শিরোনাম

বৃক্ষমেলার নামে দোকানের পসরা, কার পকেটে যাচ্ছে লাখ টাকা

শেখ শাহরিয়ার হোসেন
শেখ শাহরিয়ার হোসেন
বৃক্ষমেলার নামে দোকানের পসরা, কার পকেটে যাচ্ছে লাখ টাকা
মেলায় খেলনা ও বাহারি পণ্যে সাজানো দোকান। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

পুরান ঢাকার মানুষের হাঁটা, বসা ও একটু স্বস্তির জায়গা বাহাদুর শাহ পার্ক। সেই পার্কের ভেতরেই এখন সারি সারি দোকান। বাঁশ দিয়ে গাছ ঘিরে বানানো হয়েছে অস্থায়ী কাঠামো, মাথার ওপর ত্রিপল। কোথাও বিক্রি হচ্ছে থালাবাসন, কোথাও খেলনা, কৃত্রিম ফুল, গয়না ও চুড়ি। খাবারের দোকানে কাবাব, পানিপুরি, আইসক্রিম ও মিষ্টির পসরা। আছে জামাকাপড় ও শাড়ির দোকানও। শিশুদের খেলনার পাশাপাশি কিশোরদের জন্য বসানো হয়েছে বক্সিং মেশিন।

মেলার নাম দেওয়া হয়েছে ‘সবুজ আনন্দ মেলা ২০২৬’। আয়োজনের মূল অনুমতি ছিল বৃক্ষমেলার জন্য। তবে শনিবার সরেজমিন বৃক্ষ বা গাছসংক্রান্ত পাঁচটি দোকান ছাড়া সেই মেলার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কার্যক্রম খুব একটা চোখে পড়েনি। বরং ঐতিহাসিক পার্কের বড় একটি অংশ পরিণত হয়েছে অস্থায়ী বাজারে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) সূত্রে জানা গেছে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাদের ৬ থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত ১০ দিনের জন্য বাহাদুর শাহ পার্কে মেলা আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সবুজ আনন্দ মেলা কমিটির নেতাদের দেওয়া অনুমতির ভিত্তিতেই পার্কের ভেতরে দোকান বসানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

বৃক্ষমেলার নামে দোকানের পসরা
গৃহস্থালী পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন দোকানী। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

এদিকে মেলায় দোকান বসানো নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে ভাড়া আদায়কে কেন্দ্র করে। একাধিক দোকানির সঙ্গে কথা বলে ও মেলার আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিটি দোকানের জন্য প্রতিদিন তিন হাজার টাকা করে ভাড়া দিতে হচ্ছে।

বর্তমানে ৩০টি দোকান থাকলে প্রতিদিন ভাড়া আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় লাখ টাকা। একই সংখ্যক দোকান ১০ দিন থাকলে সেই অঙ্ক দাঁড়ায় ৯ লাখ টাকা। আর অনুমোদিত ৬০টি দোকানই বসানো হলে ১০ দিনে ভাড়া আদায়ের পরিমাণ হতে পারে ১৮ লাখ টাকা।

এ বিষয়ে মেলা আয়োজনের দায়িত্বে থাকা রনি ব্যাপারী সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, একটি মেলা জমজমাট করতে শুধু কয়েকটি নির্দিষ্ট আয়োজন যথেষ্ট নয়। মেলায় খাবারের দোকানসহ বিভিন্ন ধরনের বিনোদনের ব্যবস্থা থাকলে দর্শনার্থীদের আগ্রহ বাড়ে। মেলায় দোকান বসানোর জন্য শুরুতে একটি নির্দিষ্ট ভাড়া নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে দোকানদারদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ অনেক সময় কমে আসে। তিনি বলেন, দোকানের জন্য ৩ হাজার টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হলেও পরে বিক্রিবাট্টা, আবহাওয়া ও অন্যান্য পরিস্থিতি বিবেচনায় তা কমে যায়।

কোন প্রক্রিয়ায় দোকানপ্রতি তিন হাজার টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে, ভাড়ার টাকা কোথায় যাচ্ছে এবং এর সঙ্গে সিটি করপোরেশনের অনুমোদনের শর্তের কোনো সম্পর্ক আছে কি না—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি।

জানতে চাইলে ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বৃক্ষমেলা আয়োজনের জন্য জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাদের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সূত্রে জানা গেছে, ছাত্রদলের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক তামজিদ ইমাম অর্নব ও ছাত্রদল প্যানেল থেকে নির্বাচিত জকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য সাদমান সাম্য মেলার অনুমতি নিয়েছেন। তবে মেলার সঙ্গে জবি ছাত্রদলের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে জানিয়েছেন মেলা কমিটির নেতারা। তাদের দাবি, এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে আয়োজিত হচ্ছে।

এ বিষয়ে সবুজ আনন্দ মেলা কমিটির সদস্য সচিব ও জকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য সাদমান সাম্য সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘আমরা সিটি কর্পোরেশন থেকে মূলত বৃক্ষরোপণ মেলার জন্য অনুমতি নিয়ে এসেছি, কারণ আমাদের পরিকল্পনা ছিল যে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করব। তবে সেখানে অন্য যে দোকানপাট বা লেনদেনের বিষয়ে কথা উঠছে, সে সম্পর্কে আমি অবগত নই। এসব বিষয়ে সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গেও আমাদের কথা হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেট আগামীকাল এসে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করবেন এবং যে বা যারা এটা করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেখানে যে কয়েকটি বৃক্ষের দোকান আসার কথা ছিল, তা ক্যাম্পাসের ঝামেলার কারণে এখনও এসে পৌঁছাতে পারেনি। এছাড়া, পুরো বিষয়টি কোনো ছাত্রদলের রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে নয়, বরং অর্ণব ভাই ও আমার একটি ব্যক্তিগত উদ্যোগ।’

বৃক্ষমেলার নামে দোকানের পসরা 2
বৃক্ষমেলায় দর্শনার্থীদের জন্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে নানা জাতের চারা। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

সরেজমিন দেখা যায়, পার্কের ভেতরের বিভিন্ন অংশে বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে তৈরি দোকানের সারি রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে বৃক্ষমেলার অনুমতিকে ভিত্তি করে এত বৈচিত্র্যের বাণিজ্যিক দোকান বসানোর অনুমতি কীভাবে কার্যকর হলো।

বাহাদুর শাহ পার্ক পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মানুষের অন্যতম উন্মুক্ত স্থান। নিয়মিত পার্কে হাঁটতে আসা শাহনাজ জাহান বলেন, পুরান ঢাকায় এমনিতেই খোলা জায়গা খুব কম। এই পার্কটুকু মানুষ হাঁটা, বসা ও বিশ্রামের জন্য ব্যবহার করেন। সেখানে বাঁশ গেড়ে বাজার বসালে সাধারণ মানুষের জায়গা কমে যায়। ঐতিহাসিক এই পার্কের সৌন্দর্যও বিনষ্ট হয়।

তিনি আরও বলেন, ১০ দিনের জন্য একজনকে অনুমতি দেওয়ার পর যদি নিয়মিতভাবে বিভিন্ন আয়োজনের নামে পার্ক ব্যবহার করা শুরু হয়, তাহলে পার্কের চরিত্রই বদলে যাবে।

বাহাদুর শাহ পার্ককে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের ঘটনা নতুন নয়। এর আগে ডিএসসিসি পার্কের জায়গা ইজারা দিয়ে খাবারের দোকান চালুর সুযোগ দিয়েছিল। এ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন সংগঠন প্রতিবাদ ও মানববন্ধন করে। এরপর সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত সেই ইজারা বহাল রাখা হয়নি। পার্ক থেকেও খাবারের দোকান সরিয়ে দেওয়া হয়।

ঐতিহাসিক এই পার্ককে বাণিজ্যিক ব্যবহারের বাইরে রাখার বিষয়ে সিটি করপোরেশন তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছিলো। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানেই একই পার্কে আবার দোকানের সারি। এবার খাবারের দোকানের বদলে আয়োজনের নাম ‘বৃক্ষমেলা’। অর্থাৎ নাম বদলেছে, কিন্তু পার্কের ভেতরে বাণিজ্যিক ব্যবহারের প্রবণতা বদলায়নি এমন প্রশ্নই সামনে এসেছে।

এ বিষয়ে ঐতিহাসিক বাহাদুর শাহ পার্ক ও পার্কের ঐতিহ্য সংরক্ষণ সংগ্রাম পরিষদের সদস্য সচিব আখতারুজ্জামান খান সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘পুরান ঢাকার মানুষ ও শিক্ষার্থীদের জন্য বাহাদুর শাহ পার্কের জায়গাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ৩০-৩২টি দোকান বসিয়ে পুরো এলাকাকে গিজগিজে অবস্থায় পরিণত করা হয়েছে। আমরা এর প্রতিবাদ জানিয়ে গত ৪ আগস্ট সিটি করপোরেশন ও প্রশাসনকে স্মারকলিপি দিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আওয়ামী লীগ আগে যেটা করেছে বিএনপিও একই কাজ করছে। এটি অত্যন্ত নিন্দনীয়।’

/এমআর/