কিশোর কুমার: সংগীতে অনন্য এক যুগপুরুষ

বিনোদন ডেস্ক
বিনোদন ডেস্ক
কিশোর কুমার: সংগীতে অনন্য এক যুগপুরুষ
কিশোর কুমার

ভারতের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী কিশোর কুমার। তবে তিনি শুধুই গায়কই নন, একাধারে গীতিকার, সুরকার, অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার এবং রেকর্ড প্রযোজক হিসেবেও পরিচিত। ‘তোমার বাড়ির সামনে দিয়ে আমার মরণযাত্রা যেদিন যাবে’ গান গেয়ে মৃত্যু ও প্রেমকে অমরত্ব দিয়েছেন তিনি। আজ তার ৩৯তম প্রয়াণ দিবস।

কিশোর কুমার ১৯২৯ সালের ৪ আগস্ট মধ্যপ্রদেশের খাণ্ডোয়াতে এক মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা কুঞ্জলাল একজন আইনজীবী ছিলেন। তার মার নাম ছিল গৌরী দেবী।

কিশোর যখন ছোট, তার বড় ভাই অশোক কুমার তখন হিন্দি সিনেমার প্রতিষ্ঠিত তারকা। মেজ ভাই অনুপ কুমারও অভিনয় শুরু করেছিলেন। বোন সতী দেবী ছিলেন ভাইদের মধ্যে বড়। অশোক চেয়েছিলেন কিশোরও অভিনয় করুক। তবে অভিনয়ের চেয়ে গানের প্রতি তার ঝোঁক ছিলো বেশি। তিনি ক্যারিয়ার শুরু করেন বম্বে টকিজের কোরাস শিল্পী হিসেবে। বিনোদন দুনিয়ায় পা রেখে বড় দুই ভাইয়ের মতো নিজের নামটিও বদলে নিলেন। আভাস কুমার গঙ্গোপাধ্যায় থেকে হয়ে গেলেন কিশোর কুমার।

১৯৪৬ সালে অশোক কুমারের ছবি ‘শিকারি’ দিয়ে অভিনয়ে অভিষেক হয় কিশোর কুমারের। তারপর ১৯৪৮ সালে ‘জিদ্দি’ ছবিতে প্রথমবার কণ্ঠ দেন। তবে ১৯৪৬ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত বেশ কিছু ছবিতে অভিনয় করেছিলেন তিনি। তার মধ্যে বেশিরভাগই ফ্লপ ছিল। পরে ‘নকরি’, ‘চার প্যায়সে’, ‘বাপ রে বাপ’ ছবিগুলো হিট হলে অভিনয়ের প্রতি তিনি উৎসাহী হয়ে ওঠেন। পাশাপাশি গানও চালিয়ে যেতে থাকেন। রাজেশ খান্না, জিতেন্দ্র, দেব আনন্দ, অমিতাভ বচ্চনের মতো দিগগজ অভিনেতাদের জন্য গাইতেন তিনি। সলিল চৌধুরীর সংগীত পরিচালনায় ‘হাফ টিকিট’ ছবিতে নারী ও পুরুষ দুই কণ্ঠে গান করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন।

তার অভিনীত কৌতুকধর্মী ছবিগুলো হলো- ‘বাপ রে বাপ’, ‘চলতি কা নাম গাড়ি’, ‘হাফ টিকিট’, ‘পড়োসন’, ‘হাঙ্গামা’, ‘প্যায়ার দিওয়ানা’ ও ‘বাড়তি কা নাম দাড়ি’। এর মধ্যে ‘চলতি কা নাম গাড়ি’তে দুই ভাই অশোক ও অনুপ কুমারের সঙ্গে তার অভিনয় দর্শককে মুগ্ধ করেছিল। ‘পড়োসন’ ছবিতে তার কমেডি, অভিব্যক্তি ও গান আজও ভারতীয় চলচ্চিত্রের স্মরণীয় অংশ। পর্দায় তিনি যেন কোনো বাঁধাধরা নিয়ম মানতেন না। সংলাপ, অঙ্গভঙ্গি ও কণ্ঠের তাৎক্ষণিক ব্যবহারে দৃশ্যকে নিজের মতো করে তুলে ধরতেন।

কিশোর কুমার প্রথমদিকে কুন্দন লাল সায়গলের নকল করে গাইতেন। পরে শচীন দেব বর্মনের পরামর্শে তিনি নিজের গাইবার কায়দা পাল্টান। এ সময় তিনি এমন এক গাইবার কায়দা উদ্ভাবন করেন যা তাকে কিংবদন্তি গায়কে রূপান্তরিত করে। তার গানের বৈশিষ্ট্য ছিল গলাকে ভেঙে গান গাওয়া, যা আগে কখনও শোনা যায়নি। ভক্তদের মাঝে এই নতুন ধারার গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে কিশোর কুমার একজন প্রবল ব্যস্ত সফল গায়ক ও নায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। বাংলা, হিন্দি, মারাঠি, অসমিয়া, গুজরাটি, কন্নড়, ভোজপুরি, মালয়ালম, ওড়িয়া ও উর্দুসহ বিভিন্ন ভাষায় গান করেছেন তিনি। তার জনপ্রিয় বাংলা গানের মধ্যে রয়েছে ‘আমার পূজার ফুল’, ‘এ আমার গুরুদক্ষিণা’, ‘একদিন পাখি উড়ে যাবে যে আকাশে’, ‘কী আশায় বাঁধি খেলাঘর’, ‘তোমায় পড়েছে মনে’ ও ‘নীল নীল আকাশে’। বিখ্যাত ‘নয়ন সরসী কেন ভরেছে জলে’ গানের সুরও করেছিলেন কিশোর নিজেই।

তার জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো- ‘হামে তুমসে পেয়ার কিতনা’, ‘কোরা কাগজ থা ইয়ে মন মেরা’, ‘দেখা এক খোয়াব তো এ সিলসিলে হুয়ে’, ‘তেরে বিনা জিন্দেগি সে কোয়ি’, ‘ও মেরে দিল কে চ্যান’, ‘সাগর জ্যায়সি আঁখোঁওয়ালি’, ‘রিমঝিম গিরে সাওয়ান’, ‘কেহ দুঁ তুমহেঁ’সহ অসংখ্য গান।

সংগীত জীবনে তিনি প্রায় ২০০০ গান গেয়েছেন। এর মধ্যে তিনি ৮ বার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করেন।

ব্যক্তিজীবনে কিশোর কুমার একাধিক বিয়ে করেন। ১৯৫০ সালে তিনি রুমা গুহ ঠাকুরতার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৫৮ সালে তাদের বিচ্ছেদ হয়। ১৯৫২ সালে তাদের ছেলে অমিতের জন্ম হয়। এরই মধ্যে মধুবালার প্রেমে পড়েন কিশোর কুমার। ১৯৬০ সালে এই অভিনেত্রীকে বিয়ে করেন। কিন্তু কিশোরের পরিবার এ বিয়ে মেনে নেয়নি। তৃতীয়বার ১৯৭৫ সালে তিনি বিয়ে করেন অভিনেত্রী যোগিতা বালিকে। তাদের সংসার মাত্র ৩ বছর টিকেছিল। কিশোরের চতুর্থ স্ত্রী ছিলেন অভিনেত্রী লীনা চন্দাভারকর। ১৯৮০ সালে তাকে বিয়ে করেন। তাদের ছেলে সুমিত কুমারও সংগীতের সঙ্গে যুক্ত।

১৯৮৭ সালের ১৩ অক্টোবর মুম্বাইয়ে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান কিশোর কুমার। মৃত্যুর পর তার মরদেহ জন্মস্থান খান্ডোয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

/জেএইচ/