জৌলুস হারাচ্ছে ইতিহাসের সাক্ষী ঢাকার প্রথম পাঠাগার

জৌলুস হারাচ্ছে ইতিহাসের সাক্ষী ঢাকার প্রথম পাঠাগার
জবি প্রতিনিধি

পুরান ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের ভিড়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। দেয়ালে সময়ের ক্ষতচিহ্ন, ধুলোমাখা বই আর পাঠকশূন্য কক্ষ যেন জানান দিচ্ছে এক হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যের গল্প। অথচ একসময় এখানেই জড়ো হতেন কবি, সাহিত্যিক, গবেষক ও জ্ঞানপিপাসু মানুষ। ঢাকার প্রথম পাঠাগার হিসেবে পরিচিত ১৫৫ বছরের পুরোনো ‘রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরি’ আজ অস্তিত্ব সংকটের মুখে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন পুরান ঢাকার লয়াল স্ট্রিটে অবস্থিত এই পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৯ সালে। পূর্ববঙ্গ ব্রাহ্মসমাজের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক অভয়চন্দ্র দাশ ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে নিজস্ব ভবনে এর কার্যক্রম শুরু হয়।
শুধু একটি পাঠাগার নয়, বাংলার নবজাগরণ, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল প্রতিষ্ঠানটি। ১৯২৬ সালে ঢাকা সফরে এসে এখানে বক্তব্য দেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, গিরিশচন্দ্র সেন, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কবি বুদ্ধদেব বসু, কাজী মোতাহার হোসেন, কবীর চৌধুরী, সুফিয়া কামাল ও শামসুর রাহমানের মতো মনীষীদের পদচারণায় মুখর ছিল পাঠাগারটি।
কবি জীবনানন্দ দাশের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এ পাঠাগারের স্মৃতি। ১৯৩০ সালে এখানেই লাবণ্য গুপ্তের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। জীবনানন্দের মা কবি কুসুমকুমারী দাশও এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
জানা যায়, একসময় এই পাঠাগারে ৩০ হাজারেরও বেশি বই, সাময়িকী ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের সংগ্রহ ছিল। প্রায় সব ধরনের বইয়ের পাশাপাশি বিশেষভাবে সংরক্ষিত ছিল ব্রাহ্ম সমাজ সম্পর্কিত বহু মূল্যবান গ্রন্থ। এখানে ছিল রাজা রামমোহন রায়ের রচনার প্রথম সংস্করণ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দুর্লভ গ্রন্থ, গিরিশচন্দ্র সেন অনূদিত কোরআনের প্রথম বাংলা সংস্করণ, পুরোনো সংবাদপত্রের পূর্ণাঙ্গ সংগ্রহ এবং স্বাধীনতার পূর্ববর্তী কয়েক দশকের সরকারি গেজেট।
প্রতিষ্ঠার পরবর্তী কয়েক দশকজুড়ে শত শত মানুষ নিয়মিত এই পাঠাগারে বই পড়তে, আলোচনা করতে এবং জ্ঞানচর্চায় অংশ নিতে আসতেন। ব্রাহ্ম সমাজের অঙ্গন ছিল তৎকালীন ঢাকার অন্যতম বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
তবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় এই ঐতিহ্যবাহী পাঠাগার বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ভবনটিতে ক্যাম্প স্থাপন করে। সে সময় বহু মূল্যবান বই, সাময়িকী ও নথিপত্র লুট হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর হারিয়ে যাওয়া সংগ্রহ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা হলেও অধিকাংশ বই আর ফিরে পাওয়া যায়নি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে পাঠাগারের মূল ভবন। প্রথমে পাঠাগারটি নিজস্ব ভবনের দ্বিতীয় তলায় পরিচালিত হতো। কিন্তু ভবনের দেয়ালে জন্ম নেয় একটি বিশাল বটগাছ, যার শিকড় ও বিস্তৃতি ভবনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করে। ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়লে পাঠাগারটি বর্তমানে ব্রাহ্ম মন্দির ভবনের দ্বিতীয় তলায় স্থানান্তর করা হয়েছে।
একসময় জ্ঞানের ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত এই পাঠাগার এখন প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। যেখানে একসময় হাজার হাজার বই ছিল, সেখানে বর্তমানে বইয়ের সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০টির মধ্যে। নড়বড়ে কাঠের তাক, পুরোনো বই এবং সীমিত পরিসরের সংগ্রহ যেন অতীতের গৌরবের শেষ স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গবেষণা বা বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া খুব কম মানুষই এখন এখানে আসেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া ইসলাম বলেন, ‘ঢাকার প্রথম পাঠাগার সম্পর্কে জানতে পেরে আমি বিস্মিত হয়েছি। এত সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহনকারী একটি প্রতিষ্ঠান আজ অবহেলায় হারিয়ে যাওয়ার পথে, যা আমাদের জন্য দুঃখজনক। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল, বই ও স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ করা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষারও অংশ। যথাযথ সংস্কার ও সংরক্ষণের মাধ্যমে এই পাঠাগারকে আবারও গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলা উচিত।’
বাংলাদেশ ব্রাহ্ম সমাজের সাধারণ সম্পাদক রণবীর পাল রবি সিজেডএন২৪ ডটকমকে বলেন, ‘এটি শুধু একটি লাইব্রেরি নয়, ঢাকার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ। বহু দুর্লভ সংগ্রহ আমরা হারিয়েছি। তারপরও যা আছে, তা সংরক্ষণ করা জরুরি। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আমাদের হারিয়ে যাওয়া বই ও নথি খুঁজে পেতে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিলো তবে কেউ কিছু জমা দেয়নি। ভবন সংস্কার এবং সংগ্রহ সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে, কিন্তু এখনও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানেন না যে ঢাকার প্রথম পাঠাগার এখনো টিকে আছে। গবেষক, শিক্ষার্থী ও পাঠকদের অংশগ্রহণ বাড়লে এবং প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া গেলে পাঠাগারটি আবারও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।’

পুরান ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের ভিড়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। দেয়ালে সময়ের ক্ষতচিহ্ন, ধুলোমাখা বই আর পাঠকশূন্য কক্ষ যেন জানান দিচ্ছে এক হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যের গল্প। অথচ একসময় এখানেই জড়ো হতেন কবি, সাহিত্যিক, গবেষক ও জ্ঞানপিপাসু মানুষ। ঢাকার প্রথম পাঠাগার হিসেবে পরিচিত ১৫৫ বছরের পুরোনো ‘রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরি’ আজ অস্তিত্ব সংকটের মুখে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন পুরান ঢাকার লয়াল স্ট্রিটে অবস্থিত এই পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৯ সালে। পূর্ববঙ্গ ব্রাহ্মসমাজের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক অভয়চন্দ্র দাশ ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে নিজস্ব ভবনে এর কার্যক্রম শুরু হয়।
শুধু একটি পাঠাগার নয়, বাংলার নবজাগরণ, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল প্রতিষ্ঠানটি। ১৯২৬ সালে ঢাকা সফরে এসে এখানে বক্তব্য দেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, গিরিশচন্দ্র সেন, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কবি বুদ্ধদেব বসু, কাজী মোতাহার হোসেন, কবীর চৌধুরী, সুফিয়া কামাল ও শামসুর রাহমানের মতো মনীষীদের পদচারণায় মুখর ছিল পাঠাগারটি।
কবি জীবনানন্দ দাশের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এ পাঠাগারের স্মৃতি। ১৯৩০ সালে এখানেই লাবণ্য গুপ্তের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। জীবনানন্দের মা কবি কুসুমকুমারী দাশও এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
জানা যায়, একসময় এই পাঠাগারে ৩০ হাজারেরও বেশি বই, সাময়িকী ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের সংগ্রহ ছিল। প্রায় সব ধরনের বইয়ের পাশাপাশি বিশেষভাবে সংরক্ষিত ছিল ব্রাহ্ম সমাজ সম্পর্কিত বহু মূল্যবান গ্রন্থ। এখানে ছিল রাজা রামমোহন রায়ের রচনার প্রথম সংস্করণ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দুর্লভ গ্রন্থ, গিরিশচন্দ্র সেন অনূদিত কোরআনের প্রথম বাংলা সংস্করণ, পুরোনো সংবাদপত্রের পূর্ণাঙ্গ সংগ্রহ এবং স্বাধীনতার পূর্ববর্তী কয়েক দশকের সরকারি গেজেট।
প্রতিষ্ঠার পরবর্তী কয়েক দশকজুড়ে শত শত মানুষ নিয়মিত এই পাঠাগারে বই পড়তে, আলোচনা করতে এবং জ্ঞানচর্চায় অংশ নিতে আসতেন। ব্রাহ্ম সমাজের অঙ্গন ছিল তৎকালীন ঢাকার অন্যতম বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
তবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় এই ঐতিহ্যবাহী পাঠাগার বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ভবনটিতে ক্যাম্প স্থাপন করে। সে সময় বহু মূল্যবান বই, সাময়িকী ও নথিপত্র লুট হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর হারিয়ে যাওয়া সংগ্রহ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা হলেও অধিকাংশ বই আর ফিরে পাওয়া যায়নি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে পাঠাগারের মূল ভবন। প্রথমে পাঠাগারটি নিজস্ব ভবনের দ্বিতীয় তলায় পরিচালিত হতো। কিন্তু ভবনের দেয়ালে জন্ম নেয় একটি বিশাল বটগাছ, যার শিকড় ও বিস্তৃতি ভবনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করে। ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়লে পাঠাগারটি বর্তমানে ব্রাহ্ম মন্দির ভবনের দ্বিতীয় তলায় স্থানান্তর করা হয়েছে।
একসময় জ্ঞানের ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত এই পাঠাগার এখন প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। যেখানে একসময় হাজার হাজার বই ছিল, সেখানে বর্তমানে বইয়ের সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০টির মধ্যে। নড়বড়ে কাঠের তাক, পুরোনো বই এবং সীমিত পরিসরের সংগ্রহ যেন অতীতের গৌরবের শেষ স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গবেষণা বা বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া খুব কম মানুষই এখন এখানে আসেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া ইসলাম বলেন, ‘ঢাকার প্রথম পাঠাগার সম্পর্কে জানতে পেরে আমি বিস্মিত হয়েছি। এত সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহনকারী একটি প্রতিষ্ঠান আজ অবহেলায় হারিয়ে যাওয়ার পথে, যা আমাদের জন্য দুঃখজনক। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল, বই ও স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ করা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষারও অংশ। যথাযথ সংস্কার ও সংরক্ষণের মাধ্যমে এই পাঠাগারকে আবারও গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলা উচিত।’
বাংলাদেশ ব্রাহ্ম সমাজের সাধারণ সম্পাদক রণবীর পাল রবি সিজেডএন২৪ ডটকমকে বলেন, ‘এটি শুধু একটি লাইব্রেরি নয়, ঢাকার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ। বহু দুর্লভ সংগ্রহ আমরা হারিয়েছি। তারপরও যা আছে, তা সংরক্ষণ করা জরুরি। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আমাদের হারিয়ে যাওয়া বই ও নথি খুঁজে পেতে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিলো তবে কেউ কিছু জমা দেয়নি। ভবন সংস্কার এবং সংগ্রহ সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে, কিন্তু এখনও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানেন না যে ঢাকার প্রথম পাঠাগার এখনো টিকে আছে। গবেষক, শিক্ষার্থী ও পাঠকদের অংশগ্রহণ বাড়লে এবং প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া গেলে পাঠাগারটি আবারও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।’

জৌলুস হারাচ্ছে ইতিহাসের সাক্ষী ঢাকার প্রথম পাঠাগার
জবি প্রতিনিধি

পুরান ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের ভিড়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। দেয়ালে সময়ের ক্ষতচিহ্ন, ধুলোমাখা বই আর পাঠকশূন্য কক্ষ যেন জানান দিচ্ছে এক হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যের গল্প। অথচ একসময় এখানেই জড়ো হতেন কবি, সাহিত্যিক, গবেষক ও জ্ঞানপিপাসু মানুষ। ঢাকার প্রথম পাঠাগার হিসেবে পরিচিত ১৫৫ বছরের পুরোনো ‘রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরি’ আজ অস্তিত্ব সংকটের মুখে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন পুরান ঢাকার লয়াল স্ট্রিটে অবস্থিত এই পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৯ সালে। পূর্ববঙ্গ ব্রাহ্মসমাজের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক অভয়চন্দ্র দাশ ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে নিজস্ব ভবনে এর কার্যক্রম শুরু হয়।
শুধু একটি পাঠাগার নয়, বাংলার নবজাগরণ, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল প্রতিষ্ঠানটি। ১৯২৬ সালে ঢাকা সফরে এসে এখানে বক্তব্য দেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, গিরিশচন্দ্র সেন, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কবি বুদ্ধদেব বসু, কাজী মোতাহার হোসেন, কবীর চৌধুরী, সুফিয়া কামাল ও শামসুর রাহমানের মতো মনীষীদের পদচারণায় মুখর ছিল পাঠাগারটি।
কবি জীবনানন্দ দাশের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এ পাঠাগারের স্মৃতি। ১৯৩০ সালে এখানেই লাবণ্য গুপ্তের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। জীবনানন্দের মা কবি কুসুমকুমারী দাশও এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
জানা যায়, একসময় এই পাঠাগারে ৩০ হাজারেরও বেশি বই, সাময়িকী ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের সংগ্রহ ছিল। প্রায় সব ধরনের বইয়ের পাশাপাশি বিশেষভাবে সংরক্ষিত ছিল ব্রাহ্ম সমাজ সম্পর্কিত বহু মূল্যবান গ্রন্থ। এখানে ছিল রাজা রামমোহন রায়ের রচনার প্রথম সংস্করণ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দুর্লভ গ্রন্থ, গিরিশচন্দ্র সেন অনূদিত কোরআনের প্রথম বাংলা সংস্করণ, পুরোনো সংবাদপত্রের পূর্ণাঙ্গ সংগ্রহ এবং স্বাধীনতার পূর্ববর্তী কয়েক দশকের সরকারি গেজেট।
প্রতিষ্ঠার পরবর্তী কয়েক দশকজুড়ে শত শত মানুষ নিয়মিত এই পাঠাগারে বই পড়তে, আলোচনা করতে এবং জ্ঞানচর্চায় অংশ নিতে আসতেন। ব্রাহ্ম সমাজের অঙ্গন ছিল তৎকালীন ঢাকার অন্যতম বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
তবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় এই ঐতিহ্যবাহী পাঠাগার বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ভবনটিতে ক্যাম্প স্থাপন করে। সে সময় বহু মূল্যবান বই, সাময়িকী ও নথিপত্র লুট হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর হারিয়ে যাওয়া সংগ্রহ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা হলেও অধিকাংশ বই আর ফিরে পাওয়া যায়নি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে পাঠাগারের মূল ভবন। প্রথমে পাঠাগারটি নিজস্ব ভবনের দ্বিতীয় তলায় পরিচালিত হতো। কিন্তু ভবনের দেয়ালে জন্ম নেয় একটি বিশাল বটগাছ, যার শিকড় ও বিস্তৃতি ভবনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করে। ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়লে পাঠাগারটি বর্তমানে ব্রাহ্ম মন্দির ভবনের দ্বিতীয় তলায় স্থানান্তর করা হয়েছে।
একসময় জ্ঞানের ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত এই পাঠাগার এখন প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। যেখানে একসময় হাজার হাজার বই ছিল, সেখানে বর্তমানে বইয়ের সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০টির মধ্যে। নড়বড়ে কাঠের তাক, পুরোনো বই এবং সীমিত পরিসরের সংগ্রহ যেন অতীতের গৌরবের শেষ স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গবেষণা বা বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া খুব কম মানুষই এখন এখানে আসেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া ইসলাম বলেন, ‘ঢাকার প্রথম পাঠাগার সম্পর্কে জানতে পেরে আমি বিস্মিত হয়েছি। এত সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহনকারী একটি প্রতিষ্ঠান আজ অবহেলায় হারিয়ে যাওয়ার পথে, যা আমাদের জন্য দুঃখজনক। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল, বই ও স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ করা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষারও অংশ। যথাযথ সংস্কার ও সংরক্ষণের মাধ্যমে এই পাঠাগারকে আবারও গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলা উচিত।’
বাংলাদেশ ব্রাহ্ম সমাজের সাধারণ সম্পাদক রণবীর পাল রবি সিজেডএন২৪ ডটকমকে বলেন, ‘এটি শুধু একটি লাইব্রেরি নয়, ঢাকার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ। বহু দুর্লভ সংগ্রহ আমরা হারিয়েছি। তারপরও যা আছে, তা সংরক্ষণ করা জরুরি। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আমাদের হারিয়ে যাওয়া বই ও নথি খুঁজে পেতে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিলো তবে কেউ কিছু জমা দেয়নি। ভবন সংস্কার এবং সংগ্রহ সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে, কিন্তু এখনও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানেন না যে ঢাকার প্রথম পাঠাগার এখনো টিকে আছে। গবেষক, শিক্ষার্থী ও পাঠকদের অংশগ্রহণ বাড়লে এবং প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া গেলে পাঠাগারটি আবারও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।’




