সাবধান, শুরু হচ্ছে আগুনের মৌসুম

সাবধান, শুরু হচ্ছে আগুনের মৌসুম
গ্রাফিক্স: সিটিজেন জার্নাল

একটি আগুনের ধোঁয়া মিলিয়ে যেতে না যেতেই কোথাও জ্বলে উঠছে নতুন শিখা। পুড়ছে গুদাম ভর্তি পণ্য, দোকান ও শিল্পকারখানা। কোথাও আগুনের গ্রাসে যাচ্ছে কর্মস্থল, আবার কোথাও পর্যটকদের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠছে মৃত্যুফাঁদ। অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিক এসব অগ্নিকাণ্ড যেন আগুনের মৌসুমের আগাম সতর্কবার্তা দিচ্ছে।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, শুষ্ক মৌসুমে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তুলনামূলক বেড়ে যায়। তাই বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে এখনই অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

এদিকে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আলাদা হলেও বারবার একই ধরনের কিছু প্রশ্ন সামনে আসছে। আগুন ঠেকাতে প্রস্তুতি কতটা, জরুরি মুহূর্তে নিরাপদে বেরিয়ে আসার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, আর একই ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকাতে আগের ঘটনাগুলো থেকে কতটা শিক্ষা নেওয়া হচ্ছে? একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের এই চিত্রে শুধু স্থাপনা ও সম্পদের নিরাপত্তা নয়, জনজীবনের নিরাপত্তা নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ।

আশুলিয়ায় পাট ও তুলার গুদামে আগুন

অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুতেই গত ৯ অক্টোবর ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় পাট, তুলা ও ঝুটের গুদামে আগুন লাগে। টানা তিন ঘণ্টার চেষ্টায় ঢাকার অদূরে সাভারের আশুলিয়ায় ঝুট ও তুলার গুদামের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিসের পাঁচটি ইউনিট। তবে আগুনে পুড়ে যায় ১৫টি গুদাম ও একটি শ্রমিক কলোনি। এ ঘটনায় শিল্প ও বাণিজ্যিক এলাকায় অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

ফতুল্লায় ২৬টি ঝুটের গুদামে আগুন

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার বিলাসনগর এলাকায় গত ১১ অক্টোবর দিবাগত রাতে আগুনে ২৬টি ঝুটের গুদামের মালামাল পুড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ইউনিট প্রায় দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় রাত সাড়ে ৩টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হননি।

দাহ্য বর্জ্য ও কাপড়ের টুকরা মজুত থাকায় এ ধরনের স্থানে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি দেখা দেয়। ঘটনাটিতে ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি গুদামগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং আগুন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির বিষয়টিও সামনে এসেছে।

চকবাজারে মার্কেটে আগুন

গত ১২ অক্টোবর পুরান ঢাকার চকবাজারের মনজুর খান প্লাজার ষষ্ঠ তলায় আগুন লাগে। ভবনটির ওই অংশে বিভিন্ন পণ্যের গুদাম ছিল। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট কাজ করে।

ফায়ার সার্ভিস জানায়, গুদামে মজুত পণ্য, ঘন ধোঁয়া ও ভবনের ভেতরে প্রবেশের জটিলতা আগুন নেভানোর কাজে বাধা তৈরি করে। অগ্নিকাণ্ডে পণ্য ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়। ওইদিন বিকেল ৫টা ৪ মিনিটে ওই মার্কেটে আগুন লাগে এবং পরদিন ভোর ৫টা ২০ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

সচিবালয়ের ভবনে আগুন

১৩ অক্টোবর বাংলাদেশ সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়। ভবনের কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাতেও অগ্নিনিরাপত্তা এবং বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার নিয়মিত পরীক্ষা কতটা জরুরি, এ ঘটনা তা আবারও সামনে এনেছে।

টঙ্গীতে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের কারখানায় আগুন

গত ১৪ অক্টোবর গাজীপুরের টঙ্গীতে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ওষুধ কারখানায় ভয়াবহ আগুন লাগে। কারখানাটির ইউনিট-২-এ লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ২১টি ইউনিটের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও বিজিবি কাজ করে। দীর্ঘ চার ঘণ্টারও বেশি সময় চেষ্টার পর দুপুরের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

সাভারের হেমায়েতপুরে মার্কেটে আগুন

একই দিন ঢাকার সাভারের হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার মাদানী সুপার মার্কেটে আগুন লাগে। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ছয়টি ইউনিট কাজ করে। ধারণা করা হয়, জেনারেটর ওভারহিটের কারণে আগুন ধরে যায় এবং কয়েকটি জেনারেটর বিস্ফোরণ হয়। এতে আগুনে আট জেনারেটরসহ কিছু মালামাল পুড়ে যায়।

টঙ্গীতে অগ্নিকাণ্ডে পুড়লো ১০ দোকান

গত ১৬ অক্টোবর দিবাগত রাতে গাজীপুরের টঙ্গীর চেরাগআলী প্রেসক্লাব মার্কেট ও আউচপাড়ার নতুনবাজারে পৃথক দুটি অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে মোট ১০টি দোকান পুড়ে যায় বলে প্রাথমিক হিসাবে জানানো হয়। দুটি ঘটনায় আনুমানিক ২৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়।

গত শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে টঙ্গীর চেরাগআলী এলাকার প্রেসক্লাব মার্কেটে প্রথম আগুন লাগে। খবর পেয়ে টঙ্গী ফায়ার স্টেশনের ২টি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আধা ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুন লাগার ঘটনায় ওই মার্কেটের ৮টি দোকানে থাকা খাবার সামগ্রী, মুদি ও মনিহারি পণ্য এবং ভাঙারির মালামালসহ বিভিন্ন সামগ্রী পুড়ে যায়। একই রাতে পৌনে ২টার দিকে টঙ্গীর আউচপাড়ার খাঁ-পাড়া রোড এলাকার নতুনবাজারে দুই মালিকের ২টি সেমিপাকা দোকানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে টঙ্গী ফায়ার স্টেশনের ৩টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে পৌনে এক ঘণ্টার প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

কক্সবাজারের রিসোর্টে প্রাণহানি

গত ১৭ অক্টোবর সকালে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। এ ঘটনায় অন্তত ১০ জনের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়। নিহতদের মধ্যে পরিবারের ছয় সদস্যসহ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলাও রয়েছেন।

রিসোর্টের মতো পর্যটনকেন্দ্রে আগুনের ঘটনায় নিরাপদে বের হওয়ার পথ, অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা এবং জরুরি উদ্ধারপ্রস্তুতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বৈদ্যুতিক ত্রুটি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।

সফিপুরে ইবনে সিনার ওষুধ কারখানায় আগুন

একই দিন বিকেলে গাজীপুরের কালিয়াকৈরের সফিপুরে ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ছয়তলা ভবনের নিচতলার একটি স্টোরে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, বিকেল ৪টা ২২ মিনিটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এবং দুই মিনিট পর সংবাদ পাওয়া যায়। প্রথম ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায় বিকেল ৪টা ৩৪ মিনিটে।

আগুন নিয়ন্ত্রণে কালিয়াকৈর ও কোনাবাড়ী ফায়ার স্টেশনের চারটি ইউনিট কাজ শুরু করে। পরে গাজীপুর চৌরাস্তা ফায়ার স্টেশন থেকে আরও দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়। প্রাথমিকভাবে ছয়টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজে যুক্ত হওয়ার কথা জানানো হয়।

জবির বাসে আগুন

আজ ১৮ অক্টোবর রাজধানীর মাতুয়াইল মাদ্রাসা বাজার এলাকার একটি বাস গ্যারেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) একটি বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাসটি মেরামতের জন্য গ্যারেজে নেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়। একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস এভাবে আগুনের কবলে পড়ায় যানবাহনের নিরাপত্তা ও গ্যারেজে অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অগ্নিনিরাপত্তায় সচেতনতার তাগিদ

ফায়ার সার্ভিসের একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, ২০২৫ সালে প্রায় ২৭ হাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর বাহিরেও অনেক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। মূলত অসচেতনতা ও নিয়ম না মানার কারণেই এসব ঘটনা বেশি ঘটে।

ঘটনাগুলোর স্থান ও স্থাপনা আলাদা হলেও কয়েকটি ঝুঁকি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বৈদ্যুতিক সংযোগের ত্রুটি, অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক চাপ, অনিরাপদভাবে দাহ্য পণ্য সংরক্ষণ, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের অকার্যকারিতা এবং জরুরি বহির্গমন পথের সীমাবদ্ধতা আগুনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওষুধ কারখানা ও গুদামে আগুন লাগলে শুধু ভবন নয়, উৎপাদনসামগ্রী ও সংরক্ষিত পণ্যও ঝুঁকির মুখে পড়ে। পাট, তুলা ও ঝুটের মতো দাহ্য উপাদান মজুত থাকা গুদামে আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। অন্যদিকে রিসোর্টে আগুন লাগলে ঘুমন্ত বা ভবনের ভেতরে অবস্থানরত অতিথিদের দ্রুত নিরাপদে বের করে আনা জরুরি হয়ে পড়ে। তাই স্থাপনার ধরন অনুযায়ী অগ্নিনিরাপত্তার পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, শীতকালে শুষ্ক মৌসুমে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তুলনামূলক বেশি ঘটে। সেই সময় প্রায় শুরু হয়ে গিয়েছে। এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং অগ্নিনিরাপত্তাসহ সংশ্লিষ্ট নিয়মকানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

/এফআর/