টেন্ডার না পেয়ে যুবদল নেতার হুমকি, ভয়ে কর্মস্থলে যাচ্ছেন না স্বাস্থ্য কর্মকর্তা

পাবনা প্রতিনিধি
পাবনা প্রতিনিধি
টেন্ডার না পেয়ে যুবদল নেতার হুমকি, ভয়ে কর্মস্থলে যাচ্ছেন না স্বাস্থ্য কর্মকর্তা
অভিযুক্ত সুজানগর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক সিদ্দিকুর রহমান পিন্টু

পাবনার সুজানগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুপ্রভা রাণীকে টেন্ডার বাতিলের জন্য চাপ ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক সিদ্দিকুর রহমান পিন্টুর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন দাবি করে আপাতত কর্মস্থলে যাওয়া বন্ধ রেখেছেন ওই চিকিৎসক।

গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দুপুরে সুজানগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ওই যুবদল নেতার দাবি, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে এবং সে বিষয়ে কথা বলতেই তারা সেখানে গিয়েছিলেন। ওই স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে কোনো হুমকি দেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সুপ্রভা রাণী জানান, গত ১০ সেপ্টেম্বর ই-জিপি প্রক্রিয়ায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এমএসআর খাতের ৬টি প্যাকেজে ৮০ লাখ ৭৬ হাজার টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরামর্শ ও ই-জিপি নীতিমালা মেনে অনলাইনে মূল্যায়নের পর গত ২ নভেম্বর চারটি প্রতিষ্ঠান কাজ পায়। কিন্তু স্থানীয় কিছু নেতা শর্ত কঠিন হয়েছে দাবি করে দরপত্র বাতিলের চাপ দিতে শুরু করেন।

তিনি আরও জানান, গত মঙ্গলবার কনফারেন্স রুমে মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকা অবস্থায় হঠাৎ সিদ্দিকুর রহমান পিন্টুর নেতৃত্বে আট-দশজনের একটি দল তার দাপ্তরিক কক্ষের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে এবং সিসি ক্যামেরা ঘুরিয়ে দেয়। পরে ভেতরে ঢুকে কক্ষের ছিটকিনি লাগিয়ে টেন্ডার বাতিলের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়।

ডা. সুপ্রভা রাণী অভিযোগ বলেন, ‘আমাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে রি-টেন্ডার করার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল। আমি রাজি না হওয়ায় তারা আমাকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখান এবং অফিসের বাইরে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। বর্তমানে আমি চরম নিরাপত্তাহীনতায় আছি। তাই আপাতত অফিসে যাচ্ছি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘মৌখিকভাবে স্থানীয় প্রশাসনকে বিষয়টি জানানোর পাশাপাশি সিভিল সার্জন বরাবর লিখিত অভিযোগ দেবো।’

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. ওয়াসিম খান বলেন, ‘যারা টেন্ডার পাননি, তারা ম্যাডামকে নানা বিষয় জিজ্ঞাসা করছিলেন ও চিৎকার-চেঁচামেচি করছিলেন। আমি ম্যাডামের কক্ষে এসে দেখি সিসি ক্যামেরা উল্টানো। কিছু উচ্ছৃঙ্খল ছেলে এটি করে থাকতে পারে। পরে আমি থানায় খবর দিলে পুলিশ কর্মকর্তা আসেন।’

টেন্ডার প্রক্রিয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য হলেও প্রক্রিয়ার বিস্তারিত আমাকে জানানো হয়নি। যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত ছিল। কিন্তু হাসপাতালে এভাবে চিৎকার-চেঁচামেচি করা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়।’

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত সুজানগর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক সিদ্দিকুর রহমান পিন্টু। তিনি বলেন, ‘টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি করা হয়েছে। বৈধ ঠিকাদারি লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় কাউকে কাজ না দিয়ে গোপনীয়ভাবে অন্য জেলা (ঝিনাইদহ) থেকে লোক এনে কমিটি করা হয়েছে এবং বিশেষ শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তার যোগসাজশে তার স্বামীর মাধ্যমে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে অনৈতিক সুবিধা দিতেই এসব করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা শুধু নিয়মের কথা বলতে গিয়েছিলাম। তাকে কোনো হুমকি দেওয়া হয়নি। ওসি সাহেবও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। নিজের দুর্নীতি ঢাকতেই ওই কর্মকর্তা এখন মিথ্যা অভিযোগ তুলছেন।’

এসব বিষয়ে পাবনার সিভিল সার্জন আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘সুজানগরে নিয়ম মেনেই টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। সম্প্রতি টেন্ডার না পেলে প্রায় প্রতিটি দপ্তরেই এ ধরনের হেনস্তা বা হয়রানিমূলক আচরণ করা হচ্ছে। এর আগে আমি নিজেও এ ধরনের হেনস্তার শিকার হয়েছি। এগুলো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

সুজানগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাফফর হোসেন বলেন, ঘটনার দিন হাসপাতাল থেকে ফোন পেয়ে তিনি সেখানে যান। কয়েকজনকে দেখতে পেলেও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ করে রাখার বিষয়ে তিনি কোনো অভিযোগ পাননি। পরে নামাজ পড়তে যাওয়ার পর স্বাস্থ্য কর্মকর্তা চলে গেছেন বলে জানতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, ওই ঘটনায় এখনো লিখিত বা মৌখিক কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

/এফআর/