শিরোনাম

স্বাস্থ্য সচিবকে নিয়ে অস্বস্তিতে মন্ত্রণালয়

স্বাস্থ্য সচিবকে নিয়ে অস্বস্তিতে মন্ত্রণালয়
স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী। ফাইল ছবি

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বিরুদ্ধে অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। চিকিৎসকদের বদলি ও পদোন্নতি এবং স্বাস্থ্য খাতের ঠিকাদারদের কার্যাদেশের ফাইল অনুমোদনেও তিনি কালক্ষেপণ করছেন।

স্বাস্থ্য সচিবের বিরুদ্ধে আরও বেশকিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর অনুমোদন না নিয়ে তার একক সিদ্ধান্তে কর্মকর্তাদের মধ্যে দায়িত্ব বন্টন ও গুরুত্বপূর্ণ ফাইল অনুমোদনের মতো ঘটনা ঘটছে বলে শোনা যায়। যথাযথ কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তিনি ২৩ ঠিকাদারের ১২৭ কোটি টাকা বকেয়া বিল আটকে রেখেছেন। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ জমা পড়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকারি ক্রয় কর্তৃপক্ষ বা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখা থেকে ১২ জন ঠিকাদারের ৮৩ কোটি ৯১ লাখ ৮০ হাজার ১৮৪ টাকার বিল ছাড় করা হয়।

মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রের দাবি, সচিবের একান্ত সচিব কৌশলে এই বিলের ফাইলে সচিবকে দিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছেন। পরে বিষয়টি জানার পর সচিব ক্ষুব্ধ হন। এই ঘটনায় তিনি বাজেট শাখার অতিরিক্ত সচিব, যুগ্মসচিব, সিনিয়র সহকারী সচিব ও সহকারী সচিবকে তার দপ্তরে ডেকে পাঠান এবং তাদের তিরস্কার করেন। পরে এই বিলে স্বাক্ষর থাকায় সহকারী সচিব রেজাউল করিমকে তাৎক্ষণিক বদলি (স্ট্যান্ড রিলিজ) করা হয়। এই বিল ছাড়ের পর সচিব সবাইকে ভবিষ্যতে তার অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের কোনো ফাইল অনুমোদন হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে গত ২৫ জুলাই বিকালে স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরীর মুঠোফোনে ফোন দিলে তিনি সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, ‘১২ জন ঠিকাদারের বিল পরিশোধ নিয়ে আমাকে মিসগাইড (বিভ্রান্ত) করা হয়েছিল।’

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য বিভাগের একটি নথি সূত্রে জানা গেছে, কোভিড-১৯ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আদেশে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) মাধ্যমে চিকিৎসকদের পিপিই, সার্জিক্যাল মাস্ক, গ্লাভস, স্যানিটাইজারসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী ও ওষুধ কেনার জন্য সাত দিনের সময় দেওয়া হয়। এসব সামগ্রী সরবরাহ করেছে ২৩ জন ঠিকাদার। তাদের ১২৭ কোটি ৩৫ লাখ ১৩ হাজার ৮৭৫ টাকা বিল এখনো বকেয়া রয়েছে। দীর্ঘদিনে এসব বিল না পাওয়ায় তারা হাইকোর্টে মামলা করেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে আরও জানা গেছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির রিভিউ প্যানেলের সিদ্ধান্ত ও হাইকোর্টের নির্দেশনায় ২৩টি প্যাকেজের বিল ছাড়ের উদ্যোগ নেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে ২৩টি প্যাকেজের বকেয়া বিল পরিশোধের জন্য অর্থ বরাদ্দের চূড়ান্ত প্রস্তাব অনুমোদন এখনো হয়নি। কমিশন না দেওয়ায় সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী এই বিল আটকে রেখেছেন বলে অভিযেোগ পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী এক ঠিকাদার জানান, দেশের ক্রান্তিকালে সরকারকে পণ্য তিয়ে দিয়ে সহায়তা করেছিলেন। অথচ এই বিল তুলতে গিয়ে তাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এই বিল পাওয়ার জন্য তারা উচ্চ আদালতে মামলা করেন। মামলায় তাদের পক্ষে রায় দেওয়া হয়। আদালতের রায়ের পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আইন মন্ত্রণালয়েরও মতামত নেয়। সেখান থেকে বিল পরিশোধের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এরপরও তারা বিল পাচ্ছে না।

২৩ জন ঠিকাদারের বিল আটকে রাখার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘ঠিকাদারদের বিলের কিছু ফাইল এসেছিল, সেগুলোর কাজ করে দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে কয়েকটি ফাইল অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আর কয়েকটি ফাইল সিএমএসডিতে পাঠানো হয়েছে। তবে সব ঠিকাদারের বিল দ্রুত দেওয়া হবে।’

স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুদকের চেয়ারম্যান বরাবর জমা দেওয়া একটি লিখিত অভিযোগের অনুলিপি সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমের হাতে এসেছে। গত ১৫ জুলাই ফেরদাউস রহমান নামের এক ব্যক্তি ওই লিখিত অভিযোগ জমা দেন । এতে স্বাস্থ্য সচিবের দুর্নীতি ও অনিয়মের ফিরিস্তি তুলে ধরা হয়েছে।

দুদকে জমা দেওয়া ওই লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, স্বাস্থ্য খাতে প্রভাবশালী এইচটিএমএস লিমিটেড নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানের মালিকের নাম আফতাব আহমেদ। ওই কোম্পানির অফিস ধানমন্ডিতে। সময় পেলেই স্বাস্থ্য সচিব ওই অফিসে চলে যান। আফতাব আহমেদ সচিবের অবৈধ আয়ের অন্যতম মাধ্যম। তিনি গত ৩ মার্চ সচিব হিসেবে মন্ত্রণালয়ে যোগদান করেন। ওই দিনই তিনি আফতাবের কাছ থেকে ৩ কোটি টাকা সমমূল্যের ইউরো উপহার হিসেবে নেন।

স্বাস্থ্য সচিবের অবৈধ আয়ের মাধ্যম হিসেবে কাজ করা এবং তাকে ৩ কোটি টাকার উপহার দেওয়ার অভিযোগে বিষয়ে কথা বলার জন্য এইচটিএমএস লিমিটেডের মালিক আফতাব আহমেদের মোবাইল ফোন নম্বরে গত ২৭ জুলাই রাতে কল দেওয়া হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ৩০ জুলাই আবার আফতাব আহমেদের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি।

লিখিত অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, চিকিৎসকদের বদলি ও পদোন্নতিতে স্বাস্থ্য সচিব ৫ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা করে নেন। ক্ষেত্র বিশেষ তিনি ১০ লাখ-২০ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকেন। সিএমএসডি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারি বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে সচিব ২ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ কমিশন নেন।

দুদকে দেওয়া লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কোনো আলোচনা বা তাদের অনুমোদন ছাড়াই একক সিদ্ধান্তে স্বাস্থ্য সচিব কর্মকর্তাদের মধ্য দায়িত্ব বন্টন এবং ৮০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ চিকিৎসক বদলি করেন। তিনি একাই মন্ত্রণালয় চালাচ্ছেন।

চিকিৎসকদের বদলিতে ঘুষ নেওয়া ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী জানান, ‘এসব ভোগাস বিষয়। আমি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছি। কেউ কেউ ঈর্ষান্বিত হয়ে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।’

লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বর্তমান সরকারের গতিশীলতা, স্বচ্ছতা ও সংস্কারকেন্দ্রিক দর্শনের বিপরীত পথে হাঁটছেন স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী। তার দপ্তরের নথি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০-৩০ দিন বা কয়েক মাস তার স্বাক্ষরের জন্য নথি পড়ে থাকছে।

এই অবস্থায় স্বাস্থ্য সচিবের বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী ফেরদাউস রহমান।

/বিবি/