কৃষিতে শ্রমিক বেশি হলেও উৎপাদনশীলতায় পিছিয়ে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
কৃষিতে শ্রমিক বেশি হলেও উৎপাদনশীলতায় পিছিয়ে বাংলাদেশ
গ্রাফিক্স: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৫ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত। তবে কৃষি শ্রমিকপ্রতি উৎপাদনশীলতায় দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের চেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ। কৃষিতে প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার, জমির স্বল্পতা ও দক্ষতার অভাবকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০১৭ সালে দেশের মোট শ্রমশক্তির ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ কৃষিতে কাজ করতেন। বর্তমানে এ হার বেড়ে প্রায় ৪৫ শতাংশ হয়েছে। কৃষির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ৩ কোটি ৮ লাখ মানুষ।

কৃষি শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বলতে নির্দিষ্ট সময়ে একজন শ্রমিকের মাধ্যমে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বা সৃষ্ট মূল্য সংযোজনকে বোঝায়। সহজভাবে বললে, একজন কৃষকের শ্রমের বিপরীতে বছরে যে পরিমাণ অর্থমূল্যের কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়, সেটিই তার উৎপাদনশীলতা।

কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত হওয়ায় শ্রমিকপ্রতি উৎপাদন কম হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষকদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষতার অভাব এবং দক্ষতা বাড়াতে কম বিনিয়োগও এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কৃষি খাতের এসব সীমাবদ্ধতা উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, জমির খণ্ডিত মালিকানা, উন্নত বীজ ও কৃষিপ্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার এবং কৃষকদের বাজারে প্রবেশের বাধা উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। এ ছাড়া কৃষিপণ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিপণনের অবকাঠামোতেও ঘাটতি রয়েছে। ধাননির্ভর উৎপাদনব্যবস্থার কারণে কৃষিতে আয় ও বৈচিত্র্য বাড়ানোর সুযোগও সীমিত থাকছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানে একজন কৃষি শ্রমিকের বার্ষিক উৎপাদনশীলতা ৩ হাজার ১৮৬ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ৩ লাখ ৯১ হাজার ৮৭৮ টাকা। দেশটির কৃষি শ্রমিকদের বার্ষিক উৎপাদনের মোট অর্থমূল্য ৯৩ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশের কৃষি মূলত চারটি খাতের ওপর নির্ভরশীল– ফসল, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও হর্টিকালচার। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এসব খাতে কর্মরত একজন শ্রমিকের বার্ষিক উৎপাদনের অর্থমূল্য ছিল ১ হাজার ২৩৬ দশমিক ২২ ডলার। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে এর পরিমাণ ১ লাখ ৫২ হাজার ৫৫ টাকা। সব মিলিয়ে কৃষি শ্রমিকদের বার্ষিক উৎপাদনের অর্থমূল্য ৫২ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান ১১ দশমিক ৪ শতাংশ।

সরকারের নীতিনির্ধারকেরা মনে করেন, সময়ের সঙ্গে কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার না বাড়ানো উৎপাদনশীলতায় পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ। একই পরিমাণ কৃষিপণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশে অন্য অনেক দেশের তুলনায় বেশি শ্রমিকের প্রয়োজন হচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর চিত্র

পাকিস্তানে মোট শ্রমশক্তির ৩৬ দশমিক ২ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত। দেশটির পরিসংখ্যান বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষি খাতে কর্মীর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৫৬ লাখ।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানে একজন কৃষি শ্রমিকের বার্ষিক উৎপাদনশীলতা ৩ হাজার ১৮৬ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ৩ লাখ ৯১ হাজার ৮৭৮ টাকা। দেশটির কৃষি শ্রমিকদের বার্ষিক উৎপাদনের মোট অর্থমূল্য ৯৩ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার।

প্রতিবেশী ভারতে মোট শ্রমশক্তির ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ কৃষিতে কাজ করেন। কৃষিতে নিয়োজিত শ্রমশক্তির হারে বাংলাদেশের কাছাকাছি হলেও উৎপাদনশীলতায় এগিয়ে দেশটি। ভারতের একজন কৃষি শ্রমিকের বার্ষিক উৎপাদনশীলতা ২ হাজার ১৫৯ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২ লাখ ৬৫ হাজার ৫৫৭ টাকা। দেশটির কৃষি শ্রমিকদের বার্ষিক উৎপাদনের মোট অর্থমূল্য ৬৪২ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার।

এ অঞ্চলে কৃষি শ্রমিকের উৎপাদনশীলতায় সবচেয়ে পিছিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান। দেশটির কৃষি শ্রমিকপ্রতি উৎপাদনশীলতার হালনাগাদ হিসাব নেই। তবে ২০২৪ সালের তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, সেখানে একজন কৃষি কর্মীর বার্ষিক উৎপাদনের অর্থমূল্য ১ হাজার ১৫৩ ডলার বা ১ লাখ ৪১ হাজার ১৯ টাকা।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মালদ্বীপের কৃষি শ্রমিকেরা উৎপাদনশীলতায় এগিয়ে রয়েছেন। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশটির একজন কৃষি শ্রমিকের বার্ষিক উৎপাদনের অর্থমূল্য ৮ হাজার ৬৭২ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় তা ১০ লাখ ৬৬ হাজার ৬৫৬ টাকা।

নেপালে একজন কৃষি শ্রমিকের বার্ষিক উৎপাদনশীলতা ৫ হাজার ৩৯ ডলার বা ৬ লাখ ১৯ হাজার ৭৯৭ টাকা। শ্রীলঙ্কায় তা ৩ হাজার ৩৩৪ ডলার বা প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার টাকা।

তবে কৃষি শ্রমিকপ্রতি উৎপাদনশীলতায় ভুটান বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের তুলনায় পিছিয়ে। দেশটিতে একজন কৃষি শ্রমিকের বার্ষিক উৎপাদনশীলতা ১ হাজার ৯৯০ ডলার বা ২ লাখ ৪৪ হাজার ৭৭০ টাকা।

এ অঞ্চলে কৃষি শ্রমিকের উৎপাদনশীলতায় সবচেয়ে পিছিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান। দেশটির কৃষি শ্রমিকপ্রতি উৎপাদনশীলতার হালনাগাদ হিসাব নেই। তবে ২০২৪ সালের তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, সেখানে একজন কৃষি কর্মীর বার্ষিক উৎপাদনের অর্থমূল্য ১ হাজার ১৫৩ ডলার বা ১ লাখ ৪১ হাজার ১৯ টাকা।

বাংলাদেশে কৃষির সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়িত। এ খাতে নতুন উদ্যোক্তারাও আসছেন। সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যেও কৃষির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। তবে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক নিয়োজিত থাকলেও উৎপাদনশীলতা বাড়ছে না প্রত্যাশিত হারে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকেরা এর পেছনে জমির স্বল্পতা, পুঁজির সংকট, প্রযুক্তির কম ব্যবহার এবং উন্নত বীজের সীমিত প্রাপ্যতাকে দায়ী করছেন।

তাদের মতে, অনেক দেশে কৃষির যেসব কাজ যন্ত্রের সাহায্যে করা হয়, বাংলাদেশে সেসব কাজ এখনো শ্রমিকের মাধ্যমে করা হচ্ছে। ফলে কৃষিতে শ্রমিকের সংখ্যা বেশি হলেও সেই অনুপাতে উৎপাদন বাড়ছে না। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রযুক্তির ব্যবহার, কৃষকের দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।

এফসি