হকার-মাদকসেবীর দখলে ওভারব্রিজ, ভোগান্তি পথচারীর


হকার-মাদকসেবীর দখলে ওভারব্রিজ,  ভোগান্তি পথচারীর
বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনের ওভারব্রিজের ওপরে চলাচলের জায়গা দখল করে দোকান বসিয়েছে হকাররা। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

কোনোটির ওপর ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। কোনোটির চলার পথ দখল করে নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে দোকান নিয়ে বসেছে হকাররা। কোনোটি ভাঙাচোরা। কোনো কোনো সেতুর ওপর চলে মাদকসেবন। এসব কারণে অনেক পথচারীই সেতু দিয়ে চলাচলের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সড়ক পারপার হচ্ছেন। কেউ কেউ আবার নিরুপায় হয়ে এসব সেতুর ওপর দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন।

সম্প্রতি মিরপুর, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, নিউমার্কেট, বায়তুল মোকাররম মসজিদ, গুলিস্তান ও পুরান ঢাকার জজ কোর্ট এলাকার ফুট ওভারব্রিজগুলোর এমন চিত্র দেখা গেছে। এসব এলাকার অধিকাংশ সেতুই চলাচলের অনুপযোগী। অথচ যানজট এড়াতে এবং পথচারীদের নিরাপদে সড়ক পারাপারের জন্য এসব সেতু নির্মাণ করা হয়েছিল।

এসব এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেতু এলাকায় সন্ধ্যার পর পরিবেশ আরও খারাপ হয়ে যায়। ওই সময় সেতুগুলোতে ভবঘুরে ও মাদকসেবীরা ভিড় করে। অনেক সময় ছিনতাই ও নারীদের উত্ত্যক্ত করার ঘটনাও ঘটে।

গত ৭ সেপ্টেম্বর দুপুরে রাজধানীর মৎস্যভবন ও রমনা পার্কের সামনের সড়কের ওপর নির্মিত ওভারব্রিজে কয়েকজন ভবঘুরে ও মাদকসেবীকে আড্ডা দিতে দেখা যায়। এই সময় ওই সেতু দিয়ে যাচ্ছিলেন এক পথচারী। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মাঝেমধ্যে এই সেতু দিয়ে চলাচল করি। তবে ভয় হয়। কারণ সেতুর ওপর মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীরা ঘোরাফেরা করে।’

৮ সেপ্টেম্বর বিকাল ৪.৫৫ মিনিটে বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে সামনের ওভারব্রিজে গিয়ে দেখা যায়, সেতুর ওপর বেশ কিছু দোকান বসিয়েছেন হকাররা। এছাড়া সেখানে পান-সিগারেট ও টুথব্রাশ বিক্রি করতে দেখা যায় অনেককে।

ওই সেতুর ওপরই ফলের দোকান নিয়ে বসেছেন এক ব্যবসায়ী। তিনি বলেন,‘মাঝেমধ্যে সিটি করপোরেশন অভিযানে আসলে আমরা চলে যাই। আবার তারা চলে গেলে দোকান চালাই।’

৯ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ১১টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, বংশাল ওভারব্রিজের ওপরের চারটি বৈদ্যুতিক বাতি রয়েছে। কিন্তু এগুলোর একটিও জ্বলছে না। পুরো সেতু অন্ধকারাচ্ছন্ন। এই সময় একজন পথচারী সেতু পার হচ্ছিলেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, দিনের বেলা চলাচল করতে পারলেও রাতে কষ্ট হয়। অতি দ্রুত বৈদ্যুতিক বাতি লাগিয়ে রাতের বেলা সেতুটি পথচারীদের চলাচলের উপযোগী করা উচিত।

১১ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২ টায় গিয়ে দেখা যায়, নিউমার্কেটের সামনের ওভারব্রিজের ওপর অনেকগুলো দোকান নিয়ে বসেছেন হকাররা। সেতুর ওপরের অর্ধেকের বেশি জায়গা দখল করে দোকানগুলো বসানো হয়েছে। ফলে চলাচলের পথ সরু হয়ে যাওয়ায় পথচারীরা ভোগান্তি পোহাচ্ছে।
এই সেতু দিয়ে নিয়মিত চলাচল করেন তানজীলা খাতুন। তিনি বলেন, সেতুতে ওঠার সময় তেমন কষ্ট না হলেও নামার জায়গা ও ওপরে হকাররা দোকান নিয়ে বসেছে। এক কথায় বলা যায়, এটা একটা বাজারের মতো হয়ে গেছে।

রাজধানীর জনসন রোডে জজ কোর্টের সামনের ওভারব্রিজে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
রাজধানীর জনসন রোডে জজ কোর্টের সামনের ওভারব্রিজে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর জনসন রোডের জজ কোর্টের সামনের ওভারব্রিজে গিয়ে দেখা যায়, সেতুর ওপরে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। সেতু দিয়ে চলাচলের পরিবেশ নেই। এ কারণে পথচারীরা ঝুঁকি নিয়ে সেতুর নিচ দিয়ে সড়ক পারাপার হচ্ছে।

এই সময় ওই সেতুর নিচ দিয়ে সিরাজুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি তার মেয়েকে নিয়ে সড়ক পার হচ্ছিলেন। তিনি বলেন, সেতুতে ভবঘুরে ও মাদকসেবীরা আড্ডা দেয়। ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকে। এই কারণে ওই সেতু দিয়ে বাচ্চাদের নিয়ে চলাচলের পরিবেশ নেই।

১৬ সেপ্টেম্বর রাত ১১ টা ২০ মিনিট। জজ কোর্টের সামনের ওই ওভারব্রিজের ওপর ঘুটঘুটে অন্ধকার। সেখানে ১০ থেকে ১২ জন শুয়ে আছে। বোঝার উপায় নেই তারা কি করছে। এখানে মাদকসেবন ও আসামাজিক কার্যকলাপ হয়ে বলে জানালেন স্থানীয় বাসিন্দা মেহেদী হাসান।

রাজধানীর জনসন রোডে জজ কোর্টের সামনের ওভারব্রিজের নিচ দিয়ে চলাচল করছে মানুষ। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
রাজধানীর জনসন রোডে জজ কোর্টের সামনের ওভারব্রিজের নিচ দিয়ে চলাচল করছে মানুষ। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় ভোগান্তি

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, কেবল সেতু তৈরি করলেই সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। নিয়মিত তদারকি, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা এবং নিরাপত্তাকর্মী না থাকায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সেতুগুলো সাধারণ মানুষের কোনো কাজে আসছে না।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে সেতুতে অভিযান চালিয়ে অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করা হলেও অভিযান হলেও কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেতুগুলো আবার আগের চেহারায় ফিরে যায়।

ডিএসসিসির বক্তব্য

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশেনের (ডিএসসিসি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেল রাজিব খাদেম সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘ওভারব্রিজগুলোতে সমস্যা আছে। কথাটা একেবারেই অযৌক্তিক না। কিছু যুক্তিযুক্তই। সেতুর ওপর ও নিচের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে প্রায়ই আমরা অভিযান পরিচালনা করি। অভিযান চালিয়ে আসার পরই হকাররা আবার বইসা যায়। কিন্তু আমাদের সারাক্ষণ দেখার জনবল নেই। সেজন্য পুলিশেরও কিছু দায়িত্ব আছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ওভারব্রিজ এলাকায় সিসিটিভির আওতায় আনা যায়।

তিনি আরও বলেন, ‘যেসব ওভারব্রিজ ভাঙাচোরা সেগুলো আমরা মেরামত করতেছি। আমরা প্রতিনিয়ত মেরামত করি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুল আলম সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনের ওভারব্রিজের উপরের দোকান উচ্ছেদে আমরা প্রতিদিনই কাজ করি। শুধু উচ্ছেদ নয়, সেখানে ভবঘুরে ও হকারদের আমি নিজে গিয়ে সরিয়ে দিই । পরে আবার শুনি ওরা চলে আসে। আসলে এখানে সাধারন জনগণেরও সচেতন হওয়া দরকার। সবার সম্মিলিত চেষ্টায় কাজগুলো সহজ হয়।’

/বিবি/