দক্ষিণ কোরিয়ায় বসে আদালতে ‘সশরীরে আত্মসমর্পণ’, নিলেন জামিন

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
দক্ষিণ কোরিয়ায় বসে আদালতে ‘সশরীরে আত্মসমর্পণ’, নিলেন জামিন
আদালতের আদেশ

দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থান করেও খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার একটি মারামারির মামলায় আদালতে ‘সশরীরে আত্মসমর্পণ’ করে জামিন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ফিরোজ আলম শাওনের বিরুদ্ধে। তার পরিবর্তে অন্য এক ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করে ‘ফিরোজ আলম শাওন’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে জামিন নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ঘটনাটি ঘটে গত ১৬ মার্চ। প্রায় চার মাস পর বিষয়টি আদালতের নজরে এলে তদন্তে উঠে আসে এই জালিয়াতির তথ্য। এ ঘটনায় মূল আসামি ফিরোজ আলম শাওন ও তার আইনজীবী সরদার শাহজাহান আলীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ইতিমধ্যে এ মামলায় শাওনের ভাই ফেরদৌস আলম সেতুকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

পুলিশ জানায়, গত শনিবার রাতে সেতুকে গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল রোববার তাকে আদালতে হাজির করা হলে বিচারক কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

মামলার এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ রাতে দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি বরইতলা ঘাট এলাকায় প্রতিবেশী তরিকুল আমিনকে মারধরের অভিযোগ ওঠে শাওন ও তার স্বজনদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তরিকুল আমিন বাদী হয়ে শাওনসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। পরে আদালতের নির্দেশে মামলাটি তদন্ত শুরু করে দিঘলিয়া থানা।

মামলাটি তদন্ত করেন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জামিল হোসেন। তদন্ত শেষে গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর তিনি শুধু ফিরোজ আলম শাওনকে অভিযুক্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দেন। বর্তমানে খুলনার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে।

বাদীপক্ষের আইনজীবী আজমল হোসেন বলেন, মামলায় অভিযোগ গঠনের দিন ধার্য হওয়ার পর তারা জানতে পারেন, ১৬ মার্চ শাওন আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ হলে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শাওন দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থান করছেন। জামিন নেওয়ার সময়ও তিনি দেশে ছিলেন না।

পরে বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন বাদী তরিকুল আমিন। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৪-এর বিচারক ফাতেমা জান্নাত বিষয়টি তদন্ত করেন। তদন্তে শাওনের পরিবর্তে অন্য একজনকে আদালতে হাজির করে জামিন নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় বলে আদালতের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আদালতের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সিআর ৬৩/২০২৫ (দিঘলিয়া) মামলার আসামি ফিরোজ আলম শাওন ১৬ মার্চ আইনজীবী সরদার শাহজাহান আলীর ওকালতনামার মাধ্যমে আদালতে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন। মামলাটি জামিনযোগ্য হওয়ায় আদালত তাঁকে ১০০ টাকা বন্ডে জামিন দেন।

তবে ২৩ এপ্রিল বাদী তরিকুল আমিন আদালতে আবেদন করে জানান, মামলার আসামি শাওন দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে অবস্থান করছেন। দেশে না ফিরেই তিনি কীভাবে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বাদী।

এরপর ২৭ এপ্রিল আসামিপক্ষের আইনজীবী সরদার শাহজাহান আলী আদালতে তার ওকালতনামা প্রত্যাহারের আবেদন করেন। আবেদনে তিনি দাবি করেন, তার ওকালতনামা ব্যবহার করে অন্য একজনকে শাওন সাজিয়ে আদালতে হাজির করা হয়েছিল এবং তার মাধ্যমে জামিন নেওয়া হয়েছে।

বিষয়টি তদন্ত করে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৪-এর বিচারক ফাতেমা জান্নাত গত ২২ জুলাই খুলনার মুখ্য মহানগর হাকিমের কাছে প্রতিবেদন দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, শাওন দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থান করার সময় তার পরিবর্তে অন্য একজনকে আদালতে হাজির করে জামিন নেওয়া হয়েছে। প্রতারণার মাধ্যমে জামিন নেওয়ার ঘটনায় ওই ব্যক্তি, সংশ্লিষ্ট আইনজীবী, আদালতের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী বা অন্য কেউ জড়িত কি না, তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২ আগস্ট আদালত অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করতে খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশের পর ৬ আগস্ট ফিরোজ আলম শাওনকে প্রধান আসামি এবং আইনজীবী সরদার শাহজাহান আলীকে দ্বিতীয় আসামি করে সদর থানায় মামলা করা হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদর থানার এসআই মেহেদী হাসান খান বলেন, একটি সিআর মামলায় মূল আসামির পরিবর্তে অন্য একজনকে আদালতে হাজির করে জামিন নেওয়ার অভিযোগে কোর্ট পিটিশনের মাধ্যমে মামলাটি করা হয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, মামলার মূল আসামি ফিরোজ আলম শাওন দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ কোরিয়ায় বসবাস করছেন। দেশে থাকা অবস্থায় একটি মারামারির ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। পরে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ায় চলে যান। এরপর মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে তাঁর পরিবর্তে অন্য একজনকে আদালতে হাজির করে জামিন নেওয়া হয়েছে বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।

এখন পুলিশের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকা শাওনের পরিবর্তে কে আদালতে হাজির হয়ে তার পরিচয় দিয়েছিলেন এবং তাকে আদালতে হাজির করার প্রক্রিয়ায় আর কারা যুক্ত ছিলেন। আদালতের নথিতে ওই ব্যক্তির পরিচয় কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

/এমআর/