যবহারকারীদের মধ্যেও আস্থার সংকট
বিবিএসের তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যেও সংশয় রয়েছে। সংস্থাটির নিজস্ব ‘ব্যবহারকারী সন্তুষ্টি জরিপ ২০২৪’-এ দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের ৩৩ দশমিক ১৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতিসংক্রান্ত পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন না। জরিপটি বিবিএস ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হয়।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় হিসাব বা জিডিপি-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান নিয়ে ২৬ শতাংশ উত্তরদাতা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। আয় ও দারিদ্র্যবিষয়ক পরিসংখ্যান নিয়ে সন্দিহান ২৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ। বৈদেশিক বাণিজ্যসংক্রান্ত পরিসংখ্যান নিয়ে সংশয় রয়েছে ২৯ দশমিক ৯২ শতাংশের। এছাড়া শিল্প, শ্রম ও শিক্ষাবিষয়ক পরিসংখ্যান নিয়েও ২৩ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা দ্বিধা প্রকাশ করেছেন।
মূল্যস্ফীতির সরকারি হিসাবের সঙ্গে সাধারণ মানুষের বাজার অভিজ্ঞতার পার্থক্যও এ সংশয়ের একটি কারণ। মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়, বরং দাম বাড়ার গতি কমে যাওয়া। আবার জাতীয় গড় মূল্যস্ফীতি কোনো নির্দিষ্ট পরিবার বা এলাকার বাজারদরের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে পণ্যভিত্তিক দামের বিস্তারিত তথ্য সহজে পাওয়া গেলে সরকারি হিসাবের সঙ্গে বাজারের বাস্তব পরিস্থিতি তুলনা করা সহজ হবে।
বিবিএসের মহাপরিচালক মো. শামীমুল হক জানান, তথ্য সংগ্রহে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিকভাবে অনুসৃত পদ্ধতি দেশে ব্যবহার করা হয়। ভোক্তা মূল্যসূচক বা সিপিআই প্রকাশের জন্য ৭৪৯টি পণ্য ও সেবার বিভিন্ন ধরন বিবেচনায় নেওয়া হয়। দেশের ৬৪টি জেলা, ৬টি সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামের ১৫৪টি বাজার থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এক্ষেত্রে ৪৬২টি নমুনার তথ্য নেওয়া হয়। বাজারভেদে পণ্যের ধরন ও প্রাপ্যতার পার্থক্য থাকতে পারে।
তিনি বলেন, আমরা যা তথ্য পাই, সেটার ওপর ভিত্তি করেই পরিসংখ্যান প্রকাশ করছি। আরো বাস্তবসম্মত তথ্য দেওয়ার জন্য অর্থনীতিবিদ, পরিসংখ্যানবিদ ও গবেষণা সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি সিপিআই ও ভোক্তা মূল্যসূচক নিয়ে কাজ করবে।
জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস উপলক্ষে এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘নির্ভরযোগ্য ও সহজলভ্য পরিসংখ্যান; টেকসই উন্নয়ন ও পরিকল্পনার ভিত্তি’। ২০২৫ সালে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি বছর ২০ অক্টোবর জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগে বাংলাদেশে দিবসটি ২৭ ফেব্রুয়ারি পালিত হতো। বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবস ৫ বছর পরপর পালিত হয়, পরবর্তী দিবস পালিত হবে ২০৩০ সালে।

দেশের অর্থনীতি, জনসংখ্যা, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি ও শিল্প উৎপাদনসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব খাতের নীতিনির্ধারণে ভিত্তি হিসেবে কাজ করে সরকারি পরিসংখ্যান। এসব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও প্রকাশের দায়িত্ব বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস)। যদিও দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মহলে সংস্থাটির প্রকাশিত তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আজ জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস। তবে শারদীয় দুর্গা পূজা উপলক্ষে সরকারি ছুটি থাকায় দিবসটির আনুষ্ঠানিকতা নভেম্বরে পালিত হবে।
অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের অভিযোগ, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে অর্থনৈতিক অগ্রগতির চিত্র ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তুলে ধরতে জিডিপির আকার ও প্রবৃদ্ধিসহ কিছু সূচকে অতিরঞ্জিত তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। সে সময়ের মূল্যস্ফীতির প্রকৃত চাপ পরিসংখ্যানে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়েছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বিবিএসের পরিসংখ্যান নিয়ে আস্থার সংকটের বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংস্থার মূল্যায়নেও উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালের জানুয়ারির ‘ডেটা অ্যাডিকুয়েসি অ্যাসেসমেন্ট’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জাতীয় হিসাব বা জিডিপি-সংক্রান্ত পরিসংখ্যানকে ‘সি’ রেটিং দেয়া হয়েছে। সংস্থাটির মূল্যায়নে পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা, সাপ্লাই অ্যান্ড ইউজ টেবিল নিয়মিত হালনাগাদ না করা এবং তথ্য প্রকাশে বিলম্বের বিষয়গুলো উঠে এসেছে। মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান সামগ্রিকভাবে ‘বি’ রেটিং পেলেও এর পরিধি বা ব্যাপ্তির ক্ষেত্রে দেওয়া হয়েছে ‘সি’ রেটিং। সরকারি আর্থিক পরিসংখ্যানের সময়োপযোগিতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল বলে উল্লেখ করেছে আইএমএফ।
অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত স্ট্যাটিস্টিক্যাল পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটরসে (এসপিআই) বাংলাদেশের স্কোর ১০০-এর মধ্যে ৭১ দশমিক ৬। জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থার সক্ষমতা, তথ্যের উৎস, প্রাপ্যতা এবং নীতিনির্ধারণে তথ্যের ব্যবহার মূল্যায়ন করে এ সূচক। স্কোরে এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে জাপান, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, শ্রীলংকা ও ভারত।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১২ সুপারিশ
বিবিএসের পরিসংখ্যানের গুণগত মান, স্বচ্ছতা ও প্রাপ্যতা পর্যালোচনায় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্স ১২টি সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে স্বাধীন পরিসংখ্যান ব্যুরো গঠন, সংস্থাটির নাম পরিবর্তন করে ‘স্ট্যাটিসটিকস বাংলাদেশ’ বা ‘স্ট্যাটবিডি’ করা, সাত সদস্যের ‘ট্রাস্ট অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সি কাউন্সিল অব স্ট্যাটিসটিকস’ গঠন এবং পরিসংখ্যান আইন ২০১৩ সংশোধনের প্রস্তাব ছিল। পাশাপাশি জরিপ পরিচালনা, তথ্যের গুণগত মান, উন্মুক্ত তথ্যপ্রবাহ, জবাবদিহিতা ও মহাপরিচালক নিয়োগ পদ্ধতিতে সংস্কারের বিষয়ও গুরুত্ব পায়। কিন্তু সেই অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
টাস্কফোর্সের সুপারিশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বিবিএসের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সংস্থাটির প্রধান হিসেবে একজন পেশাদার পরিসংখ্যানবিদ নিয়োগ। বর্তমানে প্রশাসন ক্যাডার থেকে মহাপরিচালক নিয়োগ দেওয়ার চর্চা নিয়ে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিএসের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, সুপারিশ বাস্তবায়নের পথে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের মতে, স্বাধীন পরিসংখ্যান ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা গেলে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর পাশাপাশি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হতো।
ব্যবহারকারীদের মধ্যেও আস্থার সংকট
বিবিএসের তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যেও সংশয় রয়েছে। সংস্থাটির নিজস্ব ‘ব্যবহারকারী সন্তুষ্টি জরিপ ২০২৪’-এ দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের ৩৩ দশমিক ১৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতিসংক্রান্ত পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন না। জরিপটি বিবিএস ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হয়।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় হিসাব বা জিডিপি-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান নিয়ে ২৬ শতাংশ উত্তরদাতা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। আয় ও দারিদ্র্যবিষয়ক পরিসংখ্যান নিয়ে সন্দিহান ২৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ। বৈদেশিক বাণিজ্যসংক্রান্ত পরিসংখ্যান নিয়ে সংশয় রয়েছে ২৯ দশমিক ৯২ শতাংশের। এছাড়া শিল্প, শ্রম ও শিক্ষাবিষয়ক পরিসংখ্যান নিয়েও ২৩ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা দ্বিধা প্রকাশ করেছেন।
মূল্যস্ফীতির সরকারি হিসাবের সঙ্গে সাধারণ মানুষের বাজার অভিজ্ঞতার পার্থক্যও এ সংশয়ের একটি কারণ। মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়, বরং দাম বাড়ার গতি কমে যাওয়া। আবার জাতীয় গড় মূল্যস্ফীতি কোনো নির্দিষ্ট পরিবার বা এলাকার বাজারদরের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে পণ্যভিত্তিক দামের বিস্তারিত তথ্য সহজে পাওয়া গেলে সরকারি হিসাবের সঙ্গে বাজারের বাস্তব পরিস্থিতি তুলনা করা সহজ হবে।
বিবিএসের মহাপরিচালক মো. শামীমুল হক জানান, তথ্য সংগ্রহে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিকভাবে অনুসৃত পদ্ধতি দেশে ব্যবহার করা হয়। ভোক্তা মূল্যসূচক বা সিপিআই প্রকাশের জন্য ৭৪৯টি পণ্য ও সেবার বিভিন্ন ধরন বিবেচনায় নেওয়া হয়। দেশের ৬৪টি জেলা, ৬টি সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামের ১৫৪টি বাজার থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এক্ষেত্রে ৪৬২টি নমুনার তথ্য নেওয়া হয়। বাজারভেদে পণ্যের ধরন ও প্রাপ্যতার পার্থক্য থাকতে পারে।
তিনি বলেন, আমরা যা তথ্য পাই, সেটার ওপর ভিত্তি করেই পরিসংখ্যান প্রকাশ করছি। আরো বাস্তবসম্মত তথ্য দেওয়ার জন্য অর্থনীতিবিদ, পরিসংখ্যানবিদ ও গবেষণা সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি সিপিআই ও ভোক্তা মূল্যসূচক নিয়ে কাজ করবে।
জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস উপলক্ষে এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘নির্ভরযোগ্য ও সহজলভ্য পরিসংখ্যান; টেকসই উন্নয়ন ও পরিকল্পনার ভিত্তি’। ২০২৫ সালে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি বছর ২০ অক্টোবর জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগে বাংলাদেশে দিবসটি ২৭ ফেব্রুয়ারি পালিত হতো। বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবস ৫ বছর পরপর পালিত হয়, পরবর্তী দিবস পালিত হবে ২০৩০ সালে।

বিবিএসের তথ্যে আস্থার ঘাটতি, সংস্কারেও ধীরগতি
নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের অর্থনীতি, জনসংখ্যা, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি ও শিল্প উৎপাদনসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব খাতের নীতিনির্ধারণে ভিত্তি হিসেবে কাজ করে সরকারি পরিসংখ্যান। এসব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও প্রকাশের দায়িত্ব বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস)। যদিও দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মহলে সংস্থাটির প্রকাশিত তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আজ জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস। তবে শারদীয় দুর্গা পূজা উপলক্ষে সরকারি ছুটি থাকায় দিবসটির আনুষ্ঠানিকতা নভেম্বরে পালিত হবে।
অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের অভিযোগ, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে অর্থনৈতিক অগ্রগতির চিত্র ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তুলে ধরতে জিডিপির আকার ও প্রবৃদ্ধিসহ কিছু সূচকে অতিরঞ্জিত তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। সে সময়ের মূল্যস্ফীতির প্রকৃত চাপ পরিসংখ্যানে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়েছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বিবিএসের পরিসংখ্যান নিয়ে আস্থার সংকটের বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংস্থার মূল্যায়নেও উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালের জানুয়ারির ‘ডেটা অ্যাডিকুয়েসি অ্যাসেসমেন্ট’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জাতীয় হিসাব বা জিডিপি-সংক্রান্ত পরিসংখ্যানকে ‘সি’ রেটিং দেয়া হয়েছে। সংস্থাটির মূল্যায়নে পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা, সাপ্লাই অ্যান্ড ইউজ টেবিল নিয়মিত হালনাগাদ না করা এবং তথ্য প্রকাশে বিলম্বের বিষয়গুলো উঠে এসেছে। মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান সামগ্রিকভাবে ‘বি’ রেটিং পেলেও এর পরিধি বা ব্যাপ্তির ক্ষেত্রে দেওয়া হয়েছে ‘সি’ রেটিং। সরকারি আর্থিক পরিসংখ্যানের সময়োপযোগিতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল বলে উল্লেখ করেছে আইএমএফ।
অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত স্ট্যাটিস্টিক্যাল পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটরসে (এসপিআই) বাংলাদেশের স্কোর ১০০-এর মধ্যে ৭১ দশমিক ৬। জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থার সক্ষমতা, তথ্যের উৎস, প্রাপ্যতা এবং নীতিনির্ধারণে তথ্যের ব্যবহার মূল্যায়ন করে এ সূচক। স্কোরে এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে জাপান, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, শ্রীলংকা ও ভারত।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১২ সুপারিশ
বিবিএসের পরিসংখ্যানের গুণগত মান, স্বচ্ছতা ও প্রাপ্যতা পর্যালোচনায় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্স ১২টি সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে স্বাধীন পরিসংখ্যান ব্যুরো গঠন, সংস্থাটির নাম পরিবর্তন করে ‘স্ট্যাটিসটিকস বাংলাদেশ’ বা ‘স্ট্যাটবিডি’ করা, সাত সদস্যের ‘ট্রাস্ট অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সি কাউন্সিল অব স্ট্যাটিসটিকস’ গঠন এবং পরিসংখ্যান আইন ২০১৩ সংশোধনের প্রস্তাব ছিল। পাশাপাশি জরিপ পরিচালনা, তথ্যের গুণগত মান, উন্মুক্ত তথ্যপ্রবাহ, জবাবদিহিতা ও মহাপরিচালক নিয়োগ পদ্ধতিতে সংস্কারের বিষয়ও গুরুত্ব পায়। কিন্তু সেই অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
টাস্কফোর্সের সুপারিশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বিবিএসের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সংস্থাটির প্রধান হিসেবে একজন পেশাদার পরিসংখ্যানবিদ নিয়োগ। বর্তমানে প্রশাসন ক্যাডার থেকে মহাপরিচালক নিয়োগ দেওয়ার চর্চা নিয়ে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিএসের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, সুপারিশ বাস্তবায়নের পথে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের মতে, স্বাধীন পরিসংখ্যান ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা গেলে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর পাশাপাশি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হতো।
ব্যবহারকারীদের মধ্যেও আস্থার সংকট
বিবিএসের তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যেও সংশয় রয়েছে। সংস্থাটির নিজস্ব ‘ব্যবহারকারী সন্তুষ্টি জরিপ ২০২৪’-এ দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের ৩৩ দশমিক ১৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতিসংক্রান্ত পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন না। জরিপটি বিবিএস ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হয়।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় হিসাব বা জিডিপি-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান নিয়ে ২৬ শতাংশ উত্তরদাতা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। আয় ও দারিদ্র্যবিষয়ক পরিসংখ্যান নিয়ে সন্দিহান ২৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ। বৈদেশিক বাণিজ্যসংক্রান্ত পরিসংখ্যান নিয়ে সংশয় রয়েছে ২৯ দশমিক ৯২ শতাংশের। এছাড়া শিল্প, শ্রম ও শিক্ষাবিষয়ক পরিসংখ্যান নিয়েও ২৩ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা দ্বিধা প্রকাশ করেছেন।
মূল্যস্ফীতির সরকারি হিসাবের সঙ্গে সাধারণ মানুষের বাজার অভিজ্ঞতার পার্থক্যও এ সংশয়ের একটি কারণ। মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়, বরং দাম বাড়ার গতি কমে যাওয়া। আবার জাতীয় গড় মূল্যস্ফীতি কোনো নির্দিষ্ট পরিবার বা এলাকার বাজারদরের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে পণ্যভিত্তিক দামের বিস্তারিত তথ্য সহজে পাওয়া গেলে সরকারি হিসাবের সঙ্গে বাজারের বাস্তব পরিস্থিতি তুলনা করা সহজ হবে।
বিবিএসের মহাপরিচালক মো. শামীমুল হক জানান, তথ্য সংগ্রহে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিকভাবে অনুসৃত পদ্ধতি দেশে ব্যবহার করা হয়। ভোক্তা মূল্যসূচক বা সিপিআই প্রকাশের জন্য ৭৪৯টি পণ্য ও সেবার বিভিন্ন ধরন বিবেচনায় নেওয়া হয়। দেশের ৬৪টি জেলা, ৬টি সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামের ১৫৪টি বাজার থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এক্ষেত্রে ৪৬২টি নমুনার তথ্য নেওয়া হয়। বাজারভেদে পণ্যের ধরন ও প্রাপ্যতার পার্থক্য থাকতে পারে।
তিনি বলেন, আমরা যা তথ্য পাই, সেটার ওপর ভিত্তি করেই পরিসংখ্যান প্রকাশ করছি। আরো বাস্তবসম্মত তথ্য দেওয়ার জন্য অর্থনীতিবিদ, পরিসংখ্যানবিদ ও গবেষণা সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি সিপিআই ও ভোক্তা মূল্যসূচক নিয়ে কাজ করবে।
জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস উপলক্ষে এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘নির্ভরযোগ্য ও সহজলভ্য পরিসংখ্যান; টেকসই উন্নয়ন ও পরিকল্পনার ভিত্তি’। ২০২৫ সালে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি বছর ২০ অক্টোবর জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগে বাংলাদেশে দিবসটি ২৭ ফেব্রুয়ারি পালিত হতো। বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবস ৫ বছর পরপর পালিত হয়, পরবর্তী দিবস পালিত হবে ২০৩০ সালে।

দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ: বিবিএস রিপোর্ট







