দায়িত্ব নেই ১১ সচিবের, ভারপ্রাপ্ত দিয়ে চলছে দুই মন্ত্রণালয়

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
দায়িত্ব নেই ১১ সচিবের, ভারপ্রাপ্ত দিয়ে চলছে দুই মন্ত্রণালয়
সরকারি লোগো

দেশের ৫৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রশাসনিক কাঠামোয় সচিব ও সমমর্যাদার কর্মকর্তা রয়েছেন ৯৪ জন। এর মধ্যে ১১ জন সচিবের বর্তমানে কোনো দাপ্তরিক দায়িত্ব নেই। তাদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত রাখা হয়েছে। একই সময়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ পূর্ণকালীন সচিব ছাড়াই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

জনপ্রশাসন-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সচিব একটি মন্ত্রণালয় বা বিভাগের প্রশাসনিক প্রধান। নীতি বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক সমন্বয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও অধীন দপ্তর-সংস্থার কার্যক্রম তদারকিতে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের দীর্ঘ সময় কোনো দাপ্তরিক দায়িত্ব ছাড়া রাখা এবং অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে ভারপ্রাপ্ত সচিব দিয়ে কাজ চালানোর বিষয়টি প্রশাসনে দক্ষ জনবল ব্যবহারের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত থাকা ১১ সচিব হলেন– মো. সাইফুল্লাহ পান্না, মো. রেজাউল মাকছুদ জাহেদী, ফারজানা মমতাজ, খান মো. নূরুল আমীন এনডিসি, জাহেদা পারভীন, মো. মফিদুর রহমান, কানিজ মওলা, মোহাম্মদ খালেদ রহীম, কাজী আনোয়ার হোসেন, মো. রায়হান কাওছার ও মো. সাখাওয়াত হোসেন।

এদিকে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ড. ফাহমিদা খানম। আর অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন আহসান হাবীব। এছাড়া সচিব হিসেবে পরবর্তী পদায়নের জন্য এক কর্মকর্তা জনপ্রশাসনে ন্যস্ত রয়েছেন।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ইয়াসমীন পারভীনকে সচিব হিসেবে পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত রাখা হয়েছে। বর্তমানে তিনি কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন না; পরবর্তী পদায়ন না হওয়া পর্যন্ত তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ন্যস্ত থাকবেন।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বর্তমান সরকার দক্ষতা, যোগ্যতা, মেধাকে গুরুত্ব দিয়ে জনপ্রশাসন সাজাচ্ছে। অতীতের স্থবিরতা কাটিয়ে জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এজন্য কাউকে বসিয়ে রেখে বেতন দিতে চায় না সরকার। মূলত কর্মকর্তাদের পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। সংযুক্তি নানা কারণেই হতে পারে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত ১১ সচিবের সবাই প্রশাসনের মাঠপর্যায় ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। মো. সাইফুল্লাহ পান্না ভূমি আপিল বোর্ড ও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে; মো. রেজাউল মাকছুদ জাহেদী মাঠ প্রশাসন, জনপ্রশাসন, পানিসম্পদ ও সরকারি কর্ম কমিশনে; ফারজানা মমতাজ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে; খান মো. নূরুল আমীন স্বাস্থ্যসেবা ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে; জাহেদা পারভীন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সমন্বয় ও সংস্কার অনুবিভাগে; মো. মফিদুর রহমান জনপ্রশাসন, অর্থ ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে; কানিজ মওলা আইএমইডি, জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে; মোহাম্মদ খালেদ রহীম মাঠ প্রশাসন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও দুদকে; কাজী আনোয়ার হোসেন স্থানীয় সরকার ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে; মো. রায়হান কাওছার ভূমি এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন খাতে এবং মো. সাখাওয়াত হোসেন মাঠ প্রশাসন এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত থাকা সচিব পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সচিব পদ প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি। এ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারা দীর্ঘ কর্মজীবনে মাঠ প্রশাসন, মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ফলে সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের কোনো দাপ্তরিক দায়িত্ব ছাড়াই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত রাখার ফলে তাদের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান সরকারের কাজে ব্যবহারের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।’

সংশ্লিষ্টদের মতে, জনপ্রশাসনে কর্মকর্তাদের পদায়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। ফলে দায়িত্বহীন থাকা ১১ সচিবের ক্ষেত্রেও পরবর্তী সময়ে পদায়ন হতে পারে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে দাপ্তরিক দায়িত্ব না থাকলে প্রশাসনের জন্য তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অব্যবহৃত থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়।

সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সাবেক রেক্টর একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গত ১৫-২০ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, সরকার হয়তো তাদের আর বিশ্বাসযোগ্য মনে করছে না। শুধু সরকারের দোষ দিলেও বিষয়টি পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যাবে না। আমরা সিভিল সার্ভিসকে এমন জায়গায় নিয়ে গিয়েছি, যেখানে সরকার কর্মকর্তাদের অবিশ্বাস করার হাজারটা কারণ খুঁজে পেতে পারে। সরকার যদি কোনো কর্মকর্তাকে অবিশ্বাস করে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তাকে গুরুত্বপূর্ণ কাজে লাগানো কঠিন হয়ে পড়ে।’

/এসআর/