আজ দুর্গোৎসবের মহাসপ্তমী

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
আজ দুর্গোৎসবের মহাসপ্তমী
দেবী দুর্গার প্রতিমা

ঢাকের বাদ্য, কাঁসরের ধ্বনি আর শঙ্খের সুরে মুখরিত হয়ে উঠেছে দুর্গাপূজার মণ্ডপগুলো। ফুল, ধূপ ও আগরবাতির সুবাসে পূজাঙ্গনে তৈরি হয়েছে এক পবিত্র আবহ। দেবী দুর্গার আগমনকে ঘিরে উলুধ্বনি ও প্রার্থনায় মেতে উঠেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। বাংলা পঞ্জিকার তিথি অনুযায়ী শনিবার (১৭ অক্টোবর) ও রবিবার (১৮ অক্টোবর) এই দুদিনজুড়ে মহাসপ্তমী উদযাপিত হচ্ছে। তিথির বিশেষ বিন্যাসের কারণে এবার মহাসপ্তমীর আনুষ্ঠানিকতা দুই দিনব্যাপী বিস্তৃত হয়েছে।

দুর্গাপূজার মহাসপ্তমীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় রীতি হলো নবপত্রিকা স্থাপন, যা সাধারণ মানুষের কাছে ‘কলাবউ’ নামে পরিচিত। এই আচার পালনের জন্য কলাগাছের সঙ্গে কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধানগাছ একত্রে বেঁধে স্নান করানো হয়। পরে নতুন শাড়ি পরিয়ে নবপত্রিকাকে পূজামণ্ডপে স্থাপন করা হয়। এই প্রথা দুর্গোৎসবের ধর্মীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি প্রকৃতি ও মানুষের পারস্পরিক নির্ভরতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।

ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, নবপত্রিকার নয়টি উদ্ভিদ দেবীর নয়টি শক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। দেবী দুর্গার প্রতিমাকে ঘিরে পূজার আয়োজন হলেও সপ্তমীর এই বিশেষ রীতিতে উদ্ভিদকেও শ্রদ্ধা ও আরাধনার অংশ করা হয়। এর মধ্য দিয়ে কৃষি, খাদ্য, ঔষধি গুণ এবং মানুষের জীবনধারণে প্রকৃতির অপরিহার্য ভূমিকার প্রতিফলন ঘটে।

এই ঐতিহ্যের তাৎপর্য কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা যদি বাস্তব জীবনেও প্রতিফলিত হয়, তবেই নবপত্রিকার শিক্ষা সার্থক হয়ে ওঠে। গাছপালা রক্ষা, নদী-খাল ও জলাশয় পরিষ্কার রাখা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার দায়িত্ব প্রতিটি মানুষের। প্রকৃতিকে সম্মান জানানোর অর্থ হলো, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করতে সচেতন ভূমিকা পালন করা।

মহাসপ্তমীর আরেকটি উল্লেখযোগ্য ধর্মীয় আয়োজন হলো দেবীর মহাস্নান। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, দর্পণে দেবীমূর্তির প্রতিবিম্ব স্থাপন করে গঙ্গাজল, দুধ, মধু ও সুগন্ধি দ্রব্যসহ বিভিন্ন উপাচারে স্নানের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। এই রীতিকে শুদ্ধতা ও পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তবে শুদ্ধতার ধারণা কেবল বাহ্যিক আচারেই পূর্ণতা পায় না; এর সঙ্গে যুক্ত থাকা প্রয়োজন মানুষের চিন্তা, বিবেক ও আচরণের পরিচ্ছন্নতা।

সমাজে অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করা, বৈষম্য সৃষ্টি, অহংকার কিংবা বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়ার মতো প্রবণতা পরিহার করাও নৈতিক দায়িত্বের অংশ। ধর্মীয় মূল্যবোধের বাস্তব প্রয়োগ তখনই অর্থবহ হয়, যখন মানুষ অসহায় ও বঞ্চিতদের পাশে দাঁড়ায়, অন্যায়ের প্রতিবাদ করে এবং সবার জন্য ন্যায়সংগত পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে।

হিন্দু পুরাণে মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবী দুর্গার বিজয় অশুভ শক্তির পরাজয় এবং শুভশক্তির প্রতিষ্ঠার প্রতীক। দেবীর দশ হাতে ধারণ করা অস্ত্রগুলো অন্যায়ের মোকাবিলা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার শক্তির প্রতীকী প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হয়। দেবী দুর্গার সঙ্গে পূজিত লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধি, বিদ্যা, সাহস এবং প্রজ্ঞার মতো মানবজীবনের গুরুত্বপূর্ণ গুণাবলিও প্রতিফলিত হয়। এই পৌরাণিক আখ্যান মানুষের মধ্যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার অনুপ্রেরণা জোগায়।

বাঙালির সাংস্কৃতিক অনুভূতিতে দুর্গাপূজার আরেকটি বিশেষ দিক হলো দেবীকে ঘিরে পারিবারিক আবেগ। লোকবিশ্বাস ও প্রচলিত সাংস্কৃতিক কল্পনায় দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন যেন পিতৃগৃহে মেয়ের ফিরে আসা। এই ভাবনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্নেহ, ভালোবাসা, মিলন ও বিচ্ছেদের অনুভূতি। তাই দুর্গোৎসব শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বাঙালির পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

/এসবি/