ঢাকাসহ সারাদেশে ৩৮৬ কিশোর গ্যাং, সদস্য ৪ হাজারের বেশি

ঢাকাসহ সারাদেশে ৩৮৬ কিশোর গ্যাং, সদস্য ৪ হাজারের বেশি
সিজেডএন ডেস্ক

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এসব গ্যাংয়ের সদস্যসংখ্যা ৪ হাজার ৩৬২। পুলিশ সদরদপ্তর ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাম্প্রতিক তথ্য এবং সরেজমিন অনুসন্ধানে এ চিত্র পাওয়া গেছে। তবে পুলিশের তালিকার বাইরে আরও কিছু কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে।
এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কেনাবেচা ও সেবন, হামলা, ডাকাতি এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের মতো বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যেও সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
গত ২২ আগস্ট বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার কমিউনিটি সেন্টারের সামনের সড়কে এমনই একটি ঘটনার মুখে পড়েন মো. হানিফ নামের এক যুবক। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এক তরুণ তার পথরোধ করেন। তাকে একটি সরু গলির ভেতর নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন ওই তরুণ। হানিফ রাজি না হওয়ায় পরে একটি চায়ের দোকানের সামনে গিয়ে তাকে ‘পকেটমার’ বলে চিৎকার শুরু করেন।
স্থানীয় লোকজন ওই তরুণের অভিযোগ আমলে নেননি। এলাকায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে হানিফের পরিচিতি থাকায় তাকে তাঁরা চিনতেন। একপর্যায়ে হানিফ পাশের ব্যবসায়ী ও বন্ধু ওমর ফারুককে ফোন করে ঘটনাস্থলে ডাকেন। পরে ওই তরুণকে মারধর করা হলে তিনি পালিয়ে যান।
প্রায় ১০ মিনিট পর চারজনকে সঙ্গে নিয়ে আবার ফিরে আসেন ওই তরুণ। তাদের কারও হাতে ছিল চাপাতি, কারও হাতে সামুরাই। তারা হানিফ ও ফারুককে খুঁজতে থাকেন। আতঙ্কে ফারুক একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন। হানিফ দৌড়ে পাশের রায়েরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, মোহাম্মদপুরে দিনের বেলাতেও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের এমন তৎপরতা দেখা যায়।
রাজধানীর বাইরে ২২৭ গ্যাং
পুলিশ সদরদপ্তরের সাম্প্রতিক তালিকা অনুযায়ী, রাজধানীর বাইরে দেশের বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় ২২৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এসব গ্রুপে সদস্য ২ হাজার ৫৫০ জন।
এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে ৯৮টি, খুলনায় ৭টি, রাজশাহীতে ১৩টি, সিলেটে ১৫টি এবং গাজীপুর মহানগরে ১৩টি গ্রুপ রয়েছে। অন্যান্য মহানগর ও জেলা শহরেও বেশ কিছু গ্রুপ সক্রিয়। জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে নোয়াখালীতে ২৫টি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ১৫৯টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। এসব গ্রুপে সদস্য ১ হাজার ৮১২ জন। ঢাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৭টি গ্যাং রয়েছে মোহাম্মদপুর থানা এলাকায়। এসব গ্রুপের সদস্য অন্তত সাড়ে ৩০০। এরপর রয়েছে পল্লবী। সেখানে ১৬টি গ্রুপের সদস্য অন্তত ১৬০ জন।
তবে পুলিশের তালিকার বাইরেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আরও কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য পেয়েছে সমকাল।
রায়েরবাজারের ঘটনায় ভুক্তভোগী মো. হানিফ বলেন, নিজেকে ‘সুমন গ্রুপের সদস্য’ পরিচয় দিয়ে ওই তরুণ তাকে ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে সরু গলিতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। পরে তিনি ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। তার ভাষ্য, এলাকায় দিন-রাতে মাঝেমধ্যে এ ধরনের ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। বয়সে তরুণ হলেও এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের অনেকেই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য।
খিলগাঁওয়ে চাপাতি নিয়ে মহড়া
ডিএমপির মতিঝিল বিভাগে পুলিশের তালিকায় কিশোর গ্যাং রয়েছে ১৬টি। এর মধ্যে খিলগাঁও থানায় সাতটি, মুগদায় তিনটি, মতিঝিল ও সবুজবাগে দুটি করে চারটি এবং রামপুরা ও শাহজাহানপুরে একটি করে দুটি গ্রুপ রয়েছে।
খিলগাঁওয়ের গ্রুপগুলোর মধ্যে রয়েছে ৯৯৯ গ্রুপ, কেজি ১৯, ০০১ টিকটক গ্রুপ, ০০৭ টিকটক গ্রুপ, আলিফ গ্রুপ ও তারেক গ্রুপ।
গত সোমবার খিলগাঁওয়ে সরেজমিন অনুসন্ধানে পুলিশের তালিকার বাইরে তসলিম গ্রুপ ও রেড লাইন গ্রুপের তথ্য পাওয়া যায়। এসব গ্রুপের বেশির ভাগ সদস্যের বয়স ১৮ বছরের নিচে। সি ব্লক এলাকায় তাদের আধিপত্য রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এসব গ্রুপের সদস্যরা দলবদ্ধ হয়ে মাঝেমধ্যে চাপাতি নিয়ে মহড়া দেন। পাকা সড়কে চাপাতি ঘষে আগুনের ফুলকি তুলে উল্লাসও করেন তারা। ইনস্টাগ্রামে গ্রুপ খুলে অস্ত্রের মহড়ার ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব গ্রুপের সদস্যদের বেশির ভাগ ছিনতাই বা চুরির মতো অপরাধে জড়িত নয়। তবে কেউ কেউ মাদক সেবন ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত।
সরেজমিনে জানা যায়, গত ২৮ জুন সন্ধ্যায় সি ব্লকে রেড লাইন ও ৯৯৯ গ্রুপের সদস্যরা চাপাতি নিয়ে মহড়া দিচ্ছিলেন। এ সময় একই এলাকার কলেজছাত্র সৌরভ মাহমুদকে মারধর করা হয়। পরে তার বাবা বাদী হয়ে দুই গ্রুপের সদস্যদের বিরুদ্ধে খিলগাঁও থানায় মামলা করেন।
মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা খিলগাঁও থানার এসআই সুমন মিয়া গত ২৪ আগস্ট বলেন, এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়েছিল। তারা সবাই কিশোর। আদালতের মাধ্যমে তাদের কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়। পরে তারা জামিনে মুক্তি পান।
মোহাম্মদপুরে ২৭ গ্রুপ
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, তেজগাঁও বিভাগের ছয়টি থানার মধ্যে মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ২৭টি। আদাবরে ছয়টি, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে তিনটি, তেজগাঁও ও শেরেবাংলা নগরে একটি করে এবং হাতিরঝিলে দুটি গ্রুপ রয়েছে।
মোহাম্মদপুরে আধিপত্য বিস্তার, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধে এসব গ্রুপের সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। দেয়ালে চিকা মেরে বা গ্রুপের নাম লিখে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয় তারা। প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ছিনতাইয়ের অভিযোগও রয়েছে।
এলাকাটির কিশোর গ্যাংগুলোর নামও বিচিত্র। এর মধ্যে ডাইল্লা গ্রুপ, পাটালি গ্রুপ, লেভেল হাই গ্রুপ, অ্যালেক্স গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ, লও ঠেলা গ্রুপ, ফরহাদ গ্রুপ, নবী গ্রুপ, ল্যাংড়া নুরু ও কিং শাওন উল্লেখযোগ্য।
প্রতিটি গ্রুপে ১০ থেকে ২৫ জন পর্যন্ত সদস্য রয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এসব গ্রুপের সদস্যদের আয়ের উৎসের মধ্যে রয়েছে মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখল এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ভাড়ায় অংশ নেওয়া।
গত ১২ এপ্রিল মোহাম্মদপুরে দুটি কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষে অ্যালেক্স গ্রুপের দলনেতা মো. ইমন ওরফে অ্যালেক্স ইমনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর তিন দিন পর, ১৫ এপ্রিল রাতে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের হাতে আসাদুল নামে আরেক যুবক নিহত হন।
সবুজবাগে বয়স ২৮-৩০ বছরের সদস্যও
গত সোমবার সবুজবাগ থানার বাসাবো ও কদমতলা এলাকায় অন্তত ২০ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে কিশোর গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ডের তথ্য পাওয়া যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, এসব গ্রুপে ২৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী সদস্যও রয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রুপগুলোর অনেক সদস্য মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। কদমতলা কালভার্ট সড়ক এলাকায় শুভ ওরফে চীনা শুভর গ্রুপে অন্তত ১০ জন সদস্য রয়েছেন। তারা সবাই ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। কিশোর বয়স থেকেই শুভ ওই গ্রুপ পরিচালনা করে আসছেন বলে তারা জানান।
দক্ষিণগাঁও এলাকায় মোহাম্মদ আলী নামে এক মাদক ব্যবসায়ীর তিন ছেলের কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্যও পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তারা তাদের বাবার ইয়াবা ব্যবসায় সহযোগিতা করেন।
ডেমরায় পুলিশের তালিকার বাইরে আরও গ্রুপ
পুলিশের হিসাবে ডেমরা থানায় কিশোর গ্যাং রয়েছে তিনটি। এর মধ্যে তুহিন গ্যাং, শিমু বাহিনী ও নাম না জানা আরেকটি গ্রুপ রয়েছে। তবে সরেজমিন অনুসন্ধানে পুলিশের তালিকার বাইরে আরও কয়েকটি গ্রুপের নাম পাওয়া যায়।
রসুলনগর-আমতলা এলাকায় রেম্বো সাগর ওরফে ইমন গ্রুপ এবং বক্সনগর এলাকায় নাহিদ গ্রুপ ও হোসেন গ্রুপের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব গ্রুপের সদস্যদের বয়স ১৮ বছরের নিচে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, সন্ধ্যার পর এসব গ্রুপের সদস্যরা বিভিন্ন সড়কে দলবদ্ধ হয়ে আড্ডা দেন। সুযোগ পেলে রাতে পথচারীদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও টাকা ছিনিয়ে নেন। হামলা বা হয়রানির ভয়ে অনেকেই তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে চান না।
মিরপুরে ৩৫টি গ্রুপ
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর বিভাগের সাতটি থানায় ৩৫টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। এর মধ্যে পল্লবী থানা এলাকায় ১৬টি, দারুসসালামে ছয়টি, শাহআলীতে চারটি, মিরপুরে তিনটি এবং কাফরুল, ভাসানটেক ও রূপনগরে দুটি করে ছয়টি গ্রুপ রয়েছে।
অভিভাবকের উদাসীনতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার
পুলিশ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ার পেছনে পারিবারিক ও সামাজিক নানা কারণ রয়েছে। অভিভাবকদের উদাসীনতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার, মূল্যবোধের ঘাটতি, অসৎ সঙ্গ, নিজেকে অন্যদের কাছে সাহসী বা প্রভাবশালী হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা, সুস্থ বিনোদনের অভাব এবং মানসিক হতাশা এর মধ্যে অন্যতম।
পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা চাঁদাবাজি ও মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের মধ্যে এক ধরনের ‘হিরোইজম’ দেখানোর প্রবণতা রয়েছে। এর সঙ্গে আর্থিক স্বার্থ যুক্ত থাকায় তাঁরা সহজেই সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েন।
খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেড়ে যায়। বর্তমানে পুলিশ অভিযান চালিয়ে অনেককে আইনের আওতায় এনেছে এবং মামলা করেছে। পুলিশের তৎপরতার কারণে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিকভাবে কেউ যেন এসব কিশোরকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করতে বা কোনো ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা দিতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। কিশোরদের বিপথে যাওয়া ঠেকাতে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সদরদপ্তর থেকেও মাঠপর্যায়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত কিশোরদের একটি অংশ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে। এর বাইরে কর্মহীন কিশোর, সামাজিক ও পারিবারিক শিষ্টাচারের প্রতি অনাগ্রহ, কোনো ‘বড় ভাইয়ের’ রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক স্বার্থ পূরণ, আধিপত্য বিস্তার এবং মাদকের বাজার নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়ও কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে।
ড. তৌহিদুল হকের মতে, কিশোর অপরাধকে ঘিরে গড়ে ওঠা অর্থনীতি ও এর ভয়াবহতা এখন বড় ধরনের সমস্যায় পরিণত হয়েছে। আইনের মাধ্যমে কিশোরদের সংশোধনের সুযোগ রাখার পাশাপাশি অপরাধের পেছনে থাকা সুবিধাভোগী পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করতে পারলে এ সমস্যা থেকে উত্তরণের সুযোগ তৈরি হবে।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এসব গ্যাংয়ের সদস্যসংখ্যা ৪ হাজার ৩৬২। পুলিশ সদরদপ্তর ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাম্প্রতিক তথ্য এবং সরেজমিন অনুসন্ধানে এ চিত্র পাওয়া গেছে। তবে পুলিশের তালিকার বাইরে আরও কিছু কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে।
এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কেনাবেচা ও সেবন, হামলা, ডাকাতি এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের মতো বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যেও সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
গত ২২ আগস্ট বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার কমিউনিটি সেন্টারের সামনের সড়কে এমনই একটি ঘটনার মুখে পড়েন মো. হানিফ নামের এক যুবক। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এক তরুণ তার পথরোধ করেন। তাকে একটি সরু গলির ভেতর নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন ওই তরুণ। হানিফ রাজি না হওয়ায় পরে একটি চায়ের দোকানের সামনে গিয়ে তাকে ‘পকেটমার’ বলে চিৎকার শুরু করেন।
স্থানীয় লোকজন ওই তরুণের অভিযোগ আমলে নেননি। এলাকায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে হানিফের পরিচিতি থাকায় তাকে তাঁরা চিনতেন। একপর্যায়ে হানিফ পাশের ব্যবসায়ী ও বন্ধু ওমর ফারুককে ফোন করে ঘটনাস্থলে ডাকেন। পরে ওই তরুণকে মারধর করা হলে তিনি পালিয়ে যান।
প্রায় ১০ মিনিট পর চারজনকে সঙ্গে নিয়ে আবার ফিরে আসেন ওই তরুণ। তাদের কারও হাতে ছিল চাপাতি, কারও হাতে সামুরাই। তারা হানিফ ও ফারুককে খুঁজতে থাকেন। আতঙ্কে ফারুক একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন। হানিফ দৌড়ে পাশের রায়েরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, মোহাম্মদপুরে দিনের বেলাতেও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের এমন তৎপরতা দেখা যায়।
রাজধানীর বাইরে ২২৭ গ্যাং
পুলিশ সদরদপ্তরের সাম্প্রতিক তালিকা অনুযায়ী, রাজধানীর বাইরে দেশের বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় ২২৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এসব গ্রুপে সদস্য ২ হাজার ৫৫০ জন।
এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে ৯৮টি, খুলনায় ৭টি, রাজশাহীতে ১৩টি, সিলেটে ১৫টি এবং গাজীপুর মহানগরে ১৩টি গ্রুপ রয়েছে। অন্যান্য মহানগর ও জেলা শহরেও বেশ কিছু গ্রুপ সক্রিয়। জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে নোয়াখালীতে ২৫টি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ১৫৯টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। এসব গ্রুপে সদস্য ১ হাজার ৮১২ জন। ঢাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৭টি গ্যাং রয়েছে মোহাম্মদপুর থানা এলাকায়। এসব গ্রুপের সদস্য অন্তত সাড়ে ৩০০। এরপর রয়েছে পল্লবী। সেখানে ১৬টি গ্রুপের সদস্য অন্তত ১৬০ জন।
তবে পুলিশের তালিকার বাইরেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আরও কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য পেয়েছে সমকাল।
রায়েরবাজারের ঘটনায় ভুক্তভোগী মো. হানিফ বলেন, নিজেকে ‘সুমন গ্রুপের সদস্য’ পরিচয় দিয়ে ওই তরুণ তাকে ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে সরু গলিতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। পরে তিনি ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। তার ভাষ্য, এলাকায় দিন-রাতে মাঝেমধ্যে এ ধরনের ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। বয়সে তরুণ হলেও এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের অনেকেই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য।
খিলগাঁওয়ে চাপাতি নিয়ে মহড়া
ডিএমপির মতিঝিল বিভাগে পুলিশের তালিকায় কিশোর গ্যাং রয়েছে ১৬টি। এর মধ্যে খিলগাঁও থানায় সাতটি, মুগদায় তিনটি, মতিঝিল ও সবুজবাগে দুটি করে চারটি এবং রামপুরা ও শাহজাহানপুরে একটি করে দুটি গ্রুপ রয়েছে।
খিলগাঁওয়ের গ্রুপগুলোর মধ্যে রয়েছে ৯৯৯ গ্রুপ, কেজি ১৯, ০০১ টিকটক গ্রুপ, ০০৭ টিকটক গ্রুপ, আলিফ গ্রুপ ও তারেক গ্রুপ।
গত সোমবার খিলগাঁওয়ে সরেজমিন অনুসন্ধানে পুলিশের তালিকার বাইরে তসলিম গ্রুপ ও রেড লাইন গ্রুপের তথ্য পাওয়া যায়। এসব গ্রুপের বেশির ভাগ সদস্যের বয়স ১৮ বছরের নিচে। সি ব্লক এলাকায় তাদের আধিপত্য রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এসব গ্রুপের সদস্যরা দলবদ্ধ হয়ে মাঝেমধ্যে চাপাতি নিয়ে মহড়া দেন। পাকা সড়কে চাপাতি ঘষে আগুনের ফুলকি তুলে উল্লাসও করেন তারা। ইনস্টাগ্রামে গ্রুপ খুলে অস্ত্রের মহড়ার ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব গ্রুপের সদস্যদের বেশির ভাগ ছিনতাই বা চুরির মতো অপরাধে জড়িত নয়। তবে কেউ কেউ মাদক সেবন ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত।
সরেজমিনে জানা যায়, গত ২৮ জুন সন্ধ্যায় সি ব্লকে রেড লাইন ও ৯৯৯ গ্রুপের সদস্যরা চাপাতি নিয়ে মহড়া দিচ্ছিলেন। এ সময় একই এলাকার কলেজছাত্র সৌরভ মাহমুদকে মারধর করা হয়। পরে তার বাবা বাদী হয়ে দুই গ্রুপের সদস্যদের বিরুদ্ধে খিলগাঁও থানায় মামলা করেন।
মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা খিলগাঁও থানার এসআই সুমন মিয়া গত ২৪ আগস্ট বলেন, এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়েছিল। তারা সবাই কিশোর। আদালতের মাধ্যমে তাদের কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়। পরে তারা জামিনে মুক্তি পান।
মোহাম্মদপুরে ২৭ গ্রুপ
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, তেজগাঁও বিভাগের ছয়টি থানার মধ্যে মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ২৭টি। আদাবরে ছয়টি, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে তিনটি, তেজগাঁও ও শেরেবাংলা নগরে একটি করে এবং হাতিরঝিলে দুটি গ্রুপ রয়েছে।
মোহাম্মদপুরে আধিপত্য বিস্তার, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধে এসব গ্রুপের সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। দেয়ালে চিকা মেরে বা গ্রুপের নাম লিখে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয় তারা। প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ছিনতাইয়ের অভিযোগও রয়েছে।
এলাকাটির কিশোর গ্যাংগুলোর নামও বিচিত্র। এর মধ্যে ডাইল্লা গ্রুপ, পাটালি গ্রুপ, লেভেল হাই গ্রুপ, অ্যালেক্স গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ, লও ঠেলা গ্রুপ, ফরহাদ গ্রুপ, নবী গ্রুপ, ল্যাংড়া নুরু ও কিং শাওন উল্লেখযোগ্য।
প্রতিটি গ্রুপে ১০ থেকে ২৫ জন পর্যন্ত সদস্য রয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এসব গ্রুপের সদস্যদের আয়ের উৎসের মধ্যে রয়েছে মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখল এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ভাড়ায় অংশ নেওয়া।
গত ১২ এপ্রিল মোহাম্মদপুরে দুটি কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষে অ্যালেক্স গ্রুপের দলনেতা মো. ইমন ওরফে অ্যালেক্স ইমনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর তিন দিন পর, ১৫ এপ্রিল রাতে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের হাতে আসাদুল নামে আরেক যুবক নিহত হন।
সবুজবাগে বয়স ২৮-৩০ বছরের সদস্যও
গত সোমবার সবুজবাগ থানার বাসাবো ও কদমতলা এলাকায় অন্তত ২০ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে কিশোর গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ডের তথ্য পাওয়া যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, এসব গ্রুপে ২৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী সদস্যও রয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রুপগুলোর অনেক সদস্য মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। কদমতলা কালভার্ট সড়ক এলাকায় শুভ ওরফে চীনা শুভর গ্রুপে অন্তত ১০ জন সদস্য রয়েছেন। তারা সবাই ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। কিশোর বয়স থেকেই শুভ ওই গ্রুপ পরিচালনা করে আসছেন বলে তারা জানান।
দক্ষিণগাঁও এলাকায় মোহাম্মদ আলী নামে এক মাদক ব্যবসায়ীর তিন ছেলের কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্যও পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তারা তাদের বাবার ইয়াবা ব্যবসায় সহযোগিতা করেন।
ডেমরায় পুলিশের তালিকার বাইরে আরও গ্রুপ
পুলিশের হিসাবে ডেমরা থানায় কিশোর গ্যাং রয়েছে তিনটি। এর মধ্যে তুহিন গ্যাং, শিমু বাহিনী ও নাম না জানা আরেকটি গ্রুপ রয়েছে। তবে সরেজমিন অনুসন্ধানে পুলিশের তালিকার বাইরে আরও কয়েকটি গ্রুপের নাম পাওয়া যায়।
রসুলনগর-আমতলা এলাকায় রেম্বো সাগর ওরফে ইমন গ্রুপ এবং বক্সনগর এলাকায় নাহিদ গ্রুপ ও হোসেন গ্রুপের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব গ্রুপের সদস্যদের বয়স ১৮ বছরের নিচে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, সন্ধ্যার পর এসব গ্রুপের সদস্যরা বিভিন্ন সড়কে দলবদ্ধ হয়ে আড্ডা দেন। সুযোগ পেলে রাতে পথচারীদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও টাকা ছিনিয়ে নেন। হামলা বা হয়রানির ভয়ে অনেকেই তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে চান না।
মিরপুরে ৩৫টি গ্রুপ
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর বিভাগের সাতটি থানায় ৩৫টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। এর মধ্যে পল্লবী থানা এলাকায় ১৬টি, দারুসসালামে ছয়টি, শাহআলীতে চারটি, মিরপুরে তিনটি এবং কাফরুল, ভাসানটেক ও রূপনগরে দুটি করে ছয়টি গ্রুপ রয়েছে।
অভিভাবকের উদাসীনতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার
পুলিশ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ার পেছনে পারিবারিক ও সামাজিক নানা কারণ রয়েছে। অভিভাবকদের উদাসীনতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার, মূল্যবোধের ঘাটতি, অসৎ সঙ্গ, নিজেকে অন্যদের কাছে সাহসী বা প্রভাবশালী হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা, সুস্থ বিনোদনের অভাব এবং মানসিক হতাশা এর মধ্যে অন্যতম।
পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা চাঁদাবাজি ও মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের মধ্যে এক ধরনের ‘হিরোইজম’ দেখানোর প্রবণতা রয়েছে। এর সঙ্গে আর্থিক স্বার্থ যুক্ত থাকায় তাঁরা সহজেই সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েন।
খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেড়ে যায়। বর্তমানে পুলিশ অভিযান চালিয়ে অনেককে আইনের আওতায় এনেছে এবং মামলা করেছে। পুলিশের তৎপরতার কারণে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিকভাবে কেউ যেন এসব কিশোরকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করতে বা কোনো ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা দিতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। কিশোরদের বিপথে যাওয়া ঠেকাতে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সদরদপ্তর থেকেও মাঠপর্যায়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত কিশোরদের একটি অংশ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে। এর বাইরে কর্মহীন কিশোর, সামাজিক ও পারিবারিক শিষ্টাচারের প্রতি অনাগ্রহ, কোনো ‘বড় ভাইয়ের’ রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক স্বার্থ পূরণ, আধিপত্য বিস্তার এবং মাদকের বাজার নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়ও কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে।
ড. তৌহিদুল হকের মতে, কিশোর অপরাধকে ঘিরে গড়ে ওঠা অর্থনীতি ও এর ভয়াবহতা এখন বড় ধরনের সমস্যায় পরিণত হয়েছে। আইনের মাধ্যমে কিশোরদের সংশোধনের সুযোগ রাখার পাশাপাশি অপরাধের পেছনে থাকা সুবিধাভোগী পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করতে পারলে এ সমস্যা থেকে উত্তরণের সুযোগ তৈরি হবে।

ঢাকাসহ সারাদেশে ৩৮৬ কিশোর গ্যাং, সদস্য ৪ হাজারের বেশি
সিজেডএন ডেস্ক

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এসব গ্যাংয়ের সদস্যসংখ্যা ৪ হাজার ৩৬২। পুলিশ সদরদপ্তর ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাম্প্রতিক তথ্য এবং সরেজমিন অনুসন্ধানে এ চিত্র পাওয়া গেছে। তবে পুলিশের তালিকার বাইরে আরও কিছু কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে।
এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কেনাবেচা ও সেবন, হামলা, ডাকাতি এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের মতো বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যেও সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
গত ২২ আগস্ট বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার কমিউনিটি সেন্টারের সামনের সড়কে এমনই একটি ঘটনার মুখে পড়েন মো. হানিফ নামের এক যুবক। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এক তরুণ তার পথরোধ করেন। তাকে একটি সরু গলির ভেতর নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন ওই তরুণ। হানিফ রাজি না হওয়ায় পরে একটি চায়ের দোকানের সামনে গিয়ে তাকে ‘পকেটমার’ বলে চিৎকার শুরু করেন।
স্থানীয় লোকজন ওই তরুণের অভিযোগ আমলে নেননি। এলাকায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে হানিফের পরিচিতি থাকায় তাকে তাঁরা চিনতেন। একপর্যায়ে হানিফ পাশের ব্যবসায়ী ও বন্ধু ওমর ফারুককে ফোন করে ঘটনাস্থলে ডাকেন। পরে ওই তরুণকে মারধর করা হলে তিনি পালিয়ে যান।
প্রায় ১০ মিনিট পর চারজনকে সঙ্গে নিয়ে আবার ফিরে আসেন ওই তরুণ। তাদের কারও হাতে ছিল চাপাতি, কারও হাতে সামুরাই। তারা হানিফ ও ফারুককে খুঁজতে থাকেন। আতঙ্কে ফারুক একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন। হানিফ দৌড়ে পাশের রায়েরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, মোহাম্মদপুরে দিনের বেলাতেও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের এমন তৎপরতা দেখা যায়।
রাজধানীর বাইরে ২২৭ গ্যাং
পুলিশ সদরদপ্তরের সাম্প্রতিক তালিকা অনুযায়ী, রাজধানীর বাইরে দেশের বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় ২২৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এসব গ্রুপে সদস্য ২ হাজার ৫৫০ জন।
এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে ৯৮টি, খুলনায় ৭টি, রাজশাহীতে ১৩টি, সিলেটে ১৫টি এবং গাজীপুর মহানগরে ১৩টি গ্রুপ রয়েছে। অন্যান্য মহানগর ও জেলা শহরেও বেশ কিছু গ্রুপ সক্রিয়। জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে নোয়াখালীতে ২৫টি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ১৫৯টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। এসব গ্রুপে সদস্য ১ হাজার ৮১২ জন। ঢাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৭টি গ্যাং রয়েছে মোহাম্মদপুর থানা এলাকায়। এসব গ্রুপের সদস্য অন্তত সাড়ে ৩০০। এরপর রয়েছে পল্লবী। সেখানে ১৬টি গ্রুপের সদস্য অন্তত ১৬০ জন।
তবে পুলিশের তালিকার বাইরেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আরও কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য পেয়েছে সমকাল।
রায়েরবাজারের ঘটনায় ভুক্তভোগী মো. হানিফ বলেন, নিজেকে ‘সুমন গ্রুপের সদস্য’ পরিচয় দিয়ে ওই তরুণ তাকে ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে সরু গলিতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। পরে তিনি ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। তার ভাষ্য, এলাকায় দিন-রাতে মাঝেমধ্যে এ ধরনের ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। বয়সে তরুণ হলেও এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের অনেকেই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য।
খিলগাঁওয়ে চাপাতি নিয়ে মহড়া
ডিএমপির মতিঝিল বিভাগে পুলিশের তালিকায় কিশোর গ্যাং রয়েছে ১৬টি। এর মধ্যে খিলগাঁও থানায় সাতটি, মুগদায় তিনটি, মতিঝিল ও সবুজবাগে দুটি করে চারটি এবং রামপুরা ও শাহজাহানপুরে একটি করে দুটি গ্রুপ রয়েছে।
খিলগাঁওয়ের গ্রুপগুলোর মধ্যে রয়েছে ৯৯৯ গ্রুপ, কেজি ১৯, ০০১ টিকটক গ্রুপ, ০০৭ টিকটক গ্রুপ, আলিফ গ্রুপ ও তারেক গ্রুপ।
গত সোমবার খিলগাঁওয়ে সরেজমিন অনুসন্ধানে পুলিশের তালিকার বাইরে তসলিম গ্রুপ ও রেড লাইন গ্রুপের তথ্য পাওয়া যায়। এসব গ্রুপের বেশির ভাগ সদস্যের বয়স ১৮ বছরের নিচে। সি ব্লক এলাকায় তাদের আধিপত্য রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এসব গ্রুপের সদস্যরা দলবদ্ধ হয়ে মাঝেমধ্যে চাপাতি নিয়ে মহড়া দেন। পাকা সড়কে চাপাতি ঘষে আগুনের ফুলকি তুলে উল্লাসও করেন তারা। ইনস্টাগ্রামে গ্রুপ খুলে অস্ত্রের মহড়ার ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব গ্রুপের সদস্যদের বেশির ভাগ ছিনতাই বা চুরির মতো অপরাধে জড়িত নয়। তবে কেউ কেউ মাদক সেবন ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত।
সরেজমিনে জানা যায়, গত ২৮ জুন সন্ধ্যায় সি ব্লকে রেড লাইন ও ৯৯৯ গ্রুপের সদস্যরা চাপাতি নিয়ে মহড়া দিচ্ছিলেন। এ সময় একই এলাকার কলেজছাত্র সৌরভ মাহমুদকে মারধর করা হয়। পরে তার বাবা বাদী হয়ে দুই গ্রুপের সদস্যদের বিরুদ্ধে খিলগাঁও থানায় মামলা করেন।
মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা খিলগাঁও থানার এসআই সুমন মিয়া গত ২৪ আগস্ট বলেন, এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়েছিল। তারা সবাই কিশোর। আদালতের মাধ্যমে তাদের কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়। পরে তারা জামিনে মুক্তি পান।
মোহাম্মদপুরে ২৭ গ্রুপ
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, তেজগাঁও বিভাগের ছয়টি থানার মধ্যে মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ২৭টি। আদাবরে ছয়টি, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে তিনটি, তেজগাঁও ও শেরেবাংলা নগরে একটি করে এবং হাতিরঝিলে দুটি গ্রুপ রয়েছে।
মোহাম্মদপুরে আধিপত্য বিস্তার, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধে এসব গ্রুপের সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। দেয়ালে চিকা মেরে বা গ্রুপের নাম লিখে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয় তারা। প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ছিনতাইয়ের অভিযোগও রয়েছে।
এলাকাটির কিশোর গ্যাংগুলোর নামও বিচিত্র। এর মধ্যে ডাইল্লা গ্রুপ, পাটালি গ্রুপ, লেভেল হাই গ্রুপ, অ্যালেক্স গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ, লও ঠেলা গ্রুপ, ফরহাদ গ্রুপ, নবী গ্রুপ, ল্যাংড়া নুরু ও কিং শাওন উল্লেখযোগ্য।
প্রতিটি গ্রুপে ১০ থেকে ২৫ জন পর্যন্ত সদস্য রয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এসব গ্রুপের সদস্যদের আয়ের উৎসের মধ্যে রয়েছে মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখল এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ভাড়ায় অংশ নেওয়া।
গত ১২ এপ্রিল মোহাম্মদপুরে দুটি কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষে অ্যালেক্স গ্রুপের দলনেতা মো. ইমন ওরফে অ্যালেক্স ইমনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর তিন দিন পর, ১৫ এপ্রিল রাতে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের হাতে আসাদুল নামে আরেক যুবক নিহত হন।
সবুজবাগে বয়স ২৮-৩০ বছরের সদস্যও
গত সোমবার সবুজবাগ থানার বাসাবো ও কদমতলা এলাকায় অন্তত ২০ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে কিশোর গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ডের তথ্য পাওয়া যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, এসব গ্রুপে ২৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী সদস্যও রয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রুপগুলোর অনেক সদস্য মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। কদমতলা কালভার্ট সড়ক এলাকায় শুভ ওরফে চীনা শুভর গ্রুপে অন্তত ১০ জন সদস্য রয়েছেন। তারা সবাই ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। কিশোর বয়স থেকেই শুভ ওই গ্রুপ পরিচালনা করে আসছেন বলে তারা জানান।
দক্ষিণগাঁও এলাকায় মোহাম্মদ আলী নামে এক মাদক ব্যবসায়ীর তিন ছেলের কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্যও পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তারা তাদের বাবার ইয়াবা ব্যবসায় সহযোগিতা করেন।
ডেমরায় পুলিশের তালিকার বাইরে আরও গ্রুপ
পুলিশের হিসাবে ডেমরা থানায় কিশোর গ্যাং রয়েছে তিনটি। এর মধ্যে তুহিন গ্যাং, শিমু বাহিনী ও নাম না জানা আরেকটি গ্রুপ রয়েছে। তবে সরেজমিন অনুসন্ধানে পুলিশের তালিকার বাইরে আরও কয়েকটি গ্রুপের নাম পাওয়া যায়।
রসুলনগর-আমতলা এলাকায় রেম্বো সাগর ওরফে ইমন গ্রুপ এবং বক্সনগর এলাকায় নাহিদ গ্রুপ ও হোসেন গ্রুপের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব গ্রুপের সদস্যদের বয়স ১৮ বছরের নিচে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, সন্ধ্যার পর এসব গ্রুপের সদস্যরা বিভিন্ন সড়কে দলবদ্ধ হয়ে আড্ডা দেন। সুযোগ পেলে রাতে পথচারীদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও টাকা ছিনিয়ে নেন। হামলা বা হয়রানির ভয়ে অনেকেই তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে চান না।
মিরপুরে ৩৫টি গ্রুপ
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর বিভাগের সাতটি থানায় ৩৫টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। এর মধ্যে পল্লবী থানা এলাকায় ১৬টি, দারুসসালামে ছয়টি, শাহআলীতে চারটি, মিরপুরে তিনটি এবং কাফরুল, ভাসানটেক ও রূপনগরে দুটি করে ছয়টি গ্রুপ রয়েছে।
অভিভাবকের উদাসীনতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার
পুলিশ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ার পেছনে পারিবারিক ও সামাজিক নানা কারণ রয়েছে। অভিভাবকদের উদাসীনতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার, মূল্যবোধের ঘাটতি, অসৎ সঙ্গ, নিজেকে অন্যদের কাছে সাহসী বা প্রভাবশালী হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা, সুস্থ বিনোদনের অভাব এবং মানসিক হতাশা এর মধ্যে অন্যতম।
পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা চাঁদাবাজি ও মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের মধ্যে এক ধরনের ‘হিরোইজম’ দেখানোর প্রবণতা রয়েছে। এর সঙ্গে আর্থিক স্বার্থ যুক্ত থাকায় তাঁরা সহজেই সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েন।
খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেড়ে যায়। বর্তমানে পুলিশ অভিযান চালিয়ে অনেককে আইনের আওতায় এনেছে এবং মামলা করেছে। পুলিশের তৎপরতার কারণে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিকভাবে কেউ যেন এসব কিশোরকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করতে বা কোনো ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা দিতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। কিশোরদের বিপথে যাওয়া ঠেকাতে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সদরদপ্তর থেকেও মাঠপর্যায়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত কিশোরদের একটি অংশ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে। এর বাইরে কর্মহীন কিশোর, সামাজিক ও পারিবারিক শিষ্টাচারের প্রতি অনাগ্রহ, কোনো ‘বড় ভাইয়ের’ রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক স্বার্থ পূরণ, আধিপত্য বিস্তার এবং মাদকের বাজার নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়ও কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে।
ড. তৌহিদুল হকের মতে, কিশোর অপরাধকে ঘিরে গড়ে ওঠা অর্থনীতি ও এর ভয়াবহতা এখন বড় ধরনের সমস্যায় পরিণত হয়েছে। আইনের মাধ্যমে কিশোরদের সংশোধনের সুযোগ রাখার পাশাপাশি অপরাধের পেছনে থাকা সুবিধাভোগী পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করতে পারলে এ সমস্যা থেকে উত্তরণের সুযোগ তৈরি হবে।









