শিরোনাম

বাংলাদেশকে পরনির্ভরশীল রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায় না সরকার: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশকে পরনির্ভরশীল রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায় না সরকার: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে জুলাই অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কথা বলছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমা

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম শিক্ষা হলো বাংলাদেশকে কখনোই পরনির্ভরশীল রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায় না সরকার। দেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি ‘বাংলাদেশ প্রথম’ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো বাংলাদেশকে আর কখনো সেই অবস্থায় ফিরে যেতে না দেওয়া।

বুধবার (৫ আগস্ট) রাজধানীর ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে জুলাই অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি।

ড. খলিলুর রহমান বলেন, দুই বছর আগে দেশের পরিস্থিতি ছিল স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে নৃশংস সময়গুলোর একটি। আমরা বাইরে থেকে দেখেছি যে ছোট ছোট বাচ্চারা নির্মম নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, প্রাণ দিচ্ছে, আহত হচ্ছে। তারপর একসময় পুরো ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট হয়ে গেল। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটা ছিল সবচেয়ে নৃশংস সময়, স্বাধীনতার পর এমন কালো অধ্যায় আমরা আর দেখিনি।

তিনি বলেন, সে সময় জাতিসংঘের মহাসচিবের দপ্তরের সঙ্গে আমি ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরি। আগস্টের একেবারে শুরুর দিকে আমি জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিসে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলাম। পয়লা আগস্ট আমি ইমোশনালি এতটাই কাতর হয়ে পড়েছিলাম যে আমি সিদ্ধান্ত নেই জাতিসংঘের মহাসচিবের দপ্তরে ফোন করব। বাংলাদেশে এই ধরনের একটা ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় তিনি উপেক্ষা করতে পারেন না—সেই বিষয়টি আমি তাকে বলেছি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমার ধারণা, তিনি নিশ্চুপ বসে ছিলেন না। এর কিছুদিন পরেই দেখি যে অন্তত কিছু কিছু বাহিনীর ক্ষেত্রে গুলি বর্ষণ বন্ধ হয়েছে। আমার ধারণা, পরিবর্তনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতেও সম্ভবত এর একটি ভূমিকা ছিল। সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তাকে সরকারে যোগ দিতে আহ্বান জানাই এবং পরে তিনি আমাকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্ব দেন।

তিনি বলেন, আমাদের সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল-প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সরকারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে (গণতান্ত্রিক) উত্তরণ সম্পন্ন করা। তিনটি কাজই আমরা করতে পেরেছি। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থানও বদলাতে শুরু করেছে। সম্প্রতি তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে বলেছেন, বাংলাদেশ একসময় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে হারিয়ে যাচ্ছিল। সেই বাংলাদেশ ফিরে আসছে দেখে আমরা খুব আনন্দিত।

ড. খলিলুর রহমান বলেন, আজকে প্রধানমন্ত্রী যে কথাটা বলেছেন, জুলাই আন্দোলনের একটা বড় বিষয়ই হচ্ছে-আমরা বাংলাদেশকে একটা ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ হিসেবে দেখতে চাই না। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথাটাও সেই একই বার্তার প্রতিধ্বনি। শুরু থেকেই আমাদের সরকারের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় ভিত্তি হচ্ছে-বাংলাদেশ প্রথম। আমরা সেই ক্লায়েন্ট স্টেটের পর্যায়ে কখনো ফিরে যাব না, আর কখনো নয়। এই কাজটার একটা বড় দায়িত্ব আমাদের ওপর। কারণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামনে থেকে নিশ্চিত করবে যে আমরা আর কখনো ক্লায়েন্ট পরনির্ভরশীল রাষ্ট্রে পরিণত না হই।

তিনি বলেন, আমরা একটা জটিল আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অবস্থার মধ্যে আছি। বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, বিভিন্ন স্থানে একতরফা পদক্ষেপ বাড়ছে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভাঙনও স্পষ্ট হচ্ছে। এই জটিল আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতার মধ্য দিয়েই আমাদের পথ চলতে হবে বলে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার প্রথম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। তবে এটি খুবই কঠিন পরীক্ষা ছিল। এই সাফল্য প্রমাণ করেছে যে জুলাইয়ের শহিদরা দেশের কূটনীতিকদের ওপর যে ঐতিহাসিক দায়িত্ব দিয়ে গেছেন, তা পালনের সক্ষমতা ও দৃঢ় ইচ্ছা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রয়েছে।

তিনি বলেন, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের দিন আমি প্রথমে হাসপাতালে গিয়ে জুলাইয়ে আহতদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। ফিরে এসে আমি অধ্যাপক ইউনূসকে বলেছিলাম, স্যার, আমরা যেন কখনো না ভুলে যাই যে আমরা কী অবস্থায় তাদের রক্তের ওপর হেঁটে এসে এখানে বসেছি। এই কথাটি যেন আমরা সবাই মনে রাখি। আমাদের এই ছেলেমেয়েগুলো ভয়াবহ এক দানবের হাত থেকে দেশটাকে ছিনিয়ে এনে আমাদের হাতে দিয়েছে। এখন আমাদের দায়িত্ব ভালোবাসা, নিষ্ঠা, মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে এই দেশকে আগলে রাখা এবং এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ড. খলিলুর রহমান বলেন, জুলাইয়ের যে দায়, সেই দায়িত্ব কেউ যেন ভুলে না যান। প্রতিটি মুহূর্তে মনে রাখবেন, শহিদরা আমাদের হাতে একটি ঐতিহাসিক দায়িত্বভার দিয়ে গেছেন।

অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পূর্ব ও পশ্চিম) ড. মো. নজরুল ইসলাম এবং ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমির রেক্টর মোহাম্মদ আব্দুল মুহিত বক্তব্য দেন।

/এসবি/