জিনপিংকে রাজকীয় অভ্যর্থনা, চীনের কাছে কী চান ট্রাম্প

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
জিনপিংকে রাজকীয় অভ্যর্থনা, চীনের কাছে কী চান ট্রাম্প
শি জিনপিংকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানান ডোনাল্ড ট্রাম্প

এক দশকেরও বেশি সময় পর যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ওয়াশিংটনের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজ বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রথা অনুযায়ী সাধারণত হোয়াইট হাউসেই রাষ্ট্রপ্রধানদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়, তবে ট্রাম্পের এ ব্যক্তিগত অভ্যর্থনা শি-র জন্য ছিল বেশ মর্যাদাপূর্ণ। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে অন্য কোনো দেশের নেতা এমন রাজকীয় আপ্যায়ন পাননি।

এ সফরে দুই নেতার রুদ্ধদ্বার বৈঠক ছাড়াও প্রযুক্তি জগতের শীর্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ, হোয়াইট হাউসে সামরিক প্রদর্শনী এবং স্বাধীনতার মূল ঘোষণাপত্র ও সংবিধান সংরক্ষিত জাতীয় আর্কাইভ পরিদর্শনের মতো কর্মসূচি রয়েছে।

শি-এর কাছ থেকে ট্রাম্প যা চান

মে মাসে ট্রাম্পের বেইজিং সফরের ঠিক উল্টো চিত্র দেখা গেল এবার ওয়াশিংটনে। সে সময় শি জিনপিং বিমানবন্দরে ট্রাম্পকে অভ্যর্থনা জানাতে যাননি এবং চীন কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি, যৌথ বিবৃতি বা সংবাদ সম্মেলন ছাড়াই ট্রাম্পকে বিদায় দিয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ট্রাম্পের জন্য বেশ স্পর্শকাতর। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের জেরে দেশে তাকে তীব্র অসন্তোষের মুখে পড়তে হচ্ছে। সামনেই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন, তাই চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে আমেরিকানদের মধ্যে তৈরি হওয়া অস্বস্তি কাটাতে একটি সফল ভাবমূর্তি ফুটিয়ে তুলতে চাইছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও শি জিনপিং বেশ শক্ত অবস্থানেই রয়েছেন এবং চীনের বাণিজ্য চাকা পুরোদমে সচল। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক স্টিমসন সেন্টারের চীন বিষয়ক পরিচালক সান ইউন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেছেন, গত এক দশকে দুই দেশের অর্থনীতিই বড় হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনও এগিয়ে থাকলেও চীন এখন ওয়াশিংটনকে চোখে চোখ রেখে জবাব দেওয়ার মতো সক্ষমতা ও সদিচ্ছা দুটোই অর্জন করেছে।

গত বছর ট্রাম্পের দেওয়া ১২৫ শতাংশ শুল্কের পাল্টা জবাব দিয়ে চীন বাণিজ্য প্রায় আটকে দিয়েছিল। বিশেষ করে স্মার্টফোন থেকে যুদ্ধবিমান তৈরির খনিজ প্রক্রিয়াকরণে তাদের একাধিপত্য যুক্তরাষ্ট্রকে পিছু হটতে বাধ্য করেছিল। সানের ভাষায়, ‘অতীতে শক্তির দিক থেকে চীন পিছিয়ে ছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ ছিল না। কিন্তু এখন একে প্রায় সমকক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।’

টেবিলে কী আছে, আর কী আশা করা যায়

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বৈঠকে তাইওয়ানের ওপর নিজেদের দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারেন শি জিনপিং, যা ওয়াশিংটন এড়িয়ে যেতে চায়। অন্যদিকে চীনের আপত্তি সত্ত্বেও কঠোর রপ্তানি নীতি বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর ট্রাম্প। তবে ইরানের সংঘাতে বেইজিং কোনো মধ্যস্থতা করবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

স্বস্তির খবর হলো, আগামী বছরের শুরু পর্যন্ত বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি বহাল রাখতে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। এর বাইরেও আলোচনায় নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের শুল্ক কমানো, মাদক পাচার রোধে যৌথ উদ্যোগ এবং সামরিক পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়ানোর মতো বিষয়ে নতুন চুক্তি হতে পারে। এছাড়া চীনে আটক কিছু মার্কিন নাগরিকের মুক্তির বিষয়টিও তুলবেন ট্রাম্প।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। ঝুঁকি সত্ত্বেও এই বিষয়ে আলোচনার দরজা খোলা রাখতে পারে উভয়পক্ষ। তবে হোয়াইট হাউসের সাবেক কর্মকর্তা এবং সিএসআইএস-এর বিশেষজ্ঞ এডগার কাগান রয়টার্সকে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে সময়ের সঙ্গে মার্কিন অর্থনীতি বিকশিত হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র আরও শক্তিশালী হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয়, শি জিনপিং যখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন, তখন তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত পতনের দিকে ধাবিত হচ্ছে এবং সময় চীনের পক্ষেই রয়েছে।’

টেক জায়ান্টদের নৈশভোজ ও কূটনৈতিক চাল

দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের এ সফরে অ্যাপলের জন টার্নাস, এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং এবং ওপেনএআই-এর স্যাম অল্টম্যানের মতো টেক জায়ান্টদের প্রধানদের নিয়ে একটি রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করা হয়েছে। তীব্র মতপার্থক্য সত্ত্বেও বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎপাদনকারী দেশ ও সবচেয়ে বড় বাজারের ক্রেতারা যে একে অপরের পরিপূরক, তা এ আয়োজনের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে চাইছে ওয়াশিংটন ও বেইজিং।

সব মিলিয়ে, এ বৈঠককে নিখুঁতভাবে সাজানো একটি কূটনৈতিক প্রদর্শনী হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ঐতিহ্যগতভাবে যৌথ কোনো সংবাদ সম্মেলন না করে দুই দেশ আলাদা আলাদা ঘোষণা দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে নিজ দেশের নাগরিকদের কাছে নিজেদের রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দিতে পারবে উভয় পক্ষ।

সূত্র: এনডিটিভি

/এমএকে/