শিরোনাম

৫৫ কেজি স্বর্ণ গায়েবে কর্মকর্তা ও সিপাহিরা জড়িত

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
৫৫ কেজি স্বর্ণ গায়েবে কর্মকর্তা ও সিপাহিরা জড়িত
বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের কাছ থেকে উদ্ধার করা স্বর্ণ

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঢাকা কাস্টমস হাউজের গোডাউন থেকে ৫৫ দশমিক ৫১ কেজি স্বর্ণ গায়েবের ঘটনায় একাধিক কর্মকর্তা ও সিপাহির জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ধাপে ধাপে এই স্বর্ণ সরানো হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে গোডাউনে থাকা স্টিলের আলমারির লকার ভেঙে স্বর্ণ চুরির নাটক সাজানো হয়।

আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো– বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর ওই গোডাউনে ক্লিনার পরিচয়ে নিয়মিত যাতায়াত করতেন রাসেল নামে এক বহিরাগত যুবক। স্বর্ণ গায়েবের ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর থেকে তারও কোনো সন্ধান মিলছে না।

এই স্বর্ণ চুরির অভিযোগে ২০২৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন ঢাকা শুল্ক বিভাগের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা সোহরাব হোসেন। মামলার পর তদন্তে নামে ডিবি ও পিবিআই। তদন্তের একপর্যায়ে গোডাউনের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাসুদ রানা, সাইফুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম ও আকতার শেখ এবং সিপাহি রেজাউল করিম, মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, আফজাল হোসেন ও নিয়ামত হাওলাদারকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

প্রায় দুই বছর তদন্তের পর পিবিআইয়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত মামলার অভিযোগ দুদককে তদন্তের নির্দেশ দেন। ২০২৫ সালের এপ্রিলে অনুসন্ধানে নামে দুদক।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে আটক করা ৫৫ দশমিক ৫১ কেজি স্বর্ণ গোডাউনের স্টিলের আলমারিতে সংরক্ষিত ছিল। ২০২৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা ১৫ মিনিট থেকে পরদিন সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে কোনো একসময় দুর্বৃত্তরা গোডাউনের আলমারির লকার ভেঙে এসব স্বর্ণ চুরি করে নিয়ে যায়।

তবে তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এক রাতে পুরো স্বর্ণ গায়েব হয়নি। বরং ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে গোডাউনে দায়িত্ব পালনকারী একাধিক কর্মকর্তা ও সিপাহি ধাপে ধাপে স্বর্ণ সরিয়েছেন। মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে, তাদের বাইরে আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।

তদন্ত সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি স্বর্ণ পাওয়া গেলে কাস্টমস তা জব্দ করে এবং পরে গোডাউনে সংরক্ষণ করা হয়। জব্দ করা স্বর্ণের বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়া শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে অবৈধভাবে আনা স্বর্ণ বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ায় পাঠানোর কথা। কিন্তু গোডাউনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন এসব স্বর্ণ গোডাউনে আটকে রাখতেন।

তদন্ত কর্মকর্তাদের ধারণা, এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে সংরক্ষিত স্বর্ণ অল্প অল্প করে সরিয়ে নেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে স্বর্ণ সরানোর পর যখন হিসাবের সঙ্গে গরমিল ধরা পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, তখন ঘটনাটিকে চুরি হিসেবে দেখানোর পরিকল্পনা করা হয়।

কাস্টমস গোডাউনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সাধারণত ৬ মাস পরপর বদলি করা হয়। ২০২৩ সালের জুনে নতুন দুজন কর্মকর্তা সেখানে যোগ দেন। দায়িত্বগ্রহণের সময় তারা গোডাউনে থাকা পণ্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বুঝে নেন। তদন্তে উঠে এসেছে, ওই দুই কর্মকর্তা ছিলেন তুলনামূলকভাবে নবীন। দায়িত্বগ্রহণের সময় গোডাউনে থাকা সব পণ্য ও নথিপত্র বিস্তারিতভাবে যাচাই করে নেওয়া হয়নি। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে তাদের সন্দেহ তৈরি হলে তারা নথিপত্রের সঙ্গে গোডাউনে থাকা মালামাল মিলিয়ে দেখতে শুরু করেন। তখনই স্বর্ণের হিসাবের সঙ্গে গরমিল ধরা পড়ে।

তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে রাসেল নামে ওই ব্যক্তিকে ঘিরে। তদন্ত কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরের কেপিআইভুক্ত একটি সংরক্ষিত এলাকায় অবস্থিত কাস্টমস গোডাউনে রাসেল নিয়মিত যাতায়াত করতেন। তিনি নিজেকে ক্লিনার হিসেবে পরিচয় দিতেন। কিন্তু বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট রেকর্ডে রাসেল নামে কোনো ক্লিনারের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে তদন্তকারীদের ধারণা, তিনি ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে গোডাউনে প্রবেশ করতেন।

স্বর্ণ গায়েবের ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই রাসেল আত্মগোপনে রয়েছেন। তার কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানাও এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে তার শ্বশুরবাড়ির সন্ধান পেয়েছেন তদন্তকারীরা। সেখান থেকে তার অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

৫৫ দশমিক ৫১ কেজি স্বর্ণের হিসাব দীর্ঘ সময় ধরে কীভাবে গরমিল হলো এ প্রশ্নও উঠেছে তদন্তে। সংশ্লিষ্টদের মতে, গোডাউনে সংরক্ষিত স্বর্ণের নিয়মিত হিসাব ও তদারকিতে ঘাটতি ছিল। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পাশাপাশি তদারকির দায়িত্বে থাকা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভূমিকা ও গাফিলতিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

/এফসি/