ফেসবুকে ভাইরাল ‘জাতীয় ক্রাশ’ কে এই আবু বকর?

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক
ফেসবুকে ভাইরাল ‘জাতীয় ক্রাশ’ কে এই আবু বকর?
ছবি: সিটিজেন গ্রাফিক্স

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফিড স্ক্রল করলেই একটি নির্দিষ্ট তরুণের মুখ বারবার চোখে পড়ছে। কখনো তার সুভিনয় প্রশংসা, কখনো হাসিখুশি মিম, আবার কখনো বাস্তব জীবনের জীবনসঙ্গীর সঙ্গে তার তুলনা—সব মিলিয়ে নেটদুনিয়ায় এখন আলোচনার অন্য নাম ‘আবু বকর’। পাকিস্তানি জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘দার-ই-নিজাত’ এর এই কাল্পনিক চরিত্রটি ঝড়ের গতিতে জয় করে নিয়েছে বাংলাদেশের দর্শকদের মনও।

কেউ বলছেন ‘জাতীয় ক্রাশ’, আবার কেউ কেউ রসিকতা করে বলছেন, বাস্তব জীবনে এমন মানুষ পাওয়া রীতিমতো ভাগ্যের ব্যাপার। কেবল বাংলাদেশ নয়, পাকিস্তান ও ভারতের দর্শকদের মাঝেও চরিত্রটি নিয়ে উন্মাদনা তুঙ্গে।

কিন্তু হঠাৎ কেন একটি নাটকের চরিত্র বাস্তব জীবনের মানুষের এত বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠল?

কেন এত জনপ্রিয় আবু বকর?

নাটকটিতে আবু বকর চরিত্রে অভিনয় করেছেন পাকিস্তানের পরিচিত মুখ শেহরিয়ার মুনাওয়ার সিদ্দিকী এবং জারিয়াব চরিত্রে অভিনয় করেছেন দুরে ফিশান সেলিম। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক উমেরা আহমেদের লেখায় ও সাকিব খানের পরিচালনায় নির্মিত এই ধারাবাহিকটির মূল আকর্ষণ আবু বকর ও জারিয়াবের সম্পর্কের নানা টানাপোড়েন।

দর্শকদের কাছে আবু বকরকে আলাদা করে তুলেছে তার অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। পর্দায় তাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে অত্যন্ত শান্ত, ধৈর্যশীল, দায়িত্বশীল এবং সহানুভূতিশীল একজন মানুষ হিসেবে। অন্যের ভুল সহজে ক্ষমা করে দেওয়া, পরিস্থিতি বুঝে কথা বলা এবং চরম সংকটময় মুহূর্তেও নিজের মেজাজ ও আচরণে সংযম বজায় রাখা—এই গুণগুলোই তাকে দর্শকদের কাছে আদর্শ করে তুলেছে।

নাটকটির বিভিন্ন দৃশ্য ও ক্লিপ ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণও এই ইতিবাচক আবেগ।

চরিত্রটি কি অবাস্তব?

দর্শকদের একটি পক্ষ আবু বকরকে এতটাই নিখুঁত মনে করছেন যে, বাস্তব জীবনে এমন মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ তাকে ‘অতিরিক্ত আদর্শায়িত’ চরিত্র হিসেবেও দেখছেন।

তবে এই সমালোচনার কড়া জবাব দিয়েছেন নাটকের লেখক উমেরা আহমেদ। পাল্টা প্রশ্ন রেখে তিনি বলেছেন, মানুষের ভেতরের সাধারণ মানবিক গুণগুলো—যেমন দয়া, সহমর্মিতা ও ক্ষমা—আজ কেন এত অস্বাভাবিক মনে হবে? সমাজে কি তবে এই গুণগুলোর চর্চা এতটাই কমে গেছে যে পর্দার মানুষদেরও অবাস্তব ঠেকছে?

একই কথা বলছেন অভিনেত্রী নাদিয়া আফগানও। তার মতে, আবু বকর ও তার মায়ের মতো মানুষ বাস্তবেও সচরাচর দেখা মেলে। নিজের পারিবারিক জীবনের অভিজ্ঞতা টেনে তিনি জানান, তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের মধ্যেও এমন অমায়িক আচরণের প্রতিফলন রয়েছে।

আবু বকরেরও রয়েছে দুর্বলতা

দর্শকদের চোখে চরিত্রটি যতই নিখুঁত হোক না কেন, খোদ অভিনেতা শেহরিয়ার মুনাওয়ার মনে করিয়ে দিয়েছেন যে আবু বকর ত্রুটিমুক্ত নয়। বিবিসি এশিয়ান নেটওয়ার্কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, আবু বকর মূলত একজন ‘পিপল প্লিজার’। অন্যকে খুশি রাখতে গিয়ে সে প্রায়ই নিজের ইচ্ছা ও চাহিদাকে কোণঠাসা করে ফেলে, এমনকি কাউকে ‘না’ বলতে তার তীব্র জড়তা কাজ করে।

পাশাপাশি তার মধ্যে রয়েছে ‘সেভিয়ার কমপ্লেক্স’ বা অন্যকে রক্ষা করার অতিরিক্ত মানসিক তাগিদ। শেহরিয়ারের মতে, চরিত্রটির এই মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো তার পারিবারিক শিক্ষা ও বেড়ে ওঠার ফল।

ঢাকাই তারকার মন্তব্য ও জল্পনা

বাংলাদেশের দর্শকদের এমন আবেগের বিষয়টি নজর এড়ায়নি দেশের তারকাদেরও। সম্প্রতি উপস্থাপক ও অভিনেতা শাহরিয়ার নাজিম জয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবু বকরকে নিয়ে একটি ভিন্নধর্মী মন্তব্য করেন।

তিনি লেখেন, “পাকিস্তানের নাটকের জনপ্রিয় চরিত্র আবু বকরকে ঢাকার রাস্তায় ছেড়ে দিলে তার ধৈর্য ও ভালো হওয়ার আসল পরীক্ষা হয়ে যেত। ক্যামেরার সামনে তো ভালোর অভিনয় করাই যায়, কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।” জয়ের এই মন্তব্যটি নিয়ে নেটদুনিয়ায় শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। ঢাকার রিকশা, যানজট ও দৈনন্দিন যান্ত্রিক জীবনের সঙ্গে আবু বকরের অটল ধৈর্যের এই তুলনা অনেকেই বেশ উপভোগ করেছেন।

আবু বকর আজ কেবল একটি নাটকের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি হয়ে উঠেছে সম্পর্ক, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং জীবনসঙ্গী নিয়ে মানুষের সুপ্ত প্রত্যাশার এক নতুন প্রতীক। তবে দিন শেষে প্রশ্ন থেকেই যায়—আবু বকরের মতো সহনশীল মানুষ কি সত্যিই সমাজে বিরল, নাকি যান্ত্রিকতার ভিড়ে আমরা চারপাশের মানুষের ভালো দিকগুলো দেখতে ভুলেই গেছি?

/এবি/