জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে অসত্য ও অতিরঞ্জিত দাবি ট্রাম্পের

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে অসত্য ও অতিরঞ্জিত দাবি ট্রাম্পের

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ৩৮ মিনিটের একটি ভাষণ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। লিখিত বক্তব্য পাঠ করলেও তার বক্তব্যে বেশ কিছু অতিরঞ্জন ও অসত্য তথ্য উঠে এসেছে সিএনএনের মতো মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে।

ভাষণের শুরুতে ট্রাম্পের আটটি যুদ্ধ থামানোর দাবি নিয়ে তুমুল আলোচনা তৈরি হয়েছে। তিনি নিজের সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আটটি যুদ্ধের সমাধান করা আমার জন্য অত্যন্ত সম্মানের বিষয় ছিল।’

কম্বোডিয়া থেকে শুরু করে কসোভো, রুয়ান্ডা, ভারত-পাকিস্তান কিংবা গাজার মতো নানা সংঘাতের কথা টানলেও এর মধ্যে বেশ কিছু তথ্য বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। যেমন মিশর ও ইথিওপিয়ার বিরোধ বা সার্বিয়া-কসোভোর পরিস্থিতি আদতে কোনো যুদ্ধই ছিল না। আবার রুয়ান্ডা ও কঙ্গোর মধ্যকার লড়াই শান্তিচুক্তি সত্ত্বেও পুরোপুরি থামেনি, আর গাজায় যুদ্ধবিরতির পরেও হামলা অব্যাহত রয়েছে। এমনকি ২০২৫ সালের সংঘাতের পর ২০২৬ সালে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধে জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে ট্রাম্প জলবায়ু পরিবর্তন নিয়েও নানা বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তার মতে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ১২ বছরের মধ্যে পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার কথা যারা বলেছিল, তাদের আশঙ্কা ভুল প্রমাণিত হয়েছে কারণ পৃথিবী নাকি ঠান্ডা হচ্ছে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ে তার এ তত্ত্বে বড় ধরনের ভুল ধরিয়ে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেলের ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ ২০২৩: সিন্থেসিস রিপোর্ট’, যেখানে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে জলবায়ু সংকটের কারণে আগামী বছরগুলোতে মানুষের জীবন বিপন্ন হতে পারে। এটি কোনোভাবেই হালকা করে দেখার বিষয় নয়। ২০১৮ সালের বিজ্ঞানীদের সে প্রতিবেদনেও ১২ বছরের মধ্যে সবাই মারা যাওয়ার কথা বলা হয়নি, বরং তাপমাত্রা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছিল।

বিনিয়োগের পরিসংখ্যান নিয়েও ট্রাম্পের বক্তব্যে অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে। জাতিসংঘে তিনি দাবি করেছেন, ‘আমরা সারা বিশ্ব থেকে ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করেছি।’ অথচ হোয়াইট হাউসের নিজেদের হিসাব অনুযায়ী এ অংক ১১.২ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি এবং এর বেশিরভাগই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বা অর্থনৈতিক আদান-প্রদান। বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের পরিমাণ এর চেয়ে অনেক কম।

এদিকে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের জেরে মার্কিন গোলাবারুদ ফুরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি কঠোরভাবে অস্বীকার করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ‘কাপুরুষ ও দেশদ্রোহীরা বলতে পছন্দ করবে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদ ফুরিয়ে আসছে। কিন্তু তা সত্যি নয়। আমাদের কাছে এত বেশি গোলাবারুদ রয়েছে, যা আমরা কখনো ব্যবহার করার কথা ভাবতেও পারি না এবং আমরা এমন স্তরে এগুলো তৈরি করছি যা আমরা আগে কখনো করিনি।’

তবে পেন্টাগন ও কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা। ইরানের সঙ্গে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুদ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে এবং তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কয়েক বছর সময় লাগবে। দেশের ভেতরের অপরাধের হার নিয়েও নিজের সাফল্যের খতিয়ান বাড়িয়ে বলেছেন ট্রাম্প। ওয়াশিংটন ডিসির অপরাধ কমে যাওয়ার প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, ‘গত বছরের ২০ জানুয়ারি আমি যখন ওয়াশিংটন, ডিসি-তে এসেছিলাম, তখন এটি অপরাধে জর্জরিত ছিল এবং এখন অপরাধের হার ৮৭ ভাগ কমে গেছে এবং আমরা এটিকে শতভাগে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছি।’ অথচ স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী অপরাধ কমেছে প্রায় ২৩ শতাংশ, যা ট্রাম্পের দাবির ধারেকাছেও নেই।

/এমএকে/