শিরোনাম

জবিতে হামলার নেপথ্যে কি টেন্ডার দ্বন্দ্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
জবিতে হামলার নেপথ্যে কি টেন্ডার দ্বন্দ্ব
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) দ্বিতীয় ক্যাম্পাস প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন পদ্ধতি ও টেন্ডার প্রক্রিয়া ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের দ্বিতীয় ধাপের কাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের দাবি এবং অস্থায়ী আবাসনের টেন্ডারকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগের পর টেন্ডার-স্বার্থের অভিযোগ সামনে এসেছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) অভিযোগ করেছে, অস্থায়ী আবাসনের টেন্ডারকে কেন্দ্র করেই এ হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে জবি ছাত্রদল।

গত মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইউজিসি চেয়ারম্যান ড. মামুন আহমেদ। এসময় দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর, ৭ একর জমিতে দ্রুত অস্থায়ী আবাসন নির্মাণ এবং মেডিকেল সেন্টার উন্নয়নের দাবিসহ প্ল্যাকার্ড নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশের চেষ্টা করেন জকসু, ইনকিলাব মঞ্চ, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের নেতাকর্মীরা। অভিযোগ রয়েছে, তাদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। পরে ক্যাম্পাসে অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে হামলার ঘটনা ঘটে।

হামলার কারণ হিসেবে সামনে আসে দ্বিতীয় ক্যাম্পাস প্রকল্প ও স্থায়ী আবাসনের টেন্ডার ইস্যু। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, দ্বিতীয় ধাপের নির্মাণকাজ সেনাবাহিনীর পরিবর্তে বেসরকারি ঠিকাদারের মাধ্যমে বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নেওয়া হয়েছে। এতে বিপুল অর্থের প্রকল্পে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হবে।

জবিতে হামলার নেপথ্যে কি টেন্ডার দ্বন্দ্ব
কেরানীগঞ্জে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাসে প্রথম ধাপের কাজ চলছে

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রাথমিকভাবে ১২টি প্রতিষ্ঠানকে বাছাই করা হয়েছে। পরবর্তী ধাপে প্রশাসন একটি মূল্যায়ন কমিটির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা যাচাই করবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্নে সক্ষম প্রতিষ্ঠানকেই কার্যাদেশ দেওয়া হবে।

এদিকে, কেরানীগঞ্জে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রায় ৭ একর জমিতে ১ হাজার ৬০০ শিক্ষার্থীর জন্য অস্থায়ী আবাসনের পরিকল্পনা ছিল। এ প্রকল্পের জন্য সরকার ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। কিন্তু আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি, অস্থায়ী আবাসনের পরিবর্তে মাত্র ৪০০ শিক্ষার্থীর জন্য ১০ তলা স্থায়ী ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের ভাষ্য, এতে আবাসন সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান হবে না; বরং নতুন করে নির্মাণকাজের টেন্ডারকে কেন্দ্র করে স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর সুবিধা তৈরি হবে।

দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের প্রথম ধাপের কাজ বর্তমানে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে চলমান। তবে দ্বিতীয় ধাপের কাজ সেনাবাহিনীর কাছে না দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে ছাত্রদল– এমন অভিযোগ তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। তাদের দাবি, এই অবস্থানের পেছনে টেন্ডার প্রক্রিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা রয়েছে।

জকসু ভিপি রিয়াজুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, আমাদের দাবি হলো দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের দ্বিতীয় ধাপের কাজ সেনাবাহিনীর কাছে দেওয়া, যাতে লুটপাট না হয়। শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসনে বরাদ্দ দেওয়া ২০ কোটি টাকা যথাযথভাবে ব্যবহার না করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একতরফাভাবে ১০ তলা ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই অর্থ দিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যেই প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিল। কিন্তু প্রশাসন সেই উদ্যোগ না নিয়ে প্রায় দুই মাস ধরে অর্থটি অব্যবহৃত রেখেছে। এই সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থী-বিরোধী, অপরিণামদর্শী এবং সম্ভাব্য অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টিকারী বলে বিবেচিত হবে।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীই জানে যে দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীর কাছেই আছে। তারা বর্তমানে প্রথম ধাপের কাজ করছে। আগামীকাল সেখানে গিয়ে কাজ পরিদর্শনের কথা রয়েছে আমার। এ কাজ ডিসেম্বরে শেষ হবে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল। তিনি বলেন, শিবির পরিকল্পিতভাবে একটি বিভ্রান্তিকর ন্যারেটিভ দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে ছাত্রদলকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চলছে। ছাত্রদলের আগেও এমন কোনো রেকর্ড নেই। টেন্ডার বা আর্থিক কোনো স্বার্থে ছাত্রদলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীই জানে যে দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীর কাছেই আছে। তারা বর্তমানে প্রথম ধাপের কাজ করছে। আগামীকাল সেখানে গিয়ে কাজ পরিদর্শনের কথা রয়েছে আমার। এ কাজ ডিসেম্বরে শেষ হবে। এরপর দ্বিতীয় ধাপের কাজের প্রস্তাব (প্রপোজাল) তৈরি হবে। তারপর একনেকে অর্থ বরাদ্দ হওয়ার পর দ্বিতীয় ধাপের কাজ শুরু হবে। এটি প্রায় কয়েক মাস পরের বিষয়। তাহলে এত আগে এখন কেন এ নিয়ে দাবি তোলা হচ্ছে?

তিনি বলেন, আরেকটি দাবি তোলা হয়েছে অস্থায়ী আবাসনের বিষয়ে। এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই অনুযায়ী তৎকালীন প্রশাসন একটি প্রস্তাব পাঠায়। এরপর ইউজিসি থেকে বলা হয়, যেহেতু দ্বিতীয় ক্যাম্পাসে হল নির্মাণ হচ্ছেই, তাহলে পরে এই অস্থায়ী আবাসনের কী হবে? আপনারা কি সরকারের এই ২০ কোটি টাকা নষ্ট করবেন?

উপাচার্য বলেন, এরপর তৎকালীন প্রশাসন কয়েকটি সভা করে হলের নকশা চূড়ান্ত করে ইউজিসিতে পাঠায়। পরে সেটি মন্ত্রণালয়ে যায়। কিন্তু এরপরও তারা কোনো অর্থ হাতে পায়নি। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েকবার শিক্ষামন্ত্রী ও সচিবের কাছে গিয়ে গত ২১ জুন কিছু অর্থ বরাদ্দ পাই। তবে এক ছাত্রনেতাকে দেখলাম বলতে যে, আমরা নাকি এই টাকা অনেক আগেই হাতে পেয়ে তার লভ্যাংশ নিচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, এ অভিযোগের কোনো ভিত্তিই নেই। আর এই টাকা স্থায়ী আবাসনের কোডে বরাদ্দ হয়েছে। তাই আমি বা অন্য কেউই এটিকে অস্থায়ী আবাসন খাতে ব্যয় করার কোনো এখতিয়ার রাখি না। আমি যতদিন দায়িত্বে আছি, ততদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি টাকাও অপচয় হতে দেব না।

/এফসি/