বোয়িংয়ের পর কেন এয়ারবাস কিনছে বিমান, চুক্তি বুধবার

বোয়িংয়ের পর কেন এয়ারবাস কিনছে বিমান, চুক্তি বুধবার
এয়ারবাসের এ-৩৫০ মডেলের একটি উড়োজাহাজ

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করার প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগোচ্ছে। ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে চুক্তি করতে যাচ্ছে সরকার। দীর্ঘ আলোচনা ও দর-কষাকষির পর এ চুক্তির জন্য দুই পক্ষের মধ্যে প্রধান বিষয়গুলোতে সমঝোতা হয়েছে।

রাজধানীর একটি হোটেলে বুধবার (৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে। বিমানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বহর সম্প্রসারণের পাশাপাশি বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের ভবিষ্যতের জন্যও এ চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় চারটি এ৩৫০-৯০০ ওয়াইডবডি এবং ছয়টি এ৩২১নিও ন্যারোবডি উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এসব উড়োজাহাজ কিনতে মোট কত অর্থ ব্যয় হবে, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, এয়ারবাসের কাছ থেকে কেনার প্যাকেজটির মূল্য ২০০ কোটি ডলারের বেশি হতে পারে।

ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস
ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস

অনেক আগে থেকেই এয়ারবাসের আলোচনা

এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ কেনার আলোচনা অবশ্য নতুন নয়। আগের বিগত সরকারের সময় থেকেই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ যুক্ত করার আলোচনা চলছিল। সে সময়ও এয়ারবাসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক দফায় আলোচনা ও মূল্যায়ন হয়েছে।

তবে শেষ পর্যন্ত সেই আলোচনা চুক্তিতে রূপ নেয়নি। বিমান কর্তৃপক্ষ নতুন উড়োজাহাজ কেনার ক্ষেত্রে কোন ধরনের বিমান প্রয়োজন, কোন রুটে তা ব্যবহার করা হবে এবং আর্থিকভাবে কোন প্রস্তাব বেশি সুবিধাজনক, এসব বিষয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়ে আসছিল।

এর মধ্যে এয়ারবাসের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু উড়োজাহাজ কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশে উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও ওভারহল কেন্দ্র বা এমআরও স্থাপন এবং দক্ষ জনবল তৈরির ক্ষেত্রেও ইউরোপের সহযোগিতা নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে।

বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তির পর গতি বাড়ে

এয়ারবাসের সঙ্গে আলোচনার মাঝেই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িংয়ের সঙ্গে বড় ধরনের উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে। গত ৩০ এপ্রিল বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়। পরে চুক্তিতে থাকা অতিরিক্ত উড়োজাহাজ কেনার সুযোগ কাজে লাগিয়ে গত ২৩ সেপ্টেম্বর আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে চুক্তি করা হয়।

দুই দফার চুক্তি মিলিয়ে বোয়িং থেকে মোট ২৫টি উড়োজাহাজ কিনছে বিমান। এর মধ্যে ১৫টি ওয়াইডবডি এবং ১০টি ন্যারোবডি উড়োজাহাজ। সব মিলিয়ে বোয়িংয়ের সঙ্গে করা দুটি চুক্তির মূল্য প্রায় ৬৪০ কোটি ডলার।

বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তির পর এয়ারবাসের কাছ থেকেও উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়া দ্রুত এগোয়। এর মধ্যে ইউরোপের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। গত ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কেনাকে ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন।

এর এক সপ্তাহ পর, ২৯ সেপ্টেম্বর সরকার জানায়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ কেনা হবে। বিমানমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত তখন বলেছিলেন, ভূরাজনৈতিক চাপের কারণে নয়, যাত্রী চাহিদা বিবেচনায় নিয়েই এসব উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কেন একসঙ্গে বোয়িং ও এয়ারবাস

বিমানের বহরে একই সঙ্গে বোয়িং ও এয়ারবাসের উড়োজাহাজ যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও সরকারের যুক্তি হচ্ছে, বিভিন্ন ধরনের রুট ও যাত্রী চাহিদা বিবেচনায় বহরকে বড় করা দরকার।

এয়ারবাসের চারটি এ৩৫০-৯০০ মূলত দূরপাল্লার রুটে ব্যবহার করা যাবে। আর ছয়টি এ৩২১নিও তুলনামূলক ছোট ও আঞ্চলিক রুটে ব্যবহারের উপযোগী। ফলে নতুন উড়োজাহাজগুলো দিয়ে বিমানের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

বিমানমন্ত্রী এরই মধ্যে বলেছেন, এয়ারবাসের উড়োজাহাজগুলোর সরবরাহ ২০৩০ সালের আগেই শুরু হওয়া দরকার। কারণ নতুন উড়োজাহাজের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হলে বর্তমান বহর দিয়ে বাড়তে থাকা যাত্রী চাহিদা সামাল দেওয়া কঠিন হবে।

অন্যদিকে বোয়িংয়ের প্রথম উড়োজাহাজটি পাওয়ার কথা ২০৩১ সালের নভেম্বরে। বিমান কর্তৃপক্ষ এর আগেই অন্তত একটি উড়োজাহাজ পাওয়ার চেষ্টা করছে।

৩৫টি নতুন উড়োজাহাজ, সামনে বড় বহর

বোয়িং ও এয়ারবাসের সঙ্গে পরিকল্পিত চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বিমানের বহরে নতুন করে মোট ৩৫টি উড়োজাহাজ যুক্ত হবে। এর মধ্যে বোয়িংয়ের ২৫টি এবং এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ।

এটি হবে বাংলাদেশ বিমানের ইতিহাসে অন্যতম বড় বহর সম্প্রসারণ কার্যক্রম। সরকারের লক্ষ্য শুধু উড়োজাহাজের সংখ্যা বাড়ানো নয়, একই সঙ্গে দূরপাল্লার নতুন রুট চালু করা, আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং বাংলাদেশকে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলা।

/এমআর/