সাত বছরেও সরকারের দেওয়া ফ্ল্যাটে ওঠা হলো না পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের

সাত বছরেও সরকারের দেওয়া ফ্ল্যাটে ওঠা হলো না পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের
মিরপুর বেড়িবাঁধের কাছে গাবতলী সিটি পল্লী আবাসন প্রকল্পের চারটি বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু আজও এসব ভবনে ওঠতে পারেনি পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা। ছবি: ইমরান হোসেন

সুন্দর, গোছানো এবং পর্যাপ্ত আলো ও বাতাস আছে-এমন ঘরে থাকার স্বপ্ন থাকে সবার। কিন্তু সেই ঘর নির্মাণের সামর্থ্য অনেকেরই থাকে না। ঢাকা সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা যে বেতন-ভাতা পান তা দিয়ে এই ধরনের ঘর নির্মাণের চিন্তা করাটাও খুব অস্বাভাবিক। তবে এবার তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ করছে সরকার। তাদের জন্য রাজধানীর গাবতলীতে আধুনিক ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হয়েছে। সাত বছর আগেই তাদের এই ফ্ল্যাটে ওঠার কথা। কিন্তু ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষের গাফিলতিসহ নানা কারণে পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা ফ্ল্যাটে ওঠতে পারেনি। এতে টিনের ভাঙাচোরা ঘরেই তাদের থাকতে হচ্ছে। ভাঙাচোরা ঘরে বৃষ্টির পানি পড়ায় তারা পোহাচ্ছেন ভোগান্তি ।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে নগরের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য ৭৮৪টি ফ্ল্যাট নির্মাণের উদ্যোগ নেয় ডিএনসিসি। ‘গাবতলী সিটি পল্লী’ নামে একটি আবাসন প্রকল্পের আওতায় চারটি ১৫ তলা ভবন ও একটি চার তলা স্কুল ভবন নির্মাণ করার কথা।

ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৭৭ কোটি ৭৩ লাখ ১১ হাজার টাকা। পরে নানা কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে ২৮৪ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। ২০১৭ সালে মার্চে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের কাজ ২০১৯ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। এরপর বেশ কয়েকবার কাজ শেষের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। সর্বশেষ গত ৩০ জুন পর্যন্ত কাজ শেষ করার মেয়াদ বাড়ানো হয়। কিন্তু নির্ধারিত ওই সময়েও কাজ শেষ করতে পারেনি ডিএনসিসি। এখনো বিদ্যুৎ-সংযোগ, লিফট চালু, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামোর কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে।

চলতি বছরের এপ্রিলের শেষ দিকে ওই প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে যান ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। পরিদর্শন শেষে তিনি জানিয়েছিলেন, জুলাইয়ের শেষের দিকে কিংবা আগস্টের শুরুতেই ফ্ল্যাটে উঠতে পারবেন পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা। জুলাই ও আগস্ট পেরিয়ে সেপ্টেম্বরও শেষের পথে। কিন্তু এখনো পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা নতুন ভবনে ওঠতে পারেনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাবতলী সিটি পল্লীর আবাসিক ভবনগুলোর নির্মাণ কাজ শেষ হলেও সেগুলো বসবাসের উপযোগী হয়নি। চারটি ভবনের মধ্যে মাত্র একটি ভবনে লিফট বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। বাকিগুলোর কাজ চলমান। লিফটের সরঞ্জাম একটি ভবনের নিচতলায় মেঝেতে রেখে দেওয়া হয়েছে। সিটি পল্লীর চারপাশে সীমানাপ্রাচীর হলেও ভেতরের সড়কের কাজ শেষ হয়নি। পয়ঃনিষ্কাশন লাইন ও ড্রেন নির্মাণের কাজ চলমান।

গাবতলী সিটি পল্লী আবাসন প্রকল্পের একটি ভবনের নিচ তলায় লিফটের সরঞ্জাম রেখে দেওয়া হয়েছে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
গাবতলী সিটি পল্লী আবাসন প্রকল্পের একটি ভবনের নিচ তলায় লিফটের সরঞ্জাম রেখে দেওয়া হয়েছে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

গত ১৬ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে দেখা গেছে, আবাসন প্রকল্পের মূল ফটকে শ্রমিকেরা টাইলস বসানোর কাজ করছেন। পাঁচতলাবিশিষ্ট স্কুল ভবনের মূল কাজ শেষ হলেও বৈদ্যুতিক কাজ বাকি রয়েছে। চারটি বহুতল ভবনের নিচের অংশ টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। ভবনের বাইরে খোলা স্থানে পাইপ ও অন্যান্য সরঞ্জাম স্তূপ করে রাখা হয়েছে। প্রতিটি ভবনে গ্যাসের লাইন টেনে রাখা হলেও এখনো সংযোগ দেওয়া হয়নি।

সরেজমিনে আরও দেখা গেছে, আবাসন প্রকল্পের ঢোকার পর হাতের ডানে একটি ভবন। এই ভবনের দুই তলার একটি ফ্ল্যাটের ভেতরে রং, টাইলস ও ফিটিংস এবং বৈদ্যুতিক ওয়্যারিংয়ের কাজ শেষ।

এই আবাসন প্রকল্পের নিরাপত্তাকর্মী মজিবুর রহমান বলেন, ‘প্রতিটি ভবনের প্রতিটি তলায় ১৬টি করে ফ্ল্যাট আছে। প্রতিটি ফ্ল্যাটে তিনটি কক্ষ, একটি শৌচাগার ও একটি রান্নাঘর। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন ৫৬২ বর্গফুট। আরও এক মাসের মধ্যেও এসব ভবনের কাজ শেষ হবে না। আমরা ছোট মানুষ এর বেশি কিছু বলতে পারি না।’

আবাসন প্রকল্পের আশপাশে বসবাস করে ৮০০ পরিচ্ছন্নতা কর্মীর পরিবার। আধাপাকা ভবন ও টিনের ঘরে তারা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে থাকেন। একটি ঘর থেকে আরেকটি ঘরের মধ্যে কোনো ফাঁকা জায়গা নেই। ঘরের ভেতরে ছোট ছোট কক্ষ। দুই-তিনটি ঘর পরপর একটি করে নলকূপ আছে। অনেকেই ঘরের সামনে মাটির চুলায় লাকড়ি দিয়ে রান্না করছে। তবে এখানের পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর।

আবাসন প্রকল্পের পাশে পরিবার নিয়ে থাকেন ডিএনসিসির পরিচ্ছন্নতাকর্মী মো. জহিরুল। তিনি বলেন, ‘শুনেছি এই মাসের ১৫ তারিখে ভবন উদ্বোধন করা হবে। কিন্তু কিছুতো দেখছি না। তাড়াতাড়ি উদ্বোধন করে আমাদের ফ্ল্যাটে থাকার জায়গা দিলে বেশ ভালো হতো।’

জহিরুলের মতো একই মন্তব্য করেন আরেকজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। নতুন ভবনে ওঠার জন্য তিনিও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে প্রায় ৮০০-এর বেশি পরিচ্ছন্নতা কর্মী টিনের ঘরে কোনো রকম বসবাস করছি। ঘুম ভাঙলেই আমরা এই উঁচু ভবনগুলো দেখি। এখন শুধু অপেক্ষা করছি, কবে উঠবো।’

গাবতলী সিটি পল্লী আবাসন প্রকল্পের পাশের এলাকায় জরাজীর্ণ টিনের ঘরে বসবাস করছেন পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
গাবতলী সিটি পল্লী আবাসন প্রকল্পের পাশের এলাকায় জরাজীর্ণ টিনের ঘরে বসবাস করছেন পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

গাবতলী সিটি পল্লী এলাকার বাসিন্দা সানজিদা বলেন, ‘আমার স্বামী সিটি করপোরেশনের একজন পরিচ্ছন্নতা কর্মী। আমরা সেই কবে থেকে শুনতেছি ভবনগুলো উদ্বোধন করা হবে। কিন্তু কাজ শেষ হয় না। করোনার সময় অনেকদিন কাজ বন্ধ ছিল। পরে আবার সরকার পরিবর্তন হলে বেশকিছু দিন কাজ বন্ধ ছিল। এখন শুনতেছি, খুব শিগগিরই নতুন ভবনে ওঠার ব্যবস্থা হবে। সেখানে ওঠতে পারলে অনেক ভালো। আমাদের ঘরগুলো জরাজীর্ণ হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলেই ঘরে পানি পড়ে। বেশি রোদ হলে গরমে ঘরে টেকা যায় না। বাচ্চাদের বেশি কষ্ট হয়।’

বিদ্যুৎ-সংযোগের জন্য আটকে আছে ফ্ল্যাট হস্তান্তর

ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসের প্রথম অথবা দ্বিতীয় সপ্তাহে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিদ্যুৎ-সংযোগসহ অল্পকিছু কাজ বাকি থাকায় তা আর সম্ভব হচ্ছে না।

সময়সীমা শেষ হওয়ার পরেও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে না কেন-এমন প্রশ্নের জবাবে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ডিএনসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, বিদ্যুৎ-সংযোগের কাজ শেষ না হওয়ায় পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, বিদ্যুৎ-সংযোগের প্রক্রিয়া প্রায় শেষ হয়েছে এবং প্রতি কিলোওয়াট লোডের জন্য নির্ধারিত অর্থও জমা দেওয়া হয়েছে। এখন শুধু সংযোগ দেওয়ার বিষয়টি বাকি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পেরেছেন, খুব শিগগিরই সংযোগ দেওয়া হতে পারে।

ফ্ল্যাট বরাদ্দের তালিকা

ফ্ল্যাট বরাদ্দের বিষয়ে পিডি মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পের দায়িত্ব তাদের ছিল। কিন্তু ফ্ল্যাট কাকে দেওয়া হবে, কারা সেখানে থাকবেন এবং পুরো বিষয়টি কারা পরিচালনা করবেন-সেসব দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তাদের। প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তার অধীনে এ বিষয়ে নীতিমালা করা হয়েছে। সেই নীতিমালা অনুযায়ী ৭৮৪টি ফ্ল্যাট যারা পাবেন তাদের তালিকা করা হচ্ছে।

প্রকল্পের কাজ ৯ বছরেও শেষ না হওয়ার কারণ

এ বিষয়ে পিডি মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, করোনা মহামারির সময় প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি বন্ধ ছিল এবং তখন বরাদ্দও বন্ধ হয়ে যায়। পরে প্রকল্পটি শেষ করার দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়। প্রয়োজনীয় সংশোধন ও অর্থের ব্যবস্থা করতে মন্ত্রণালয়ে যেতে হয়েছে। প্রকল্পের প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করতে এসব প্রশাসনিক ও অর্থসংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় সময় লেগেছে।

ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, ৭৮৪টি ফ্ল্যাটের পাশাপাশি এই প্রকল্পের অধীনে ১৭টি লিফট, বিদ্যুতের দুটি সাবস্টেশন, জেনারেটরসহ প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম স্থাপন করাসহ ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের শতভাগ কাজ শেষ করা হয়েছে।

পিডি রফিকুল ইসলাম জানান, এই প্রকল্পটি তার কাছে একটি স্মরণীয় কাজ। কারণ এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা ও নগরের রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দায়িত্বে থাকা মানুষগুলোর স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা হচ্ছে।

রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কথা বিবেচনা করে লিফটের গুণগত মানের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কম হয় এবং ঘন ঘন লিফট মেরামতের প্রয়োজন না পড়ে।