শিরোনাম
বিশ্ব মানব পাচার প্রতিরোধ দিবস

মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারেনি কেউই

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারেনি কেউই
বিশ্ব মানব পাচার প্রতিরোধ দিবস আজ

ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের ওপর একটি ছোট্ট কাঠের নৌকা। তাতে গাদাগাদি করে বসে আছেন শতাধিক মানুষ। কারও হাতে শুধু একটি ব্যাগ, কারও চোখে নতুন জীবনের স্বপ্ন। তাদের অনেকেই বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার তরুণ। লিবিয়ার উপকূল ছেড়ে ইতালি বা গ্রিসে পৌঁছানোর আশায় শুরু হওয়া এই যাত্রা কারও জন্য নতুন জীবনের দরজা খুলে দেয়, আবার অনেকের জন্য শেষ হয়ে যায় গভীর সমুদ্রে। প্রতি বছরই এমন দৃশ্য বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। কিন্তু তারপরও থামছে না ঝুঁকিপূর্ণ এই মানবস্রোত।

আজ ৩০ জুলাই, বিশ্ব মানব পাচার প্রতিরোধ দিবস। দিবসটি ঘিরে আবারও সামনে এসেছে বাংলাদেশের মানব পাচারের ভয়াবহ চিত্র। বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনি কাঠামো থাকলেও অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া, আন্তঃদেশীয় পাচারকারী চক্রের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এবং বৈধ অভিবাসনের সীমিত সুযোগ এই তিন কারণেই পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটছে না।

চলতি বছরের মার্চ মাসেই লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসে যাওয়ার সময় নৌকাডুবিতে অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশীর মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে ১২ জনই ছিলেন সুনামগঞ্জের বাসিন্দা। এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে, ইউরোপে পৌঁছানোর স্বপ্ন এখনো অসংখ্য বাংলাদেশী তরুণকে মৃত্যুঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে অবৈধভাবে ইতালিতে পৌঁছেছেন ৪ হাজার ২৪৯ জন বাংলাদেশী। একই সময়ে লিবিয়া হয়ে গ্রিসে পৌঁছেছেন আরও ৩ হাজার ৬০৮ জন। অর্থাৎ মাত্র ছয় মাসেই প্রায় আট হাজার বাংলাদেশী ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ ব্যবহার করেছেন।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংখ্যা কেবল সফলভাবে ইউরোপে পৌঁছাতে সক্ষম ব্যক্তিদের। পথে আটক, নিখোঁজ কিংবা নিহতদের বড় একটি অংশ কোনো পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর তথ্য বলছে, ২৭ জুলাই পর্যন্ত স্থল ও সমুদ্রপথে ইউরোপে অনিয়মিতভাবে প্রবেশ করেছেন ৭ হাজার ৯৬৯ জন বাংলাদেশী। আগের বছরগুলোতেও এই প্রবণতা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ২৪ হাজার ৩১৮, ২০২৪ সালে ১৫ হাজার ৩০৪, ২০২৩ সালে ১৩ হাজার ৭৭৩ এবং ২০২২ সালে ১৬ হাজার ৪৮৭।

বিশ্লেষকদের মতে, অনিয়মিত অভিবাসনের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা প্রমাণ করে যে শুধু আইন প্রয়োগ দিয়ে মানব পাচার ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না।

ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের সেন্ট্রাল মেডিটেরেনিয়ান রুটে বাংলাদেশীরা এখন সবচেয়ে বড় জাতীয় গোষ্ঠী। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই পথ ব্যবহার করে প্রায় এক লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশী ইউরোপে প্রবেশ করেছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংখ্যা শুধু একটি অভিবাসন প্রবণতার চিত্র নয়; এটি আন্তর্জাতিক মানব পাচার নেটওয়ার্কের বিস্তৃত কর্মকাণ্ডেরও ইঙ্গিত দেয়।

মানব পাচারের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো প্রলোভন। গ্রামের পরিচিত ব্যক্তি, আত্মীয়, স্থানীয় দালাল কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তরুণদের বিদেশে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। বলা হয়, ভালো চাকরি, অল্প সময়ে লাখ লাখ টাকা আয়, ভিসার ঝামেলা ছাড়াই ইউরোপে পৌঁছে দেওয়া হবে। এসব প্রতিশ্রুতির ফাঁদে পা দিয়ে অনেক পরিবার জমি বিক্রি করে কিংবা ঋণ নিয়ে লাখ লাখ টাকা তুলে দেয় দালালদের হাতে।

গাজীপুরের মাসুম মোল্লার ঘটনাটি এমন প্রতারণার একটি নির্মম উদাহরণ। ইতালিতে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রথমে তাকে দুবাই পাঠানো হয়। পরে মিসর হয়ে লিবিয়ায় নিয়ে স্থানীয় সশস্ত্র চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। পরিবারের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের মুক্তিপণ আদায়ের পর তিনি মুক্তি পেলেও মানব পাচারের মামলা এখনো বিচারাধীন।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ ইউরোপযাত্রায় যাওয়া অধিকাংশ বাংলাদেশীর বয়স ২৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ ও নোয়াখালীর মানুষ এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় তুলনামূলক বেশি যুক্ত হচ্ছেন।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ইউরোপে যাওয়ার উদ্দেশ্যে লিবিয়ায় পৌঁছানো বাংলাদেশীদের প্রায় ৭৫ শতাংশ কোনো কাজ পাননি। বরং অধিকাংশই বিভিন্ন ক্যাম্পে বন্দি অবস্থায় ছিলেন। প্রায় ৭৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং ৯৩ শতাংশকে আটকে রাখা হয়েছিল বিভিন্ন বন্দিশিবিরে।

মানব পাচারের ভয়াবহতা শুধু সমুদ্রপথেই সীমাবদ্ধ নয়। কক্সবাজারের টেকনাফের বাসিন্দা মোহাম্মদ সাবের জানান, অপহরণের পর চোখ বেঁধে তাকে একটি পাহাড়ি আস্তানায় নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েকদিন নির্যাতনের পর গভীর সমুদ্রে একটি বড় ট্রলারে তুলে দেওয়া হয়, যেখানে প্রায় ৩০০ মানুষ গাদাগাদি করে ছিলেন। পরে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড হয়ে তাকে মালয়েশিয়ায় নেওয়া হয়।

মানব পাচারের প্রভাব এখন শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশীদের জন্য ভিসা কঠোর হওয়া, শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়া এবং শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সীমিত হওয়ার পেছনেও অনিয়মিত অভিবাসন ও মানব পাচার বড় ভূমিকা রাখছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত হেনলি পাসপোর্ট সূচকেও বাংলাদেশের অবস্থানের অবনতি হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশী পাসপোর্টধারীরা আগাম ভিসা ছাড়া বা ভিসামুক্ত সুবিধায় ৩৫টি দেশে যেতে পারেন, যা আগের বছরের তুলনায় কম।

একই ধরনের সমস্যার মুখে পড়েছে পর্যটন ভিসাও। ভিয়েতনামে পর্যটক হিসেবে গিয়ে অনেকে আর দেশে না ফেরায় বাংলাদেশীদের জন্য ভিসা ইস্যু স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয় দেশটি। এ ধরনের ঘটনা অন্যান্য দেশকেও বাংলাদেশীদের বিষয়ে আরও সতর্ক করে তুলছে।

২০১২ সালে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন কার্যকর হওয়ার পর থেকে নিয়মিত মামলা হলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির সংখ্যা অত্যন্ত কম। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত মানব পাচারের মামলায় ২৫ হাজার ৫৫৪ জনকে আসামি করা হলেও সাজা হয়েছে মাত্র ২০০ জনের। এর মধ্যে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়েছেন ৩০ জন।

কিছু বছরে হাজার হাজার আসামি থাকলেও একজনেরও সাজা হয়নি। ফলে পাচারকারীদের মধ্যে আইনের ভয় তৈরি হয়নি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

চলতি বছরের মে পর্যন্ত আদালতে মানব পাচার-সংক্রান্ত বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩ হাজার ৩০৬টি। তদন্ত শেষ হয়নি আরও ১ হাজার ৯৭৮টি মামলার। ফলে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাও অপরাধ দমনের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে সরকার 'মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬' প্রণয়ন করেছে। নতুন আইনে মানব পাচারের পাশাপাশি অভিবাসী চোরাচালানকেও অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সংঘবদ্ধ মানব পাচারের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান বহাল রাখা হয়েছে।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসানের মতে, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না; মূল হোতাদের গ্রেপ্তার, সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং পাচারপ্রবণ জেলাগুলোতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন জরুরি।

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)-এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী মনে করেন, মানব পাচার কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে মোকাবিলা সম্ভব নয়। দক্ষ জনশক্তি তৈরি, বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বৃদ্ধি, সাক্ষী সুরক্ষা, বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন।

সরকারও মানব পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউরোপে পাঠানোর নামে যেসব ভুয়া বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। অনুমোদনহীন রিক্রুটিং এজেন্সি ও প্রতারকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মানব পাচারপ্রবণ এলাকায় ব্যাপক জনসচেতনতা কর্মসূচিও পরিচালনা করা হবে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, সরকার অনিয়মিত অভিবাসন নিরুৎসাহিত করতে গন্তব্য দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করছে। নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানো, পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার মাধ্যমে মানব পাচার প্রতিরোধে বহুমাত্রিক কৌশল বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, মানব পাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আইন, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সবকিছুকে একসঙ্গে কার্যকর করতে হবে। অন্যথায় প্রতি বছরই নতুন নতুন তরুণ উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে মানব পাচারকারীদের ফাঁদে পড়বেন, আর ভূমধ্যসাগরের ঢেউ গিলে নেবে আরও বহু বাংলাদেশীর জীবন।

/এমআর/