‘জঙ্গি’ সাজিয়ে ৭ হত্যা: হাসিনাসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে শুনানি শেষ

‘জঙ্গি’ সাজিয়ে ৭ হত্যা: হাসিনাসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে শুনানি শেষ
সিজেডএন ডেস্ক

গাজীপুরের পাতারটেকে কথিত ‘জঙ্গি অভিযান’ সাজিয়ে সাতজনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১০ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (চার্জ) গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আবেদন জানিয়েছে প্রসিকিউশন। এ বিষয়ে শুনানি শেষে আগামী ১০ আগস্ট আসামিপক্ষের শুনানির দিন নির্ধারণ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
রবিবার (২ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে এ বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে শুনানিতে অংশ নেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। তার সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ, সহিদুল ইসলাম সরদার, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, মামুনুর রশিদ ও মার্জিনা রায়হান।
শুনানিতে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশজুড়ে একই ধরনের কৌশলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক বিরোধী এবং ইসলামী মতাদর্শের অনুসারীদের দমনে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও ভয়ভীতির একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, সে সময় সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সমালোচনা করাও ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অভিযোগ তুললেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোপন বন্দিশালায় মানুষকে আটকে রাখা হতো।
গুমের শিকার পরিবারগুলোর দুর্দশার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেক স্বজনকে বাধ্য হয়ে বলতে হয়েছে—‘আমার ছেলেকে জেলে দিন, কিন্তু ক্রসফায়ারে দেবেন না।’ এরপরও অনেককে কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা সাজিয়ে হত্যা করে মরদেহ বিভিন্ন সড়ক কিংবা নদীর তীরে ফেলে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সে সময় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী-এমপি নিয়মিত ‘জঙ্গি’ ইস্যু সামনে আনতেন এবং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদে আক্রান্ত রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হতো। অথচ জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এসব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বলেও আদালতকে জানান তিনি।
পাতারটেকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রসিকিউশন জানায়, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সাতজনকে তুলে এনে বগুড়ায় পুলিশের একটি গোপন বন্দিশালায় রাখা হয়। পরে ২০১৬ সালের ৮ অক্টোবর তাদের গাজীপুরের নোয়াগাঁওয়ের পাতারটেক এলাকায় সোলায়মান সরকারের বাড়িতে নেওয়া হয়। সেখানে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের নেতৃত্বে কথিত জঙ্গিবিরোধী অভিযান পরিচালনার নামে সোয়াট সদস্যরা সাতজনকে গুলি করে হত্যা করেন। ওই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন শরতের তুফান’।
প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর নিহতদের পরিবারের সদস্যরা মরদেহ নিতে গেলে তাদের বিরুদ্ধেও তদন্তের হুমকি দেওয়া হয়। অভিযোগ করা হয়, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। ফলে ভয়ে অনেক পরিবারই মরদেহ নিতে এগিয়ে আসেননি। নিহত সাতজনের মধ্যে চারজনের পরিচয় এখনো শনাক্ত হয়নি। অপর তিনজন হলেন মো. ইবরাহীম, ফরিদুল ইসলাম আকাশ ও সাইফুর রহমান। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ইবরাহীমের বাবা এ ঘটনায় অভিযোগ দায়ের করেন।
প্রসিকিউটর আদালতে আরও বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ক্ষমতা ধরে রাখার উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বলপূর্বক গুম ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল উল্লেখ করে তিনি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আবেদন জানান।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগ থেকে অব্যাহতির (ডিসচার্জ) আবেদন দাখিলের প্রস্তুতির জন্য সময় চান। আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ আদালতকে জানান, প্রসিকিউশনের প্রয়োজনীয় নথিপত্র তারা দেরিতে হাতে পেয়েছেন। ফলে প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন। রাষ্ট্রপক্ষ এ আবেদনে আপত্তি না জানানোয় ট্রাইব্যুনাল আগামী ১০ আগস্ট আসামিপক্ষের শুনানির দিন ধার্য করেন।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন: সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক, সাবেক স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) প্রধান ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া, সিটিটিসির সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম, বগুড়ার সাবেক পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান, গাজীপুরের সাবেক পুলিশ সুপার ও ডিবিপ্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, বগুড়ার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মণ্ডল এবং সিটিটিসির সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার (সোয়াট টিম লিডার) এসএম জাহাঙ্গীর হাছান।
বর্তমানে এ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক এবং সাবেক ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া। শুনানির সময় তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
এর আগে চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি এই ১০ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করে প্রসিকিউশন। অভিযোগ গ্রহণের পর পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।

গাজীপুরের পাতারটেকে কথিত ‘জঙ্গি অভিযান’ সাজিয়ে সাতজনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১০ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (চার্জ) গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আবেদন জানিয়েছে প্রসিকিউশন। এ বিষয়ে শুনানি শেষে আগামী ১০ আগস্ট আসামিপক্ষের শুনানির দিন নির্ধারণ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
রবিবার (২ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে এ বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে শুনানিতে অংশ নেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। তার সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ, সহিদুল ইসলাম সরদার, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, মামুনুর রশিদ ও মার্জিনা রায়হান।
শুনানিতে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশজুড়ে একই ধরনের কৌশলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক বিরোধী এবং ইসলামী মতাদর্শের অনুসারীদের দমনে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও ভয়ভীতির একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, সে সময় সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সমালোচনা করাও ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অভিযোগ তুললেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোপন বন্দিশালায় মানুষকে আটকে রাখা হতো।
গুমের শিকার পরিবারগুলোর দুর্দশার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেক স্বজনকে বাধ্য হয়ে বলতে হয়েছে—‘আমার ছেলেকে জেলে দিন, কিন্তু ক্রসফায়ারে দেবেন না।’ এরপরও অনেককে কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা সাজিয়ে হত্যা করে মরদেহ বিভিন্ন সড়ক কিংবা নদীর তীরে ফেলে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সে সময় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী-এমপি নিয়মিত ‘জঙ্গি’ ইস্যু সামনে আনতেন এবং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদে আক্রান্ত রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হতো। অথচ জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এসব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বলেও আদালতকে জানান তিনি।
পাতারটেকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রসিকিউশন জানায়, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সাতজনকে তুলে এনে বগুড়ায় পুলিশের একটি গোপন বন্দিশালায় রাখা হয়। পরে ২০১৬ সালের ৮ অক্টোবর তাদের গাজীপুরের নোয়াগাঁওয়ের পাতারটেক এলাকায় সোলায়মান সরকারের বাড়িতে নেওয়া হয়। সেখানে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের নেতৃত্বে কথিত জঙ্গিবিরোধী অভিযান পরিচালনার নামে সোয়াট সদস্যরা সাতজনকে গুলি করে হত্যা করেন। ওই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন শরতের তুফান’।
প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর নিহতদের পরিবারের সদস্যরা মরদেহ নিতে গেলে তাদের বিরুদ্ধেও তদন্তের হুমকি দেওয়া হয়। অভিযোগ করা হয়, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। ফলে ভয়ে অনেক পরিবারই মরদেহ নিতে এগিয়ে আসেননি। নিহত সাতজনের মধ্যে চারজনের পরিচয় এখনো শনাক্ত হয়নি। অপর তিনজন হলেন মো. ইবরাহীম, ফরিদুল ইসলাম আকাশ ও সাইফুর রহমান। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ইবরাহীমের বাবা এ ঘটনায় অভিযোগ দায়ের করেন।
প্রসিকিউটর আদালতে আরও বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ক্ষমতা ধরে রাখার উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বলপূর্বক গুম ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল উল্লেখ করে তিনি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আবেদন জানান।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগ থেকে অব্যাহতির (ডিসচার্জ) আবেদন দাখিলের প্রস্তুতির জন্য সময় চান। আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ আদালতকে জানান, প্রসিকিউশনের প্রয়োজনীয় নথিপত্র তারা দেরিতে হাতে পেয়েছেন। ফলে প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন। রাষ্ট্রপক্ষ এ আবেদনে আপত্তি না জানানোয় ট্রাইব্যুনাল আগামী ১০ আগস্ট আসামিপক্ষের শুনানির দিন ধার্য করেন।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন: সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক, সাবেক স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) প্রধান ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া, সিটিটিসির সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম, বগুড়ার সাবেক পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান, গাজীপুরের সাবেক পুলিশ সুপার ও ডিবিপ্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, বগুড়ার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মণ্ডল এবং সিটিটিসির সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার (সোয়াট টিম লিডার) এসএম জাহাঙ্গীর হাছান।
বর্তমানে এ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক এবং সাবেক ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া। শুনানির সময় তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
এর আগে চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি এই ১০ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করে প্রসিকিউশন। অভিযোগ গ্রহণের পর পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।

‘জঙ্গি’ সাজিয়ে ৭ হত্যা: হাসিনাসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে শুনানি শেষ
সিজেডএন ডেস্ক

গাজীপুরের পাতারটেকে কথিত ‘জঙ্গি অভিযান’ সাজিয়ে সাতজনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১০ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (চার্জ) গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আবেদন জানিয়েছে প্রসিকিউশন। এ বিষয়ে শুনানি শেষে আগামী ১০ আগস্ট আসামিপক্ষের শুনানির দিন নির্ধারণ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
রবিবার (২ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে এ বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে শুনানিতে অংশ নেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। তার সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ, সহিদুল ইসলাম সরদার, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, মামুনুর রশিদ ও মার্জিনা রায়হান।
শুনানিতে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশজুড়ে একই ধরনের কৌশলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক বিরোধী এবং ইসলামী মতাদর্শের অনুসারীদের দমনে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও ভয়ভীতির একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, সে সময় সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সমালোচনা করাও ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অভিযোগ তুললেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোপন বন্দিশালায় মানুষকে আটকে রাখা হতো।
গুমের শিকার পরিবারগুলোর দুর্দশার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেক স্বজনকে বাধ্য হয়ে বলতে হয়েছে—‘আমার ছেলেকে জেলে দিন, কিন্তু ক্রসফায়ারে দেবেন না।’ এরপরও অনেককে কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা সাজিয়ে হত্যা করে মরদেহ বিভিন্ন সড়ক কিংবা নদীর তীরে ফেলে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সে সময় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী-এমপি নিয়মিত ‘জঙ্গি’ ইস্যু সামনে আনতেন এবং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদে আক্রান্ত রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হতো। অথচ জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এসব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বলেও আদালতকে জানান তিনি।
পাতারটেকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রসিকিউশন জানায়, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সাতজনকে তুলে এনে বগুড়ায় পুলিশের একটি গোপন বন্দিশালায় রাখা হয়। পরে ২০১৬ সালের ৮ অক্টোবর তাদের গাজীপুরের নোয়াগাঁওয়ের পাতারটেক এলাকায় সোলায়মান সরকারের বাড়িতে নেওয়া হয়। সেখানে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের নেতৃত্বে কথিত জঙ্গিবিরোধী অভিযান পরিচালনার নামে সোয়াট সদস্যরা সাতজনকে গুলি করে হত্যা করেন। ওই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন শরতের তুফান’।
প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর নিহতদের পরিবারের সদস্যরা মরদেহ নিতে গেলে তাদের বিরুদ্ধেও তদন্তের হুমকি দেওয়া হয়। অভিযোগ করা হয়, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। ফলে ভয়ে অনেক পরিবারই মরদেহ নিতে এগিয়ে আসেননি। নিহত সাতজনের মধ্যে চারজনের পরিচয় এখনো শনাক্ত হয়নি। অপর তিনজন হলেন মো. ইবরাহীম, ফরিদুল ইসলাম আকাশ ও সাইফুর রহমান। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ইবরাহীমের বাবা এ ঘটনায় অভিযোগ দায়ের করেন।
প্রসিকিউটর আদালতে আরও বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ক্ষমতা ধরে রাখার উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বলপূর্বক গুম ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল উল্লেখ করে তিনি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আবেদন জানান।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগ থেকে অব্যাহতির (ডিসচার্জ) আবেদন দাখিলের প্রস্তুতির জন্য সময় চান। আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ আদালতকে জানান, প্রসিকিউশনের প্রয়োজনীয় নথিপত্র তারা দেরিতে হাতে পেয়েছেন। ফলে প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন। রাষ্ট্রপক্ষ এ আবেদনে আপত্তি না জানানোয় ট্রাইব্যুনাল আগামী ১০ আগস্ট আসামিপক্ষের শুনানির দিন ধার্য করেন।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন: সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক, সাবেক স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) প্রধান ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া, সিটিটিসির সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম, বগুড়ার সাবেক পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান, গাজীপুরের সাবেক পুলিশ সুপার ও ডিবিপ্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, বগুড়ার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মণ্ডল এবং সিটিটিসির সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার (সোয়াট টিম লিডার) এসএম জাহাঙ্গীর হাছান।
বর্তমানে এ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক এবং সাবেক ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া। শুনানির সময় তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
এর আগে চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি এই ১০ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করে প্রসিকিউশন। অভিযোগ গ্রহণের পর পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।







