আমিন মোহাম্মদের দুই প্রকল্প অনুমোদনহীন, তালিকায় ড্যাফোডিল স্মার্ট সিটিও

আমিন মোহাম্মদের দুই প্রকল্প অনুমোদনহীন, 
তালিকায় ড্যাফোডিল স্মার্ট সিটিও
সাভারের আশুলিয়ায় আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ ও ড্যাফোডিল স্মার্ট সিটির আবাসন প্রকল্প রয়েছে। কিন্তু এসব প্রকল্পের অনুমোদন দেয়নি রাজউক। কোলাজ সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

সাভারের আশুলিয়ার বিরুলিয়া ইউনিয়নের খাগান থেকে তুরাগ নদীর পাড় পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘আশুলিয়া মডেল টাউন’ ও ‘উত্তরা ভিউ’ আবাসন প্রকল্প। প্রায় ১ হাজার ৫০০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা প্রকল্প দুটির উদ্যোক্তা আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ। অথচ প্রকল্পগুলো এখনো ‘অননুমোদিত’ তালিকায় রেখেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। পাশেই থাকা ড্যাফোডিল স্মার্ট সিটিকেও অনুমোদনহীন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে সংস্থাটি।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্প চালুর ঘোষণা দিয়ে ‘আশুলিয়া মডেল টাউন’-এর প্লট বিক্রি শুরু করে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ। পরে তুরাগ নদী পর্যন্ত বিস্তৃত করে গড়ে তোলা হয় ‘উত্তরা ভিউ’ প্রকল্পটিও। এরই মধ্যে প্রকল্প দুটির ৯০ শতাংশের বেশি জমি বিক্রি হয়ে গেছে। এসব জমিতে বেশ কয়েকটি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে মানুষ বসবাসও করছে। রয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও।

আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের বিরুদ্ধে কৃষিজমি, জলাধার, বনভূমি, খাসজমি ও জলপথ ভরাট করে এই দুটি প্রকল্প গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে রাজউকের তালিকায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর প্রকাশ্যে বিজ্ঞাপন দিয়ে এসব প্রকল্পের প্লট বিক্রি হলেও রাজউক কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আর নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, পিঠ বাঁচাতে এসব দায়সারা তালিকা করে রাজউক।

সাভারের আশুলিয়ায় আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের আশুলিয়া মডেল টাউন আবাসন প্রকল্প। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
সাভারের আশুলিয়ায় আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের আশুলিয়া মডেল টাউন আবাসন প্রকল্প। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

এসব বিষয়ে জানতে সম্প্রতি আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের ধানমন্ডির অফিসে গিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও তা সম্ভব হয়নি। পরে গ্রুপটির জনসংযোগ বিভাগের দায়িত্বে থাকা গাজী আহমেদের সঙ্গে সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি বলেন, ‘রাজউকের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। আমরা নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছি। সেই আবেদন প্রক্রিয়াধীন আছে। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে সমস্যার সমাধান হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ড্যাফোডিল স্মার্ট সিটি

রাজউকের জোন-১-এর সাভার আশুলিয়া এলাকায় ১৮টি অননুমোদিত আবাসন প্রকল্পের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে ‘ড্যাফোডিল স্মার্ট সিটি’ অন্যতম। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিকে কেন্দ্র করেই এই প্রকল্পটি গড়ে উঠেছে। রাজউকের তথ্যমতে, ৩৯০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই প্রকল্পের অনুমোদন নেই। যদিও ড্যাফোডিল গ্রুপের দাবি স্মার্ট সিটি দেড় শ একর জমি নিয়ে গড়ে উঠেছে। এটি কোনো আবাসন প্রকল্প নয়।

সরেজমিন প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির মূল ভবন, ছাত্রাবাস, ল্যাব ভবন, স্কুলসহ ড্যাফোডিল গ্রুপের আরও কয়েকটি প্রকল্পের ভবন রয়েছে।

সাভারের আশুলিয়ায় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ড্যাফোডিল স্মার্ট সিটি প্রকল্প। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
সাভারের আশুলিয়ায় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ড্যাফোডিল স্মার্ট সিটি প্রকল্প। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

এ বিষয়ে সম্প্রতি ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমান সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘ড্যাফোডিল স্মার্ট সিটি কোনো হাউজিং প্রকল্প নয়। এটি ড্যাফোডিল গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার একটি ভৌগোলিক অবস্থান। এখানকার বেশিরভাগ জমি আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশন থেকে ক্রয় করা। স্থানীয়ভাবে কিছু জমি কেনা হলেও প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে সেগুলো স্থানীয় বিধি-বিধান মেনেই উন্নয়ন করা হয়েছে। বর্তমানে রাজউকের বিধি-বিধানের সঙ্গে সমন্বয় করে সব কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ প্রক্রিয়াধীন আছে।’

রূপায়ণ আশুলিয়া সিটিসহ আরও কিছু অননুমোদিত প্রকল্প

সাভার-আশুলিয়ায় ১০ থেকে ৫০ একর আয়তনের আরও কিছু আবাসন প্রকল্প রয়েছে-যেগুলোরও রাজউকের অনুমোদন নেই। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি প্রকল্প রূপায়ণ আশুলিয়া সিটি, যা স্থানীয়ভাবে ‘রূপায়ণ মাঠ’ হিসেবে এখন পরিচিত। আশুলিয়া বাজার এলাকার বঙ্গবন্ধু রোডের পশ্চিমপাশে গড়ে ওঠা এই প্রকল্পটি রাজউকের তালিকায় কমবেশি ২০ একর হিসেবে উল্লেখ করা রয়েছে। তবে সরেজমিন এত বেশি জায়গা চোখে পড়েনি। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রকল্পটির সব প্লট অনেক আগেই বিক্রি শেষ। এমনকি প্রকল্প অফিসের জায়গাটিও বিক্রি করে কোম্পানিটি সেখান থেকে চলে গেছে। এখন সেখানে কয়েকটি বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। এখনো এই প্রকল্প অনুমোদন দেয়নি রাজউক।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রূপায়ণ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ লিয়াকত আলী খাঁন মুকুল সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘ড্যাপের বাইরে ১০ একরের বেশি জমিতে আবাসন প্রকল্প করতে রাজউকের অনুমোদন নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু আমাদের প্রকল্পটি ১০ একরের নিচে। সুতরাং এক্ষেত্রে রাজউকের অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল না।‘

এছাড়া অননুমোদিত হিসেবে বাইপাইল বসুন্ধরা রেসিডেন্সিয়াল এরিয়া, সেনাপল্লী হাউজিং, নাভানা ভিলেজ অ্যান্ড গার্ডেনিয়া, কনকর্ড রেইনবো টাউন, নিরিবিলি গৃহনির্মাণ প্রকল্পসহ আরও কিছু প্রকল্প রয়েছে।

এসব প্রকল্পের কয়েকটিতে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ জমিই ইতোমধ্যে বিক্রি ও হস্তান্তর করা হয়েছে। কোথাও প্লটে বাড়িঘর তৈরি হয়েছে, কোথাও চলছে নির্মাণকাজ। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের জমি বিক্রি শেষে চলে গেছে। অথচ এত বছর পর এসেও এসব প্রকল্পকে কেবল ‘অনুমোদনহীন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে দায় সেরেছে রাজউক।

কেবল তালিকাই করে আসছে রাজউক

রাজউকের নগর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন শাখার দায়িত্ব হচ্ছে অনুমোদনহীন আবাসন প্রকল্পের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে শুধু তালিকাভুক্ত করেই দায়িত্ব শেষ করা হয়েছে।

রাজউকেরই অন্য একটি শাখার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা আবাসন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে এসব কার্যক্রম চলতে দিয়েছেন। বিনিময়ে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।’

রাজউকের নথি অনুযায়ী, এসব প্রকল্পের তথ্য সংগ্রহ ও তালিকা তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জোনের সহকারী নগর পরিকল্পনাবিদ, নকশাকার ও সার্ভেয়াররা যুক্ত ছিলেন। তদারকিতে ছিলেন জোনের পরিচালক, অথরাইজড অফিসার, উপনগর পরিকল্পনাবিদ ও প্রধান ইমারত পরিদর্শকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পরে রাজউকের প্রধান কার্যালয় থেকেও এসব তথ্য যাচাই এবং তালিকা চূড়ান্ত করা হয়।

অভিযানে গিয়েও ভবন দেখে না রাজউক

তালিকায় অনুমোদনহীন থাকলেও এসব প্রকল্পে গড়ে উঠেছে অনেক ভবন। অথচ রাজউক জোন-১ জানিয়েছে, অথরাইজড অফিসার গিয়ে কোনো ভবন দেখতে পাননি। এ বিষয়ে রাজউক জোন-১-এর পরিচালক রাজিয়া সুলতানা সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘জোন অফিসের দায়িত্ব ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া। আপনাদের সম্প্রতি জোন-১ নিয়ে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদন দেখার পর অথরাইজড অফিসার গিয়েছিলেন, কোথাও কোনো ভবন নির্মাণ করতে দেখা যায়নি। আর প্রকল্পগুলোর বিষয়ে প্রধান দপ্তরে জানানো হয়েছে। সেখানকার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন শাখা এসব অননুমোদিত প্রকল্পের বিষয়টি দেখে, তারা ব্যবস্থা নেবে।‘

এখন থেকে চলবে মোবাইল কোর্ট

অনুমোদনহীন থাকার পরও বছরের পর বছর কীভাবে এসব প্রকল্পে জমি বিক্রি ও ভবন নির্মাণ চলেছে-সেসব বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘বিভিন্ন সময় নানা অবহেলা ও আইনের ফাঁক দিয়ে এসব প্রকল্প দাঁড়িয়েছে। আমি নিজেও এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এসব এলাকা যেহেতু এখন রাজউকের আওতাধীন, তাই রাজউক থেকেও প্রকল্পের অনুমোদন নিতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এখন থেকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আর ভবন নির্মাণের জন্য অবশ্যই রাজউকের অনুমোদন নিতে হবে।’

পিঠ বাঁচাতে রাজউক তালিকা করে

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, অনুমোদন ছাড়া পরিকল্পনাহীন আবাসন প্রকল্পের বিরূপ প্রভাব পড়ে পরিবেশ, জলাধার, কৃষিজমি, যোগাযোগব্যবস্থা ও নগর ব্যবস্থাপনায়। কারণ কোম্পানিগুলো পরিবেশের কথা চিন্তা করে না, তারা কেবল জমি বানিয়ে বিক্রির মাধ্যমে আয় করতে চায়।

এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, ‘রাজউকের কাজ তিনটি -পরিকল্পনা প্রণয়ন, পরিকল্পনা অনুযায়ী উন্নয়ন এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু রাজউক তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেনি। এসব প্রকল্প রাতারাতি হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে জলাধার, নদী-খাল ও কৃষিজমি ভরাট করেই এসব প্রকল্প দাঁড়িয়েছে। আর এত বছরেও রাজউক কি এসব দেখে নাই? তাদের কাজের গাফিলতির কারণে এসব প্রকল্প গড়ে উঠেছে এবং আরও বড় হয়েছে। আর যখন কোনো প্রকল্পে মাটি ভরাট হয়ে যায়, তখন রাজউকের কর্মকর্তারা নিজেদের পিঠ বাঁচাতে তালিকা তৈরি করে প্রমাণ করতে চায়, তারা এসব প্রকল্পের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইনগত একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। কিন্তু বন্ধ করার মতো যে উদ্যোগ সেটা দেখা যায় না। এর দায় অবশ্যই রাজউকের।’

/বিবি/