সম্ভাব্য মার্কিন হামলা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডা

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
সম্ভাব্য মার্কিন হামলা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডা
কানাডার সেনা বাহিনীর সদস্যরা

ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর অকল্পনীয় পরিস্থিতি সামলানোর প্রস্তুতি নিতে হয়েছে কানাডাকে। গত সপ্তাহে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন দেশটির প্রধান মন্ত্রী মার্ক কার্নি। যদিও একে খুবই কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং ক্ষীণ সম্ভাবনার বিষয় বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। নিউইয়র্ক টাইমসকে কার্নি জানিয়েছেন, পরিবর্তিত এই প্রেক্ষাপটে সব সম্ভাবনাই মাথায় রাখা উচিত। এটিকে শুধু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি

ট্রাম্পের বিশ্বব্যাপী শুল্ক আরোপের হুমকি এবং কানাডাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর ইচ্ছা কানাডিয়ানদের মনে বেশ ভালোমতোই ধাক্কা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট অবশ্য গত বছরই বলেছিলেন, কানাডার ওপর শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা ‘অত্যন্ত কম’। এর পরিবর্তে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য তারা অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখবে।

হোয়াইট হাউস সম্প্রতি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, কানাডার জনগণকে রক্ষার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অন্য যে কারও চেয়ে বেশি কাজ করেছেন।’

সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সত্যিই হামলার ঝুঁকি খুবই কম। কারণ দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষামূলক সম্পর্ক বেশ গভীর ও বহুমুখী। তবে এর পরও সাধারণ কানাডিয়ানদের ভীতি দূর হচ্ছে না। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভেনিজুয়েলায় মার্কিন অভিযানে নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করার ঘটনার পর এক জরিপে দেখা গেছে, ৩০ শতাংশেরও বেশি কানাডিয়ান বিশ্বাস করেন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সামরিক আগ্রাসনের ঝুঁকি রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেনা সদস্যরা
যুক্তরাষ্ট্রের সেনা সদস্যরা

এ আগ্রাসনের সম্ভাবনা কম কেন

রয়্যাল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্সের সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল ক্রিস্টোফার কোটস মনে করেন, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের বিষয়টি কেবল জটিলই নয়, বরং তা কল্পনা করাও অসম্ভব।

তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘আমি আমার পুরো কর্মজীবন সামরিক অভিযানে জড়িত ছিলাম, এবং আমরা কখনও কল্পনা করিনি যে মার্কিন ভূখণ্ড থেকে কোনো সামরিক হামলা হতে পারে’।

ন্যাটো মিশনের দায়িত্ব পালনকারী কোটস জানান, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবেই নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আসছে। তারা উভয়ই ন্যাটোর সদস্য, যার নিয়ম অনুযায়ী এক দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দেশ সহায়তায় এগিয়ে আসে। এ ছাড়া উত্তর আমেরিকান মহাকাশ প্রতিরক্ষা কমান্ড (নোরাড)-এর অধীনে যৌথভাবে আর্কটিক অঞ্চলের প্রতিরক্ষা এবং নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের কাজটিও তারা একসঙ্গে করে থাকে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মার্ক কার্নি
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মার্ক কার্নি

সবসময় বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল না

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গত শতাব্দীর শেষভাগ থেকে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের পরম মিত্র হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিকভাবে দুই দেশ এতটাই একীভূত হয়ে পড়ে যে তাদের চিরকালের বন্ধু ভাবাই স্বাভাবিক। তবে সম্পর্ক সবসময় এমন বন্ধুত্বের ছিল না।

কানাডিয়ান ওয়ার মিউজিয়ামের গবেষক টিম ফোরান বলেন, অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে আমেরিকান সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাাঁড়ানোই ছিল কানাডার নিজস্ব স্বত্বা টিকিয়ে রাখার মূল চাবিকাঠি। যুক্তরাষ্ট্রের ভয়কে কানাডার রাজনৈতিক প্রকল্পের ভিত্তি হিসিবে উল্লেখ করেন তিনি।

আমেরিকায় ব্রিটিশ উপনিবেশগুলো বিদ্রোহ করার পর, উত্তর আমেরিকার যে অংশটি ব্রিটিশদের প্রতি অনুগত থেকে যায়, সেখান থেকেই জন্ম নেয় আজকের কানাডা। এর আগে ১৭৭৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোতে হামলার চেষ্টা চালিয়ে মন্ট্রিয়ল দখল করে নেয় এবং কুইবেক শহরও প্রায় গ্রাস করে ফেলেছিল। ১৮১২ সালের যুদ্ধেও মার্কিন বাহিনী কানাডার বিভিন্ন এলাকায় বারবার আক্রমণ চালায়। এর প্রতিশোধ হিসেবে ব্রিটিশ সৈন্যরা হোয়াইট হাউস পুড়িয়ে দেয়। এটি ইতিহাসের এক আলোচিত অধ্যায় হয়ে আছে।

কানাডিয়ান ওয়ার মিউজিয়ামের গবেষক এবং বিংশ শতাব্দীর কানাডা নিয়ে কাজ করা অ্যান্ড্রু বার্চের মতে, যুদ্ধ সে সময় অসম্ভব মনে হলেও কানাডিয়ানরা সতর্ক থাকতে চেয়েছিল। তিনি বলেন, নানা ধরনের পরিস্থিতি কল্পনা করাই সেনাবাহিনীর কাজ।

বাস্তবে কেমন হতে পারে সম্ভাব্য মার্কিন আক্রমণ

মার্কিন আগ্রাসনের আশঙ্কা যতই ক্ষীণ হোক না কেন, কানেকটিকাটের নিউ হ্যাভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ শ্মিট মনে করেন, কানাডিয়ানদের প্রস্তুতি নেওয়ার ঘটনাটিই প্রমাণ করে যে বিশ্ব রাজনীতিতে হিসাব-নিকাশ কতটা ওলটপালট হয়ে গেছে। তার মতে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কানাডা কতটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখবে, তা নিয়ে দেশটির নেতাদের এখন গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে। কারণ এ অংশীদারিত্বের সুবাদে অনেক সংবেদনশীল তথ্য আমেরিকার হাতে চলে যায়, যা ভবিষ্যতে কানাডার ক্ষতির কারণ হতে পারে।

তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ হয়তো ট্রাম্পের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ করার মন্তব্যকে রসিকতা বা অবহেলায় উড়িয়ে দিচ্ছে, কিন্তু কানাডার সাধারণ মানুষ বিষয়টিকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে এবং নিজেদের সুরক্ষায় তারা প্রস্তুত থাকতে চাইছে।

যদি কখনো এমন যুদ্ধ লেগেই যায়, তবে তার রূপ কেমন হবে? চলতি বছরের শুরুতে ‘গ্লোব অ্যান্ড মেইল’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে কানাডার সামরিক বাহিনীর একটি তাত্ত্বিক মডেলের কথা প্রকাশ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, মার্কিন বাহিনী আক্রমণ করলে বড় জোর এক সপ্তাহের মধ্যে কানাডার মূল কৌশলগত অবস্থানগুলো দখল হয়ে যেতে পারে। সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকায় কানাডিয়ান বাহিনীকে তখন বাধ্য হয়ে গেরিলা যুদ্ধের পথ বেছে নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে ব্রিটেন বা ফ্রান্সের মতো মিত্র দেশগুলোর কাছে সামরিক সাহায্যের আবেদন জানাবে অটোয়া।

লেফটেন্যান্ট জেনারেল কোটস মনে করেন, এ মডেলিংগুলো যুদ্ধের প্রাথমিক ও হালকা ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তিনি মনে করেন, ন্যাটোর অন্য মিত্রদের মতো সরাসরি স্থল হামলার মোকাবিলা করার মতো কোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি বা পরিকল্পনা কানাডার ছিল না। তবে বর্তমানে সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। সম্প্রতি কানাডার প্রতিরক্ষা প্রধানের এক ঘোষণায় বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। তিনি প্রায় তিন লাখ নাগরিককে সামরিক বাহিনীতে যুক্ত করার পরিকল্পনা করেছেন।

মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করলে, কানাডার মতো দেশে আক্রমণ চালানো খুব একটা সহজ হবে না। ম্যাথিউ শ্মিটের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও নিজ দেশের মানুষের কাছ থেকেই যুদ্ধের সমর্থন আদায় করা কঠিন হবে।

তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা, কানাডায় আগ্রাসন চালানোর নির্দেশ দেওয়া হলে বিপুল সংখ্যক মার্কিন কর্মকর্তা পদত্যাগ করবেন। তারা এটিকে একটি বেআইনি ও অনৈতিক আদেশ হিসেবেই গণ্য করবেন।’

আমেরিকান ও কানাডিয়ান সৈন্যরা যেহেতু নিয়মিত কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রশিক্ষণ নেয়, তাই তাদের মধ্যে একধরনের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে। তবে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটলে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো কানাডার তেল ও খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দুর্বল করার দিকেই বেশি নজর দেবে।

তিনি বলেন, ‘তখন হয়তো এমন এক ধরনের অভিযানের দৃশ্য দেখা যাবে, যা ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল।’ আমেরিকার সামরিক শক্তি বেশি, তবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কানাডার সৈন্যরাও যে কড়া প্রতিরোধ গড়তে সক্ষম বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সূত্র: বিবিসি

/এমএকে/