শিরোনাম

অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নতুন পরিকল্পনা সরকারের

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নতুন পরিকল্পনা সরকারের
রাজধানীর সড়কে চলাচল করছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা

জ্বালানি সংকট, বিদ্যুতের ঘাটতি ও জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নতুন পরিকল্পনা হাতে নিচ্ছে সরকার। নিবন্ধন ও নবায়নের শর্ত হিসেবে এসব যানবাহন সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে চার্জ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা চালুর কথা ভাবা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিবন্ধনের আওতায় এনে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগও নেওয়া হবে।

বর্তমানে দেশে আনুমানিক ৬০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে। রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে এখন প্রধান সড়কেও এসব যান দেখা যাচ্ছে। দ্রুতগতির তিন চাকার এই যানবাহনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।

সড়ক নিরাপত্তার পাশাপাশি অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দিতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়টিও সরকারের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, একটি অটোরিকশা প্রতিদিন চার্জ দিতে গড়ে ৮ থেকে ৯ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়। সব মিলিয়ে এই খাতে দৈনিক প্রায় ৫৫ কোটি টাকার বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। বছরে এ ব্যয় ছাড়িয়ে যাচ্ছে ২০ হাজার কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চার্জিংয়ের কারণে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ থেকে ৮৫০ মেগাওয়াটের সমপরিমাণ চাপ তৈরি হচ্ছে। এটি দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৫ শতাংশের কাছাকাছি। এর ওপর বড় একটি অংশের বিদ্যুৎ অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনেও এর চিত্র দেখা গেছে। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানে ফুটপাত, গ্যারেজ ও অস্থায়ী চার্জিং পয়েন্টে বিপুলসংখ্যক ব্যাটারি একসঙ্গে চার্জ দিতে দেখা গেছে। কোথাও অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করা হচ্ছে, আবার কোথাও প্রিপেইড মিটারের অপব্যবহারের মাধ্যমে চলছে চার্জিং কার্যক্রম।

তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঢাকাতেই ৪৮ হাজার ১৩৬টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট ও ৯৯২টি গ্যারেজ রয়েছে। এসব অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।

এই পরিস্থিতিতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মাধ্যমে নিবন্ধনের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। নিবন্ধন এবং পরবর্তী সময়ে নবায়নের ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে চার্জ দেওয়ার শর্ত যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এর ফলে একদিকে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহার কমবে, অন্যদিকে জাতীয় গ্রিডের ওপরও চাপ কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন সহজ হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশের ৬০ লাখের বেশি অটোরিকশার জন্য প্রয়োজন হবে বিপুলসংখ্যক সৌর চার্জিং স্টেশন। পাশাপাশি প্রয়োজন হবে বড় আকারের বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থা, নিরাপদ ও মানসম্মত চার্জার, মিটারভিত্তিক বিলিং এবং কেন্দ্রীয়ভাবে চার্জিং কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের অবকাঠামো।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, শুধু সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভর করে এত বড় পরিসরের চার্জিং ব্যবস্থা পরিচালনা করা কঠিন। পর্যাপ্ত স্টোরেজ ব্যবস্থা গড়ে না ওঠা পর্যন্ত হাইব্রিড পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। তবে সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করা সরকারের সক্ষমতার মধ্যেই রয়েছে।

সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার ও অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়িয়ে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাকে আরও টেকসই করার পথও খুলতে পারে।