টাকা দিলেই মিলছে গবেষণাপত্র ও লেখক হওয়ার সুযোগ

টাকা দিলেই মিলছে গবেষণাপত্র ও লেখক হওয়ার সুযোগ
ওয়েবসাইট ঘুরে এমন কিছু প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া গেছে যারা গবেষণাপত্র বিক্রি করছে। ছবি: এআই

যেকোনো বিষয় নিয়ে গবেষণা করা খুব সহজ কাজ নয়। গবেষণা করতে পরিকল্পনা,প্রস্তাব, সময়, শ্রম ও দক্ষতা লাগে। বিষয় নির্বাচন থেকে তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, গবেষণাপত্র লেখা এবং দেশ-বিদেশের সাময়িকীতে প্রকাশ- প্রতিটি ধাপেই থাকে গবেষকের পরিকল্পনা ও চিন্তার প্রতিফলন। কিন্তু কষ্টসাধ্য সেই গবেষণাপত্র যদি টাকা দিলেই পাওয়া যায়, তাহলে সেই গবেষণার কোনো মূল্য বা উপযোগিতা থাকে না। এমনকি অর্থ দিলে গবেষণাপত্রে লেখক বা সহ-লেখক হিসেবেও নিজের নামও যুক্ত করা যায়। এভাবে কোনো পরিশ্রম ও অভিজ্ঞতা ছাড়াই যদি লেখক বা সহ-লেখক হওয়া যায় তাহলে গবেষণার স্বচ্ছতা, যথার্থতা ও সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট ঘুরে এমন কয়েকটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সন্ধান মিলেছে। কিউ-১ থেকে কিউ-৪ জার্নাল, অথরশিপ কিংবা পুরো গবেষণা প্রকল্প, সবকিছুর জন্যই রয়েছে আলাদা ‘প্যাকেজ’। কোথাও আবার গবেষণাপত্রে লেখকের অবস্থান অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়েছে আলাদা ফি। এসব তথ্যের কিছু অংশ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে পাওয়া গেছে।

‘বুকম্যান রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (বিআরটিআই)’ ও ‘একাডেমিক রাইটার্স’ নামের দুটি ফেসবুক পেজের সঙ্গে যোগাযোগ করে গবেষণাপত্র লেখা ও প্রকাশনার বিষয়ে প্রস্তাব পাওয়া যায়।

অনুসন্ধানে পাওয়া একটি মূল্যতালিকায় দেখা যায়, কিউ-১ জার্নালে প্রথম লেখক হিসেবে নাম যুক্ত করতে চাওয়া হচ্ছে ৭০ হাজার টাকা, দ্বিতীয় লেখকের জন্য ৬০ হাজার এবং পর্যায়ক্রমে ষষ্ঠ লেখকের জন্য ২০ হাজার টাকা। নন-স্কোপাস জার্নালে প্রথম লেখকের জন্য চাওয়া হচ্ছে ১৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ গবেষণাপত্রে লেখকের অবস্থান অনুযায়ী টাকার অঙ্কও নির্ধারিত হয়।

‘মেডোরা রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ নামের একটি ফেসবুক পেজে ‘নতুন গবেষণা প্রজেক্টে অথর ও কো-অথর রেজিস্ট্রেশন চলছে’ শিরোনামে বিজ্ঞাপন পাওয়া যায়। ওই পেজে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করলে কিউ-৩/কিউ-৪ গবেষণা প্রকল্পের একটি মূল্যতালিকা দেওয়া হয়।প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ‘প্রাইমারি রিসার্চ প্যাকেজ’-এর মেয়াদ প্রায় ছয় মাস এবং একটি দলে সদস্যসংখ্যা আটজন।

সেখানে ‘গবেষক’-হতে ফি গুনতে হবে ৩০ হাজার টাকা। প্রথম সহ-গবেষক ১১ হাজার, দ্বিতীয় ১০ হাজার ৫০০, তৃতীয় ১০ হাজার এবং সপ্তম সহ-গবেষকের জন্য ৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাকি সহ-গবেষকদের ক্ষেত্রেও ধাপে ধাপে ফি নির্ধারিত।

‘ডিজারটেশন হেল্প’- নামে এক পেইজের সানজিদা নামে এক প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ করলে অডিও বক্তব্যেও তাদের কাজের ধরন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তিনি বলেন, থিসিস বা ডিজারটেশনের কাজ চ্যাপ্টারভিত্তিক করে দেওয়া হয়। মেথডোলজি, লিটারেচার রিভিউ, রিসার্চসহ বিভিন্ন অংশ গ্রাহকের নির্দেশনা অনুযায়ী তৈরি করে দেওয়ার কথাও জানান তিনি।

এ ছাড়া তাদের ৪০০-এর বেশি ‘প্রফেশনাল রাইটার’ রয়েছে এবং কাজ ‘হিউম্যানাইজ’ করে দেওয়ার মাধ্যমে প্লেজিয়ারিজম (গবেষণা চুরি) ও এআই শনাক্তকরণ নিয়ে গ্রাহককে চিন্তা করতে হবে না বলেও আশ্বাস দেন তিনি। এতে অর্থের বিনিময়ে লেখকের অবস্থান নির্ধারণ করার প্রশ্ন উঠেছে।

‘রিসার্চ পেপার বিডি’ নামের একটি ওয়েবসাইটে গবেষণার বিষয় নির্বাচন থেকে শুরু করে গবেষণাপত্র লেখার বিভিন্ন সেবা দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ছবি ও প্রোফাইলও দেখা যায়। তবে ওয়েবসাইটে প্রদর্শিত ব্যক্তিরা সত্যিই সংশ্লিষ্ট সেবার সঙ্গে যুক্ত কি না এবং তাদের অনুমতি নিয়ে ছবি ও পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে কি না-সেসব বিষয় যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

‘রিসার্চ পেপার বিডি-এর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের গবেষণাপত্র বিক্রির বিষয় সম্পর্কে আরও সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিরা জানান, সম্প্রতি ‘নারীর ক্ষমতায়নে স্থানীয় সরকারের ভূমিকা: গ্রামীণ বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত’ এবং ‘সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা: বাংলাদেশে পরিপ্রেক্ষিত’ শিরোনামে দুটি গবেষণা বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) দুইজন শিক্ষার্থীর জন্য তারা প্রস্তুত করে দিয়েছেন। ওই গবেষণার একটির প্রথম পাতায় তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের নামও পাওয়া যায়।

এ ছাড়া ‘দ্য স্পাইয়ার’ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান নিজেদের বিদেশি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দিয়ে জার্নালভেদে গবেষণা ও প্রকাশনাসংক্রান্ত সেবার জন্য ১৫০ ডলার পর্যন্ত নেওয়ার তথ্য দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গবেষণায় পরামর্শ দেওয়া আর অন্যের হয়ে গবেষণাপত্র তৈরি করে দেওয়া এক বিষয় নয়। একইভাবে গবেষণায় অবদান রাখা আর অর্থের বিনিময়ে লেখকের জায়গা নেওয়ার মধ্যেও মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। গবেষণাপত্রে লেখক হিসেবে নাম থাকা মানে সেই গবেষণায় বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান রাখা এবং প্রকাশিত ফলাফলের দায় নেওয়া। সেখানে টাকা দিয়ে লেখকের জায়গা পাওয়া গেলে গবেষণার সত্যতা ও প্রকাশনার বিশ্বাসযোগ্যতা দুটিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

কিউ-১, কিউ-২ বা স্কোপাসের নাম দেখেই কোনো গবেষণা-সেবাকে বৈধ ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। গবেষণায় কে কাজ করেছেন, তথ্য কীভাবে সংগ্রহ হয়েছে, গবেষণাপত্র কে লিখেছেন এবং লেখকরা প্রকাশিত ফলাফলের দায় নিচ্ছেন কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন সংশ্লিষ্টদের।

এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী ফারুক হোসেন সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘গবেষণার নামে অর্থের বিনিময়ে লেখক হওয়া বা অন্যের মাধ্যমে গবেষণাপত্র তৈরি করে নেওয়ার প্রবণতা একাডেমিক সততার জন্য উদ্বেগজনক। এ ধরনের কার্যক্রম মনিটরিংয়ের আওতায় আনা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট জার্নাল কর্তৃপক্ষকে গবেষণাপত্রের অথরশিপ, গবেষণার তথ্য ও প্রকাশনার প্রক্রিয়া যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী ও গবেষকদেরও সহজে গবেষণাপত্র পাওয়ার আশায় এ ধরনের সেবার ওপর নির্ভর না করে নিজের গবেষণায় গুরুত্ব দেওয়া উচিত।’