ডলি কনস্ট্রাকশনের ঋণের ফাঁদে রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংক

ডলি কনস্ট্রাকশনের ঋণের ফাঁদে রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংক
মরিয়ম সেঁজুতি

ভুয়া নথি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা, রূপালী এবং অগ্রণী ব্যাংক থেকে বিশাল অঙ্কের ঋণ নিয়েছে ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। এই ঋণ এখন পুরোপুরি খেলাপি হয়ে গেছে। এর মধ্যে রূপালী ব্যাংকের ঋণ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন ও চেয়ারম্যান ডলি আক্তারের নামে মামলা করেছে।
জানা গেছে, যাচাই-বাছাই ছাড়া ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নামে ঋণ দিয়ে বিপাকে পড়েছে রূপালী, অগ্রণী ও জনতা ব্যাংক পিএলসি। ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা ঋণ আদায় নিয়ে দুশ্চিন্তায় মধ্যে আছে। কোনো মর্টগেজ (স্থাবর সম্পদ) নেই। ‘কো-লেটারাল‘ বলতে দেওয়া হয়েছে কিছু ‘ওয়ার্ক অর্ডার’। এভাবে শুধু সরকারি উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কার্যাদেশের বিপরীতে তিন ব্যাংক থেকে ৮০৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। এর মধ্যে মাত্র ১৩ কোটির টাকার জামানত দিয়ে রূপালী ব্যাংক থেকে ৪৮৯ কোটির ঋণ নিয়েছে, যা এখন সুদে-আসলে ৬৫০ কোটি টাকা হয়েছে। এছাড়া অগ্রণী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে ৮০ কোটি টাকা, যা সুদ-আসলে হয়েছে ১৩৫ কোটি টাকা। আর জনতা ব্যাংকের ৮০ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ২০ কোটি টাকা নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এখন ৬০ কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার সীমা (লিমিট) রয়েছে। তবে বাকি ঋণ নিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। অবশ্য যা নিয়েছেন তা-ও এখন খেলাপি।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের চেয়ারম্যান ডলি আক্তার, রূপালী ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ের সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক খালেদ হোসেন মল্লিক, সাবেক সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. সোলায়মান, স্থানীয় কার্যালয়ের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মো. গোলাম সারোয়ার, সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, পল্টন শাখার উপমহাব্যবস্থাপক (সাবেক সহকারী মহাব্যবস্থাপক মতিঝিল করপোরেট শাখা) এএসএম মোরশেদ আলী ও জিওগ্রাফ সার্ভে করপোরেশন লিমিটেডের মালিক মো. পারভেজ বিন কামাল।
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, ডলি কনস্ট্রাকশনের এমডি মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন ২০১৩ সালের ১৬ জানুয়ারি রূপালী ব্যাংকের মতিঝিল করপোরেট শাখায় একটি চলতি হিসাব খোলেন। এরপর ২০১৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের উন্নয়নমূলক কাজের কার্যাদেশ লিয়েন (ঋণ বা আর্থিক দায় শোধ নিশ্চিত করতে জামানত হিসেবে সম্পদ) রাখার শর্তে ১০৪ কোটি টাকা ঋণের আবেদন করেন। এরপর সংশ্লিষ্ট শাখা, বিভাগীয় ও প্রধান কার্যালয়ের শিল্পঋণ বিভাগের সুপারিশের ভিত্তিতে ২০১৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পরিচালনা পর্ষদের ৯৯০তম বোর্ড সভায় ৫৫ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর থেকে কয়েক দফায় প্রতিষ্ঠানটির নামে ঋণ অনুমোদন করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ডলি কনস্ট্রাকশন ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণের ৭৫১ কোটি ৯৯ লাখ ৮৬ হাজার ১০৬ কোটি টাকা উত্তোলন করে। এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩০৮ কোটি ৫৩ লাখ ৯০ হাজার ৬০১ টাকা পরিশোধ করে। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৪৮৯ কোটি ৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৭৫ টাকা, যা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
কে এই ডলি কনস্ট্রাকশনের এমডি
ডলি কনস্ট্রাকশনের মালিক নাসির উদ্দিন। তিনি তার স্ত্রী ডলি আক্তারের নামে ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড চালু করেন। তার আসল বাড়ি ফরিদপুরের চরভদ্রাসনের ঝাউকান্দা ইউনিয়নে। তবে নদী ভাঙনের কারণে তারা পরে ঢাকার দোহারের চরমাহামুদপুর ইউনিয়নে এসে বসতি গড়ে তোলেন।
কাজের ধরণ
ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), গণপূর্ত অধিদপ্তর (পিডব্লিউডি), সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (আরএইচডি) এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অধীন প্রকল্পের ঠিকাদারি কাজ করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রূপালী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ঋণ আদায় করার কোনো পথ নেই। এদের কোনো জামানত নেই। সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের ওয়ার্ক অর্ডারের ভিত্তিতে এদের ঋণ দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগের আমলে পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে কাজ শেষ না করেই অর্থ তুলে নিয়েছে। ফলে ওই প্রতিষ্ঠানের নামে মামলা হয়েছে। এ কারণে এখন আর কোনো সরকারই নতুন করে কাজ দেবে না। নতুন করে কাজ দেওয়ার কোনো পথ নেই।
জানা গেছে, তিন ব্যাংকের অনুকূলে লিয়েনকৃত ১১৫টি কার্যাদেশের চুক্তি মূল্য ৭২৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। কিন্তু গ্রাহকের অনুকূলে মোট উত্তোলনে সুবিধা দেওয়া হয়েছে প্রায় ৫৯৬ কোটি ২৬ লাখ টাকার। মঞ্জুরিপত্রের শর্ত অনুযায়ী কার্যাদেশ চুক্তি মূল্যের সর্বোচ্চ ৮০ ভাগ ঋণ বিতরণ করার সুযোগ আছে। তবে ওই শর্ত লঙ্ঘন করে গ্রাহককে কার্যাদেশ চুক্তি মূল্যের প্রায় ৮২.১৯ শতাংশ টাকা উত্তোলনের বাড়তি সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
ডলি কনস্ট্রাকশনের ঋণ আদায় চেষ্টা চলেছে। প্রতিষ্ঠানটির এমডি নাসির উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ হয়েছে। তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী ঋণ রিশিডিউল বা পুনঃতফসিল করতে বলা হয়েছে।
সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ,
চেয়ারম্যান, অগ্রণী ব্যাংক
এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘ডলি কনস্ট্রাকশনের ঋণ আদায় চেষ্টা চলেছে। প্রতিষ্ঠানটির এমডি নাসির উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ হয়েছে। তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী ঋণ রিশিডিউল বা পুনঃতফসিল করতে বলা হয়েছে।’
এ বিষয়ে জনতা ব্যাংকের এমডি মজিবর রহমান সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘আমরা খেলাপি ঋণ আদায় করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি। কাউকে ছাড় দিচ্ছি না। সেখানে ডলি কনস্ট্রাকশনের ঋণ আদায়েও সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ‘মেসার্স ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’ (ট্রেড লাইসেন্স নং-০৩৯৬৫২) রাষ্ট্রায়ত্ত ৩টি ব্যাংকের মাধ্যমে নির্মাণ ব্যবসা পরিচালনা করছে। ব্যাংকগুলো হচ্ছে অগ্রণী, জনতা এবং রূপালী ব্যাংক পিএলসি। রূপালী ব্যাংক মতিঝিল শাখা, অগ্রণী ব্যাংক আমিনকোর্ট শাখা, জনতা ব্যাংক স্থানীয় কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসায়িক লেনদেন করে। ব্যাংক হিসাবগুলো ‘মেসার্স হৃদয় ট্রেডার্স’, ‘হৃদয় এন্টারপ্রাইজ প্রাইভেট লিমিটেড’ ‘ডলি অটো স্পিনিং মিলস লিমিটেড’ এবং ‘উদয় ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’সহ কয়েকটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নামে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান মেসার্স ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অতিমূল্যায়ণ করা হয় ডলি কনস্ট্রাকশনের আর্থিক প্রতিবেদনে। নির্ধারিত ঋণসীমার অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের লক্ষ্যেই প্রতিবেদনে অতিমূল্যায়ন করা হয়। বিভিন্ন সরকারি কার্যাদেশের (ওয়ার্ক অর্ডার) বিপরীতে ঋণ দেওয়া হয় বিপুল অঙ্কের ঋণ। অথচ যেসব কার্যাদেশের বিপরীতে ঋণ দেওয়া হয়, সেগুলো ব্যাংকটির সংশ্লিষ্ট শাখায় সংরক্ষণও করা হয়নি। এভাবে রূপালী ও অগ্রণী ব্যাংক থেকে ডলি কনস্ট্রাকশন জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেয় ৫৪৫ কোটি টাকা।
অগ্রণী ব্যাংককে জরিমানা
অগ্রণী ব্যাংক থেকে ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের অনিয়ম করে নেওয়া ঋণের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে বলেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্দেশনার ১০ মাস পরেও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ২০২২ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকটিকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, পাউবোর মোট ৩২৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকার দুটি কার্যাদেশের বিপরীতে ডলি কনস্ট্রাকশন ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অগ্রণী ব্যাংক থেকে ১৪০ কোটি ১৩ লাখ টাকা তুলেছে। নিয়ম অনুযায়ী কার্যাদেশের বিপরীতে এই পরিমাণ টাকা তুলতে প্রতিষ্ঠানটির অন্তত ২৮০ কোটি ২৬ লাখ টাকা বা কার্যাদেশ দুটির ৮৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ কাজ শেষ করার কথা। তবে ওই সময় পর্যন্ত বাস্তবে ডলি কনস্ট্রাকশন শেষ করেছিল মাত্র ৩৫ শতাংশ কাজ।
অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি ১১৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকার কাজ শেষ করেই অগ্রণী ব্যাংক থেকে ১৪০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এই পরিমাণ কাজের বিপরীতে ডলি কনস্ট্রাকশন ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ ৫৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা তুলতে পারে। সে হিসাবে প্রতিষ্ঠানটি অনিয়ম করে ব্যাংক থেকে ৮২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা অতিরিক্ত তুলে নিয়েছে।
এখানেই শেষ নয়। ১১৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকার কাজ শেষ করার বিল ব্যাংকে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তারা জমা দিয়েছে মাত্র ৫১ কোটি ৬ লাখ টাকা। বাকি ৬৩ কোটি ৮৭ কোটি টাকা বিলের বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের কাছে জানতে চাইলেও তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কিছুই জানায়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, পাউবোর কার্যাদেশ দুটির মেয়াদ ২০২১ সালের ১৫ এপ্রিল শেষ হয়েছে। সেইসঙ্গে অগ্রণী ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের বর্ধিত মেয়াদও ফুরিয়েছে ২০২১ সালের ৬ জুন। এসব সময়সীমা শেষ হলেও ব্যাংকটি থেকে নেওয়া ১০৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণ এখনো পরিশোধ করেনি ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড।
এছাড়া পাউবোর সীমান্ত নদী তীর সংরক্ষণ ও উন্নয়ন (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পের আওতায় এক কার্যাদেশের বিপরীতে ১০০ কোটি টাকা ওভারড্রাফট সীমা অনুমোদন করেছিল অগ্রণী ব্যাংক। তবে প্রতিষ্ঠানটি ওই কার্যাদেশের বিপরীতে টাকা না তুলে অন্য আরেকটি কার্যাদেশের বিপরীতে এই টাকা তুলেছে। নিয়ম অনুযায়ী, এটিও গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানান ব্যাংক কর্মকর্তারা।
ডলি কনস্ট্রাকশনের এমডির বক্তব্য
ব্যাংকের ঋণ আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নাসির উদ্দিন মোবাইলফোনে সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘আমরা ২০১২ সালে ব্যবসা শুরু করি। রূপালী ব্যাংকে ১২৫ কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে সম্পত্তি বন্ধক রাখা হয়। ব্যাংক থেকে আমরা ৩৫০ কোটি টাকা নিই এবং নির্ধারিত সময়ে ৪৪২ কোটি টাকা পরিশোধ করি। এরপরও বিভিন্ন প্রকল্পে আমার ৪৯৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ থাকা অবস্থায় ব্যাংক হঠাৎ ৫২টি ব্যাংক গ্যারান্টির মেয়াদ বাড়ানো বন্ধ করে দেয়। ফলে আমার পুরো টাকা আটকে যায় এবং বাধ্য হয়ে আমি টাকা আটকে দেওয়ার ঘটনা ও ব্যাংক গ্যারান্টির মেয়াদ বাড়ানো বন্ধের ঘটনায় ব্যাংকের বিরুদ্ধে ৩৫০ কোটি টাকার মামলা করি।’
রূপালী ব্যাংকে কাঁচপুর ব্রিজের কাছে আমাদের ৫৭৫ কোটি টাকার জমি বন্ধক আছে। আটকে থাকা টাকা ও সুদের হিসাব মেলালে ব্যাংক আমার কাছে আর কোনো টাকাই পাবে না।
নাসির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডলি কনস্ট্রাকশন
নাসির উদ্দিন দাবি করেন, ‘রূপালী ব্যাংকে কাঁচপুর ব্রিজের কাছে আমাদের ৫৭৫ কোটি টাকার জমি বন্ধক আছে। আটকে থাকা টাকা ও সুদের হিসাব মেলালে ব্যাংক আমার কাছে আর কোনো টাকাই পাবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০১৮ সালে আমি ঢাকা জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পরই তৎকালীন সংসদ সদস্য সালমান এফ রহমানের নজরে পড়ি। আমার রাজনৈতিক পরিচয় জেনে রূপালী ব্যাংকের তৎকালীন এমডি ওবায়দুল্লাহ মাসুদ ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) ব্যবহার করে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। দুদকে মামলা ও একটি টিভি চ্যানেলে আমার বিরুদ্ধে প্রতিবেদন হওয়ায় আমার প্রতিষ্ঠানের সারাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বাতিল করে দেওয়া হয়।’
নাসির উদ্দিনের অভিযোগ, ‘আমাকে রূপালী ব্যাংক বেশি ডিস্টার্ব করেছে। আমার কাছ থেকে নিয়েছে বেশি। সরকার এখন আরোপিত সুদ মওকুফ করছে। আমি যখন ৪৪২ কোটি টাকা দিয়েছি। সব কিছু বাদ দিলেও রূপালী ব্যাংক আমার কাছে ১০ টাকাও পাবে না। কারণ আমি সরকারের কাছে ৪৯৫ কোটি টাকা পাই।’
ডলি কনস্ট্রাকশনের এমডি নাসির উদ্দিন জানান, ‘খুলনা শিপইয়ার্ডের সাড়ে ৪০০ কোটি টাকার কাজের বিপরীতে ১০০ কোটি টাকা ছাড় করা হয় (যার ৯০ কোটি টাকা তুলে ৬৫ কোটি পরিশোধ করেছি)। করোনাকালে সরকারের এক প্রভাবশালী আমলার আত্মীয়কে কাজ পাইয়ে দিতে আমার সব বিল ও ব্যাংক লিমিট আটকে দেওয়া হয়। আমি নিজের ১৮০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও বিল না পাওয়ায় খুলনা শিপইয়ার্ড ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিরুদ্ধে মামলা করি।’
নাসির উদ্দিন জনতা ব্যাংকের ঋণের বিষয়ে বলেন, জনতা ব্যাংক ২০১৯ সালে ৮০ কোটি টাকার ঋণ পাস করেছে। কিন্তু ২০২০ সালে ৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা দেওয়ার পর তারা এখন পর্যন্ত আর কোনো টাকা দেয়নি। তিনি দাবি করেন, ‘দুদক থেকে আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছিল। আমরা দুদককে পুনরায় তদন্ত করার জন্য বলেছি। দুদক পুনরায় তদন্ত না করলে আবার আবার মামলা করবো।’
এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম বলেন, তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। দুদকের নতুন কমিশন দায়িত্ব নিলে খুব শিগগিরই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ভুয়া নথি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা, রূপালী এবং অগ্রণী ব্যাংক থেকে বিশাল অঙ্কের ঋণ নিয়েছে ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। এই ঋণ এখন পুরোপুরি খেলাপি হয়ে গেছে। এর মধ্যে রূপালী ব্যাংকের ঋণ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন ও চেয়ারম্যান ডলি আক্তারের নামে মামলা করেছে।
জানা গেছে, যাচাই-বাছাই ছাড়া ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নামে ঋণ দিয়ে বিপাকে পড়েছে রূপালী, অগ্রণী ও জনতা ব্যাংক পিএলসি। ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা ঋণ আদায় নিয়ে দুশ্চিন্তায় মধ্যে আছে। কোনো মর্টগেজ (স্থাবর সম্পদ) নেই। ‘কো-লেটারাল‘ বলতে দেওয়া হয়েছে কিছু ‘ওয়ার্ক অর্ডার’। এভাবে শুধু সরকারি উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কার্যাদেশের বিপরীতে তিন ব্যাংক থেকে ৮০৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। এর মধ্যে মাত্র ১৩ কোটির টাকার জামানত দিয়ে রূপালী ব্যাংক থেকে ৪৮৯ কোটির ঋণ নিয়েছে, যা এখন সুদে-আসলে ৬৫০ কোটি টাকা হয়েছে। এছাড়া অগ্রণী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে ৮০ কোটি টাকা, যা সুদ-আসলে হয়েছে ১৩৫ কোটি টাকা। আর জনতা ব্যাংকের ৮০ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ২০ কোটি টাকা নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এখন ৬০ কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার সীমা (লিমিট) রয়েছে। তবে বাকি ঋণ নিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। অবশ্য যা নিয়েছেন তা-ও এখন খেলাপি।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের চেয়ারম্যান ডলি আক্তার, রূপালী ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ের সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক খালেদ হোসেন মল্লিক, সাবেক সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. সোলায়মান, স্থানীয় কার্যালয়ের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মো. গোলাম সারোয়ার, সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, পল্টন শাখার উপমহাব্যবস্থাপক (সাবেক সহকারী মহাব্যবস্থাপক মতিঝিল করপোরেট শাখা) এএসএম মোরশেদ আলী ও জিওগ্রাফ সার্ভে করপোরেশন লিমিটেডের মালিক মো. পারভেজ বিন কামাল।
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, ডলি কনস্ট্রাকশনের এমডি মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন ২০১৩ সালের ১৬ জানুয়ারি রূপালী ব্যাংকের মতিঝিল করপোরেট শাখায় একটি চলতি হিসাব খোলেন। এরপর ২০১৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের উন্নয়নমূলক কাজের কার্যাদেশ লিয়েন (ঋণ বা আর্থিক দায় শোধ নিশ্চিত করতে জামানত হিসেবে সম্পদ) রাখার শর্তে ১০৪ কোটি টাকা ঋণের আবেদন করেন। এরপর সংশ্লিষ্ট শাখা, বিভাগীয় ও প্রধান কার্যালয়ের শিল্পঋণ বিভাগের সুপারিশের ভিত্তিতে ২০১৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পরিচালনা পর্ষদের ৯৯০তম বোর্ড সভায় ৫৫ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর থেকে কয়েক দফায় প্রতিষ্ঠানটির নামে ঋণ অনুমোদন করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ডলি কনস্ট্রাকশন ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণের ৭৫১ কোটি ৯৯ লাখ ৮৬ হাজার ১০৬ কোটি টাকা উত্তোলন করে। এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩০৮ কোটি ৫৩ লাখ ৯০ হাজার ৬০১ টাকা পরিশোধ করে। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৪৮৯ কোটি ৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৭৫ টাকা, যা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
কে এই ডলি কনস্ট্রাকশনের এমডি
ডলি কনস্ট্রাকশনের মালিক নাসির উদ্দিন। তিনি তার স্ত্রী ডলি আক্তারের নামে ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড চালু করেন। তার আসল বাড়ি ফরিদপুরের চরভদ্রাসনের ঝাউকান্দা ইউনিয়নে। তবে নদী ভাঙনের কারণে তারা পরে ঢাকার দোহারের চরমাহামুদপুর ইউনিয়নে এসে বসতি গড়ে তোলেন।
কাজের ধরণ
ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), গণপূর্ত অধিদপ্তর (পিডব্লিউডি), সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (আরএইচডি) এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অধীন প্রকল্পের ঠিকাদারি কাজ করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রূপালী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ঋণ আদায় করার কোনো পথ নেই। এদের কোনো জামানত নেই। সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের ওয়ার্ক অর্ডারের ভিত্তিতে এদের ঋণ দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগের আমলে পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে কাজ শেষ না করেই অর্থ তুলে নিয়েছে। ফলে ওই প্রতিষ্ঠানের নামে মামলা হয়েছে। এ কারণে এখন আর কোনো সরকারই নতুন করে কাজ দেবে না। নতুন করে কাজ দেওয়ার কোনো পথ নেই।
জানা গেছে, তিন ব্যাংকের অনুকূলে লিয়েনকৃত ১১৫টি কার্যাদেশের চুক্তি মূল্য ৭২৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। কিন্তু গ্রাহকের অনুকূলে মোট উত্তোলনে সুবিধা দেওয়া হয়েছে প্রায় ৫৯৬ কোটি ২৬ লাখ টাকার। মঞ্জুরিপত্রের শর্ত অনুযায়ী কার্যাদেশ চুক্তি মূল্যের সর্বোচ্চ ৮০ ভাগ ঋণ বিতরণ করার সুযোগ আছে। তবে ওই শর্ত লঙ্ঘন করে গ্রাহককে কার্যাদেশ চুক্তি মূল্যের প্রায় ৮২.১৯ শতাংশ টাকা উত্তোলনের বাড়তি সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
ডলি কনস্ট্রাকশনের ঋণ আদায় চেষ্টা চলেছে। প্রতিষ্ঠানটির এমডি নাসির উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ হয়েছে। তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী ঋণ রিশিডিউল বা পুনঃতফসিল করতে বলা হয়েছে।
সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ,
চেয়ারম্যান, অগ্রণী ব্যাংক
এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘ডলি কনস্ট্রাকশনের ঋণ আদায় চেষ্টা চলেছে। প্রতিষ্ঠানটির এমডি নাসির উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ হয়েছে। তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী ঋণ রিশিডিউল বা পুনঃতফসিল করতে বলা হয়েছে।’
এ বিষয়ে জনতা ব্যাংকের এমডি মজিবর রহমান সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘আমরা খেলাপি ঋণ আদায় করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি। কাউকে ছাড় দিচ্ছি না। সেখানে ডলি কনস্ট্রাকশনের ঋণ আদায়েও সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ‘মেসার্স ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’ (ট্রেড লাইসেন্স নং-০৩৯৬৫২) রাষ্ট্রায়ত্ত ৩টি ব্যাংকের মাধ্যমে নির্মাণ ব্যবসা পরিচালনা করছে। ব্যাংকগুলো হচ্ছে অগ্রণী, জনতা এবং রূপালী ব্যাংক পিএলসি। রূপালী ব্যাংক মতিঝিল শাখা, অগ্রণী ব্যাংক আমিনকোর্ট শাখা, জনতা ব্যাংক স্থানীয় কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসায়িক লেনদেন করে। ব্যাংক হিসাবগুলো ‘মেসার্স হৃদয় ট্রেডার্স’, ‘হৃদয় এন্টারপ্রাইজ প্রাইভেট লিমিটেড’ ‘ডলি অটো স্পিনিং মিলস লিমিটেড’ এবং ‘উদয় ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’সহ কয়েকটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নামে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান মেসার্স ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অতিমূল্যায়ণ করা হয় ডলি কনস্ট্রাকশনের আর্থিক প্রতিবেদনে। নির্ধারিত ঋণসীমার অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের লক্ষ্যেই প্রতিবেদনে অতিমূল্যায়ন করা হয়। বিভিন্ন সরকারি কার্যাদেশের (ওয়ার্ক অর্ডার) বিপরীতে ঋণ দেওয়া হয় বিপুল অঙ্কের ঋণ। অথচ যেসব কার্যাদেশের বিপরীতে ঋণ দেওয়া হয়, সেগুলো ব্যাংকটির সংশ্লিষ্ট শাখায় সংরক্ষণও করা হয়নি। এভাবে রূপালী ও অগ্রণী ব্যাংক থেকে ডলি কনস্ট্রাকশন জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেয় ৫৪৫ কোটি টাকা।
অগ্রণী ব্যাংককে জরিমানা
অগ্রণী ব্যাংক থেকে ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের অনিয়ম করে নেওয়া ঋণের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে বলেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্দেশনার ১০ মাস পরেও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ২০২২ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকটিকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, পাউবোর মোট ৩২৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকার দুটি কার্যাদেশের বিপরীতে ডলি কনস্ট্রাকশন ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অগ্রণী ব্যাংক থেকে ১৪০ কোটি ১৩ লাখ টাকা তুলেছে। নিয়ম অনুযায়ী কার্যাদেশের বিপরীতে এই পরিমাণ টাকা তুলতে প্রতিষ্ঠানটির অন্তত ২৮০ কোটি ২৬ লাখ টাকা বা কার্যাদেশ দুটির ৮৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ কাজ শেষ করার কথা। তবে ওই সময় পর্যন্ত বাস্তবে ডলি কনস্ট্রাকশন শেষ করেছিল মাত্র ৩৫ শতাংশ কাজ।
অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি ১১৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকার কাজ শেষ করেই অগ্রণী ব্যাংক থেকে ১৪০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এই পরিমাণ কাজের বিপরীতে ডলি কনস্ট্রাকশন ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ ৫৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা তুলতে পারে। সে হিসাবে প্রতিষ্ঠানটি অনিয়ম করে ব্যাংক থেকে ৮২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা অতিরিক্ত তুলে নিয়েছে।
এখানেই শেষ নয়। ১১৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকার কাজ শেষ করার বিল ব্যাংকে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তারা জমা দিয়েছে মাত্র ৫১ কোটি ৬ লাখ টাকা। বাকি ৬৩ কোটি ৮৭ কোটি টাকা বিলের বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের কাছে জানতে চাইলেও তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কিছুই জানায়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, পাউবোর কার্যাদেশ দুটির মেয়াদ ২০২১ সালের ১৫ এপ্রিল শেষ হয়েছে। সেইসঙ্গে অগ্রণী ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের বর্ধিত মেয়াদও ফুরিয়েছে ২০২১ সালের ৬ জুন। এসব সময়সীমা শেষ হলেও ব্যাংকটি থেকে নেওয়া ১০৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণ এখনো পরিশোধ করেনি ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড।
এছাড়া পাউবোর সীমান্ত নদী তীর সংরক্ষণ ও উন্নয়ন (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পের আওতায় এক কার্যাদেশের বিপরীতে ১০০ কোটি টাকা ওভারড্রাফট সীমা অনুমোদন করেছিল অগ্রণী ব্যাংক। তবে প্রতিষ্ঠানটি ওই কার্যাদেশের বিপরীতে টাকা না তুলে অন্য আরেকটি কার্যাদেশের বিপরীতে এই টাকা তুলেছে। নিয়ম অনুযায়ী, এটিও গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানান ব্যাংক কর্মকর্তারা।
ডলি কনস্ট্রাকশনের এমডির বক্তব্য
ব্যাংকের ঋণ আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নাসির উদ্দিন মোবাইলফোনে সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘আমরা ২০১২ সালে ব্যবসা শুরু করি। রূপালী ব্যাংকে ১২৫ কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে সম্পত্তি বন্ধক রাখা হয়। ব্যাংক থেকে আমরা ৩৫০ কোটি টাকা নিই এবং নির্ধারিত সময়ে ৪৪২ কোটি টাকা পরিশোধ করি। এরপরও বিভিন্ন প্রকল্পে আমার ৪৯৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ থাকা অবস্থায় ব্যাংক হঠাৎ ৫২টি ব্যাংক গ্যারান্টির মেয়াদ বাড়ানো বন্ধ করে দেয়। ফলে আমার পুরো টাকা আটকে যায় এবং বাধ্য হয়ে আমি টাকা আটকে দেওয়ার ঘটনা ও ব্যাংক গ্যারান্টির মেয়াদ বাড়ানো বন্ধের ঘটনায় ব্যাংকের বিরুদ্ধে ৩৫০ কোটি টাকার মামলা করি।’
রূপালী ব্যাংকে কাঁচপুর ব্রিজের কাছে আমাদের ৫৭৫ কোটি টাকার জমি বন্ধক আছে। আটকে থাকা টাকা ও সুদের হিসাব মেলালে ব্যাংক আমার কাছে আর কোনো টাকাই পাবে না।
নাসির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডলি কনস্ট্রাকশন
নাসির উদ্দিন দাবি করেন, ‘রূপালী ব্যাংকে কাঁচপুর ব্রিজের কাছে আমাদের ৫৭৫ কোটি টাকার জমি বন্ধক আছে। আটকে থাকা টাকা ও সুদের হিসাব মেলালে ব্যাংক আমার কাছে আর কোনো টাকাই পাবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০১৮ সালে আমি ঢাকা জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পরই তৎকালীন সংসদ সদস্য সালমান এফ রহমানের নজরে পড়ি। আমার রাজনৈতিক পরিচয় জেনে রূপালী ব্যাংকের তৎকালীন এমডি ওবায়দুল্লাহ মাসুদ ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) ব্যবহার করে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। দুদকে মামলা ও একটি টিভি চ্যানেলে আমার বিরুদ্ধে প্রতিবেদন হওয়ায় আমার প্রতিষ্ঠানের সারাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বাতিল করে দেওয়া হয়।’
নাসির উদ্দিনের অভিযোগ, ‘আমাকে রূপালী ব্যাংক বেশি ডিস্টার্ব করেছে। আমার কাছ থেকে নিয়েছে বেশি। সরকার এখন আরোপিত সুদ মওকুফ করছে। আমি যখন ৪৪২ কোটি টাকা দিয়েছি। সব কিছু বাদ দিলেও রূপালী ব্যাংক আমার কাছে ১০ টাকাও পাবে না। কারণ আমি সরকারের কাছে ৪৯৫ কোটি টাকা পাই।’
ডলি কনস্ট্রাকশনের এমডি নাসির উদ্দিন জানান, ‘খুলনা শিপইয়ার্ডের সাড়ে ৪০০ কোটি টাকার কাজের বিপরীতে ১০০ কোটি টাকা ছাড় করা হয় (যার ৯০ কোটি টাকা তুলে ৬৫ কোটি পরিশোধ করেছি)। করোনাকালে সরকারের এক প্রভাবশালী আমলার আত্মীয়কে কাজ পাইয়ে দিতে আমার সব বিল ও ব্যাংক লিমিট আটকে দেওয়া হয়। আমি নিজের ১৮০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও বিল না পাওয়ায় খুলনা শিপইয়ার্ড ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিরুদ্ধে মামলা করি।’
নাসির উদ্দিন জনতা ব্যাংকের ঋণের বিষয়ে বলেন, জনতা ব্যাংক ২০১৯ সালে ৮০ কোটি টাকার ঋণ পাস করেছে। কিন্তু ২০২০ সালে ৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা দেওয়ার পর তারা এখন পর্যন্ত আর কোনো টাকা দেয়নি। তিনি দাবি করেন, ‘দুদক থেকে আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছিল। আমরা দুদককে পুনরায় তদন্ত করার জন্য বলেছি। দুদক পুনরায় তদন্ত না করলে আবার আবার মামলা করবো।’
এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম বলেন, তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। দুদকের নতুন কমিশন দায়িত্ব নিলে খুব শিগগিরই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ডলি কনস্ট্রাকশনের ঋণের ফাঁদে রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংক
মরিয়ম সেঁজুতি

ভুয়া নথি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা, রূপালী এবং অগ্রণী ব্যাংক থেকে বিশাল অঙ্কের ঋণ নিয়েছে ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। এই ঋণ এখন পুরোপুরি খেলাপি হয়ে গেছে। এর মধ্যে রূপালী ব্যাংকের ঋণ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন ও চেয়ারম্যান ডলি আক্তারের নামে মামলা করেছে।
জানা গেছে, যাচাই-বাছাই ছাড়া ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নামে ঋণ দিয়ে বিপাকে পড়েছে রূপালী, অগ্রণী ও জনতা ব্যাংক পিএলসি। ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা ঋণ আদায় নিয়ে দুশ্চিন্তায় মধ্যে আছে। কোনো মর্টগেজ (স্থাবর সম্পদ) নেই। ‘কো-লেটারাল‘ বলতে দেওয়া হয়েছে কিছু ‘ওয়ার্ক অর্ডার’। এভাবে শুধু সরকারি উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কার্যাদেশের বিপরীতে তিন ব্যাংক থেকে ৮০৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। এর মধ্যে মাত্র ১৩ কোটির টাকার জামানত দিয়ে রূপালী ব্যাংক থেকে ৪৮৯ কোটির ঋণ নিয়েছে, যা এখন সুদে-আসলে ৬৫০ কোটি টাকা হয়েছে। এছাড়া অগ্রণী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে ৮০ কোটি টাকা, যা সুদ-আসলে হয়েছে ১৩৫ কোটি টাকা। আর জনতা ব্যাংকের ৮০ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ২০ কোটি টাকা নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এখন ৬০ কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার সীমা (লিমিট) রয়েছে। তবে বাকি ঋণ নিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। অবশ্য যা নিয়েছেন তা-ও এখন খেলাপি।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের চেয়ারম্যান ডলি আক্তার, রূপালী ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ের সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক খালেদ হোসেন মল্লিক, সাবেক সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. সোলায়মান, স্থানীয় কার্যালয়ের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মো. গোলাম সারোয়ার, সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, পল্টন শাখার উপমহাব্যবস্থাপক (সাবেক সহকারী মহাব্যবস্থাপক মতিঝিল করপোরেট শাখা) এএসএম মোরশেদ আলী ও জিওগ্রাফ সার্ভে করপোরেশন লিমিটেডের মালিক মো. পারভেজ বিন কামাল।
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, ডলি কনস্ট্রাকশনের এমডি মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন ২০১৩ সালের ১৬ জানুয়ারি রূপালী ব্যাংকের মতিঝিল করপোরেট শাখায় একটি চলতি হিসাব খোলেন। এরপর ২০১৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের উন্নয়নমূলক কাজের কার্যাদেশ লিয়েন (ঋণ বা আর্থিক দায় শোধ নিশ্চিত করতে জামানত হিসেবে সম্পদ) রাখার শর্তে ১০৪ কোটি টাকা ঋণের আবেদন করেন। এরপর সংশ্লিষ্ট শাখা, বিভাগীয় ও প্রধান কার্যালয়ের শিল্পঋণ বিভাগের সুপারিশের ভিত্তিতে ২০১৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পরিচালনা পর্ষদের ৯৯০তম বোর্ড সভায় ৫৫ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর থেকে কয়েক দফায় প্রতিষ্ঠানটির নামে ঋণ অনুমোদন করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ডলি কনস্ট্রাকশন ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণের ৭৫১ কোটি ৯৯ লাখ ৮৬ হাজার ১০৬ কোটি টাকা উত্তোলন করে। এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩০৮ কোটি ৫৩ লাখ ৯০ হাজার ৬০১ টাকা পরিশোধ করে। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৪৮৯ কোটি ৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৭৫ টাকা, যা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
কে এই ডলি কনস্ট্রাকশনের এমডি
ডলি কনস্ট্রাকশনের মালিক নাসির উদ্দিন। তিনি তার স্ত্রী ডলি আক্তারের নামে ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড চালু করেন। তার আসল বাড়ি ফরিদপুরের চরভদ্রাসনের ঝাউকান্দা ইউনিয়নে। তবে নদী ভাঙনের কারণে তারা পরে ঢাকার দোহারের চরমাহামুদপুর ইউনিয়নে এসে বসতি গড়ে তোলেন।
কাজের ধরণ
ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), গণপূর্ত অধিদপ্তর (পিডব্লিউডি), সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (আরএইচডি) এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অধীন প্রকল্পের ঠিকাদারি কাজ করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রূপালী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ঋণ আদায় করার কোনো পথ নেই। এদের কোনো জামানত নেই। সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের ওয়ার্ক অর্ডারের ভিত্তিতে এদের ঋণ দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগের আমলে পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে কাজ শেষ না করেই অর্থ তুলে নিয়েছে। ফলে ওই প্রতিষ্ঠানের নামে মামলা হয়েছে। এ কারণে এখন আর কোনো সরকারই নতুন করে কাজ দেবে না। নতুন করে কাজ দেওয়ার কোনো পথ নেই।
জানা গেছে, তিন ব্যাংকের অনুকূলে লিয়েনকৃত ১১৫টি কার্যাদেশের চুক্তি মূল্য ৭২৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। কিন্তু গ্রাহকের অনুকূলে মোট উত্তোলনে সুবিধা দেওয়া হয়েছে প্রায় ৫৯৬ কোটি ২৬ লাখ টাকার। মঞ্জুরিপত্রের শর্ত অনুযায়ী কার্যাদেশ চুক্তি মূল্যের সর্বোচ্চ ৮০ ভাগ ঋণ বিতরণ করার সুযোগ আছে। তবে ওই শর্ত লঙ্ঘন করে গ্রাহককে কার্যাদেশ চুক্তি মূল্যের প্রায় ৮২.১৯ শতাংশ টাকা উত্তোলনের বাড়তি সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
ডলি কনস্ট্রাকশনের ঋণ আদায় চেষ্টা চলেছে। প্রতিষ্ঠানটির এমডি নাসির উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ হয়েছে। তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী ঋণ রিশিডিউল বা পুনঃতফসিল করতে বলা হয়েছে।
সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ,
চেয়ারম্যান, অগ্রণী ব্যাংক
এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘ডলি কনস্ট্রাকশনের ঋণ আদায় চেষ্টা চলেছে। প্রতিষ্ঠানটির এমডি নাসির উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ হয়েছে। তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী ঋণ রিশিডিউল বা পুনঃতফসিল করতে বলা হয়েছে।’
এ বিষয়ে জনতা ব্যাংকের এমডি মজিবর রহমান সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘আমরা খেলাপি ঋণ আদায় করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি। কাউকে ছাড় দিচ্ছি না। সেখানে ডলি কনস্ট্রাকশনের ঋণ আদায়েও সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ‘মেসার্স ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’ (ট্রেড লাইসেন্স নং-০৩৯৬৫২) রাষ্ট্রায়ত্ত ৩টি ব্যাংকের মাধ্যমে নির্মাণ ব্যবসা পরিচালনা করছে। ব্যাংকগুলো হচ্ছে অগ্রণী, জনতা এবং রূপালী ব্যাংক পিএলসি। রূপালী ব্যাংক মতিঝিল শাখা, অগ্রণী ব্যাংক আমিনকোর্ট শাখা, জনতা ব্যাংক স্থানীয় কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসায়িক লেনদেন করে। ব্যাংক হিসাবগুলো ‘মেসার্স হৃদয় ট্রেডার্স’, ‘হৃদয় এন্টারপ্রাইজ প্রাইভেট লিমিটেড’ ‘ডলি অটো স্পিনিং মিলস লিমিটেড’ এবং ‘উদয় ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’সহ কয়েকটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নামে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান মেসার্স ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অতিমূল্যায়ণ করা হয় ডলি কনস্ট্রাকশনের আর্থিক প্রতিবেদনে। নির্ধারিত ঋণসীমার অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের লক্ষ্যেই প্রতিবেদনে অতিমূল্যায়ন করা হয়। বিভিন্ন সরকারি কার্যাদেশের (ওয়ার্ক অর্ডার) বিপরীতে ঋণ দেওয়া হয় বিপুল অঙ্কের ঋণ। অথচ যেসব কার্যাদেশের বিপরীতে ঋণ দেওয়া হয়, সেগুলো ব্যাংকটির সংশ্লিষ্ট শাখায় সংরক্ষণও করা হয়নি। এভাবে রূপালী ও অগ্রণী ব্যাংক থেকে ডলি কনস্ট্রাকশন জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেয় ৫৪৫ কোটি টাকা।
অগ্রণী ব্যাংককে জরিমানা
অগ্রণী ব্যাংক থেকে ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের অনিয়ম করে নেওয়া ঋণের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে বলেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্দেশনার ১০ মাস পরেও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ২০২২ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকটিকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, পাউবোর মোট ৩২৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকার দুটি কার্যাদেশের বিপরীতে ডলি কনস্ট্রাকশন ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অগ্রণী ব্যাংক থেকে ১৪০ কোটি ১৩ লাখ টাকা তুলেছে। নিয়ম অনুযায়ী কার্যাদেশের বিপরীতে এই পরিমাণ টাকা তুলতে প্রতিষ্ঠানটির অন্তত ২৮০ কোটি ২৬ লাখ টাকা বা কার্যাদেশ দুটির ৮৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ কাজ শেষ করার কথা। তবে ওই সময় পর্যন্ত বাস্তবে ডলি কনস্ট্রাকশন শেষ করেছিল মাত্র ৩৫ শতাংশ কাজ।
অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি ১১৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকার কাজ শেষ করেই অগ্রণী ব্যাংক থেকে ১৪০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এই পরিমাণ কাজের বিপরীতে ডলি কনস্ট্রাকশন ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ ৫৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা তুলতে পারে। সে হিসাবে প্রতিষ্ঠানটি অনিয়ম করে ব্যাংক থেকে ৮২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা অতিরিক্ত তুলে নিয়েছে।
এখানেই শেষ নয়। ১১৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকার কাজ শেষ করার বিল ব্যাংকে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তারা জমা দিয়েছে মাত্র ৫১ কোটি ৬ লাখ টাকা। বাকি ৬৩ কোটি ৮৭ কোটি টাকা বিলের বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের কাছে জানতে চাইলেও তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কিছুই জানায়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, পাউবোর কার্যাদেশ দুটির মেয়াদ ২০২১ সালের ১৫ এপ্রিল শেষ হয়েছে। সেইসঙ্গে অগ্রণী ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের বর্ধিত মেয়াদও ফুরিয়েছে ২০২১ সালের ৬ জুন। এসব সময়সীমা শেষ হলেও ব্যাংকটি থেকে নেওয়া ১০৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণ এখনো পরিশোধ করেনি ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড।
এছাড়া পাউবোর সীমান্ত নদী তীর সংরক্ষণ ও উন্নয়ন (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পের আওতায় এক কার্যাদেশের বিপরীতে ১০০ কোটি টাকা ওভারড্রাফট সীমা অনুমোদন করেছিল অগ্রণী ব্যাংক। তবে প্রতিষ্ঠানটি ওই কার্যাদেশের বিপরীতে টাকা না তুলে অন্য আরেকটি কার্যাদেশের বিপরীতে এই টাকা তুলেছে। নিয়ম অনুযায়ী, এটিও গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানান ব্যাংক কর্মকর্তারা।
ডলি কনস্ট্রাকশনের এমডির বক্তব্য
ব্যাংকের ঋণ আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডলি কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নাসির উদ্দিন মোবাইলফোনে সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘আমরা ২০১২ সালে ব্যবসা শুরু করি। রূপালী ব্যাংকে ১২৫ কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে সম্পত্তি বন্ধক রাখা হয়। ব্যাংক থেকে আমরা ৩৫০ কোটি টাকা নিই এবং নির্ধারিত সময়ে ৪৪২ কোটি টাকা পরিশোধ করি। এরপরও বিভিন্ন প্রকল্পে আমার ৪৯৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ থাকা অবস্থায় ব্যাংক হঠাৎ ৫২টি ব্যাংক গ্যারান্টির মেয়াদ বাড়ানো বন্ধ করে দেয়। ফলে আমার পুরো টাকা আটকে যায় এবং বাধ্য হয়ে আমি টাকা আটকে দেওয়ার ঘটনা ও ব্যাংক গ্যারান্টির মেয়াদ বাড়ানো বন্ধের ঘটনায় ব্যাংকের বিরুদ্ধে ৩৫০ কোটি টাকার মামলা করি।’
রূপালী ব্যাংকে কাঁচপুর ব্রিজের কাছে আমাদের ৫৭৫ কোটি টাকার জমি বন্ধক আছে। আটকে থাকা টাকা ও সুদের হিসাব মেলালে ব্যাংক আমার কাছে আর কোনো টাকাই পাবে না।
নাসির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডলি কনস্ট্রাকশন
নাসির উদ্দিন দাবি করেন, ‘রূপালী ব্যাংকে কাঁচপুর ব্রিজের কাছে আমাদের ৫৭৫ কোটি টাকার জমি বন্ধক আছে। আটকে থাকা টাকা ও সুদের হিসাব মেলালে ব্যাংক আমার কাছে আর কোনো টাকাই পাবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০১৮ সালে আমি ঢাকা জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পরই তৎকালীন সংসদ সদস্য সালমান এফ রহমানের নজরে পড়ি। আমার রাজনৈতিক পরিচয় জেনে রূপালী ব্যাংকের তৎকালীন এমডি ওবায়দুল্লাহ মাসুদ ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) ব্যবহার করে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। দুদকে মামলা ও একটি টিভি চ্যানেলে আমার বিরুদ্ধে প্রতিবেদন হওয়ায় আমার প্রতিষ্ঠানের সারাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বাতিল করে দেওয়া হয়।’
নাসির উদ্দিনের অভিযোগ, ‘আমাকে রূপালী ব্যাংক বেশি ডিস্টার্ব করেছে। আমার কাছ থেকে নিয়েছে বেশি। সরকার এখন আরোপিত সুদ মওকুফ করছে। আমি যখন ৪৪২ কোটি টাকা দিয়েছি। সব কিছু বাদ দিলেও রূপালী ব্যাংক আমার কাছে ১০ টাকাও পাবে না। কারণ আমি সরকারের কাছে ৪৯৫ কোটি টাকা পাই।’
ডলি কনস্ট্রাকশনের এমডি নাসির উদ্দিন জানান, ‘খুলনা শিপইয়ার্ডের সাড়ে ৪০০ কোটি টাকার কাজের বিপরীতে ১০০ কোটি টাকা ছাড় করা হয় (যার ৯০ কোটি টাকা তুলে ৬৫ কোটি পরিশোধ করেছি)। করোনাকালে সরকারের এক প্রভাবশালী আমলার আত্মীয়কে কাজ পাইয়ে দিতে আমার সব বিল ও ব্যাংক লিমিট আটকে দেওয়া হয়। আমি নিজের ১৮০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও বিল না পাওয়ায় খুলনা শিপইয়ার্ড ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিরুদ্ধে মামলা করি।’
নাসির উদ্দিন জনতা ব্যাংকের ঋণের বিষয়ে বলেন, জনতা ব্যাংক ২০১৯ সালে ৮০ কোটি টাকার ঋণ পাস করেছে। কিন্তু ২০২০ সালে ৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা দেওয়ার পর তারা এখন পর্যন্ত আর কোনো টাকা দেয়নি। তিনি দাবি করেন, ‘দুদক থেকে আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছিল। আমরা দুদককে পুনরায় তদন্ত করার জন্য বলেছি। দুদক পুনরায় তদন্ত না করলে আবার আবার মামলা করবো।’
এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম বলেন, তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। দুদকের নতুন কমিশন দায়িত্ব নিলে খুব শিগগিরই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।









