শিরোনাম
এক্সপ্লেইনার

কেন লোহিত সাগর কেন্দ্রিক সামরিক জোট গঠন করছে সৌদি আরব

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
কেন লোহিত সাগর কেন্দ্রিক সামরিক জোট গঠন করছে সৌদি আরব
এডেনে অবস্থিত ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের একটি নৌযান লোহিত সাগরের নৌপথে টহল দিচ্ছে। ছবি: আল জাজিরা

ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের অব্যাহত হামলা থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগরকে রক্ষা করতে আন্তর্জাতিক সামরিক জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি আরব। সমুদ্রপথে জ্বালানি ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সুরক্ষিত রাখতে গঠিত এই জোটের সদর দপ্তর হবে রিয়াদে। নতুন এই কাঠামোর অংশ হিসেবে বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং সদস্যপদ নিশ্চিত করার জন্য সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে রিয়াদ। মধ্যপ্রাচ্য ও লোহিত সাগর উপকূলের অন্তত তিনটি দেশ- মিশর, জিবুতি ও সুদান ইতোমধ্যে এতে যোগ দিতে সম্মতি জানিয়েছে।

সৌদি আরবের এ জোটে যোগ দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, তুরস্ক ও সোমালিয়ার পাশাপাশি জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালির মতো ইউরোপীয় দেশগুলোকেও আহ্বান জানানো হয়েছে। যদিও প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এখনও তাদের অংশগ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি। তবে তারা এতে যোগ দেবে বলেই মনে করা হচ্ছে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতি ও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি জানান, ইরান ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে পড়ুক তা সৌদি আরব চায় না। তবে যেকোনো হামলায় নিজেদের রক্ষা করতে দেশটি পুরোপুরি প্রস্তুত। এছাড়া ইয়েমেনের হুথি পরিস্থিতি সৌদি আরব নিজেই সামলাতে সক্ষম এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই বলেও ওয়াশিংটনকে জানানো হয়।

কেন লোহিত সাগর কেন্দ্রিক সামরিক জোট গঠন করছে সৌদি আরব (1)
বাব আল-মানদেব প্রণালি

লোহিত সাগরের এ চরম উত্তেজনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এশিয়ার সঙ্গে ইউরোপ ও আফ্রিকার বাণিজ্যের অন্যতম মূল চাবিকাঠি হলো এই জলপথ, যা দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য পরিবহণের প্রায় ৩০ শতাংশ পরিচালিত হয়। বিশেষ করে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করা বাব আল-মানদেব প্রণালিটি বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের মূল পথ হিসেবে কাজ করে। মাত্র ২৯ কিলোমিটার চওড়া এ সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে প্রতিবছর বিশ্বের প্রায় পাঁচ শতাংশ অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়। কিন্তু মার্কিন-ইরান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় সৌদি আরব তাদের রপ্তানি তেলের একটি বড় অংশ লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে লোহিত সাগরে সৃষ্টি হওয়া সামান্য অস্থিরতাও বৈশ্বিক শক্তি সরবরাহ ও অর্থনীতিতে ভয়াবহ ধাক্কা দিচ্ছে।

২০ জুলাই সৌদি আরবের ওপর নৌশুল্ক ও সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দেয় ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। তারা অভিযোগ তোলে, সৌদি আরব দীর্ঘ ১২ বছর ধরে ইয়েমেনের ওপর অমানবিক অবরোধ চাপিয়ে রেখেছে এবং তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করছে। এরপর থেকেই লোহিত সাগরে সৌদি তেল ট্যাঙ্কার এনসিসি গজলসহ একাধিক বাণিজ্য জাহাজে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় তারা। ২০১৪ সালে সানা দখলের পর থেকে এডেন ভিত্তিক আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসা হুথিরা এর আগেও ২০২৩ সালে গাজা ইস্যুতে ইসরায়েল-সংক্রান্ত জাহাজগুলোতে হামলা চালিয়েছিল।

পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিয়েছে যখন খবর আসে, হুথিরা এখন বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর কর বা শুল্ক আরোপ করার পরিকল্পনা করছে। ইরানের বিতর্কিত নীতি অনুকরণ করে আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করেই তারা এ অর্থ আদায়ের ছক কষছে। যদিও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী প্রাকৃতিক জলপথে সীমান্তবর্তী কোনো দেশ বাণিজ্য জাহাজের ওপর অতিরিক্ত মাশুল বা টোল আদায় করতে পারে না। ইয়েমেন সরকারের মতে, এ অর্থ হুথিরা তাদের সামরিক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের স্থায়ী উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।

এই তীব্র টানাটানির প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে থমকে গেছে। যেখানে স্বাভাবিক সময়ে বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে দিনে ৭০টিরও বেশি জাহাজ চলাচল করত, সেখানে তা নেমে এসেছে হাতে গোনা কয়েকটিতে। লোহিত সাগরের এ নিরাপত্তা সংকটের রেশ সরাসরি পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে। কয়েকদিন আগেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন করে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি করেছে।

সূত্র: আল জাজিরা

/এমএকে/