অ্যালুমিনিয়ামের পাতিল থেকে খাবারে মিশছে বিষাক্ত সিসা: গবেষণা

অ্যালুমিনিয়ামের পাতিল থেকে খাবারে মিশছে বিষাক্ত সিসা: গবেষণা
নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্র (হাঁড়ি-পাতিল) থেকে খাবারে ক্ষতিকর সিসা মিশতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা। বিশেষ করে নতুন পাত্র প্রথম কয়েকবার ব্যবহারের সময় খাবারে বেশি মাত্রায় সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ গবেষণায় এ উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এক বিজ্ঞপ্তিতে গবেষণার তথ্য জানিয়েছে আইসিডিডিআরবি।
সিসা একটি মারাত্মক বিষাক্ত ধাতু, যা শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিসাধন করে। গবেষকরা এই স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে নিরাপদ রান্নার পাত্র উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং পরিবার পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতা বাড়ানোর ওপর তাগিদ দিয়েছেন।
গবেষণাটি সম্প্রতি নেচার পাবলিশিং গ্রুপের ‘জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজি’-তে প্রকাশিত হয়েছে। এতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র থেকে খাবারে কী পরিমাণে সিসা মিশছে, তা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি খাবারের অম্লতা (অ্যাসিডিটি), পাত্র মাজার ধরণ ও রান্নার পদ্ধতির প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হয়।
গবেষকরা দেশীয় বিভিন্ন পরিবার থেকে ব্যবহৃত ৭টি পুরোনো এবং বাজার থেকে কেনা ২০টি নতুন পাত্র নিয়ে পরীক্ষা চালান। প্রথমে পাত্রগুলোর ধাতুতে সিসার মাত্রা যাচাই করা হয়। এরপর সেগুলোতে সাদা ভাত ও খিচুড়ি রান্না করে বিশেষ পরীক্ষাগারে খাদ্য ও পানিতে সিসার পরিমাণ পরিমাপ করা হয়।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় হিউম্যান অ্যান্ড প্ল্যানেটারি হেলথের ‘প্রজেক্ট আনলেডেড’-এর পরিচালক ড. জেনা ফরসিথ বলেন, আমরা রান্নার পাত্র এবং তাতে রান্না করা খাবার– উভয় ক্ষেত্রেই সিসার মাত্রা পরীক্ষা করেছি। এর মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে, প্রতিদিনের রান্নায় ব্যবহৃত একটি সাধারণ পাত্র কীভাবে মানুষের শরীরে সিসা প্রবেশের কারণ হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষা করা প্রতিটি পাত্র থেকেই খাবারে সিসা নির্গত হয়েছে– তা পাত্রটি নতুন হোক বা পুরোনো। নতুন পাত্রে প্রথমবার রান্নার সময় প্রতি কেজি সাদা ভাতে সর্বোচ্চ ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম এবং খিচুড়িতে সর্বোচ্চ ৪২০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত সিসা শনাক্ত হয়েছে। অথচ শিশু ও ছোট বাচ্চাদের খাবারের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) নির্ধারিত নিরাপদ সীমা হলো প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ ১০ মাইক্রোগ্রাম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বারবার ব্যবহারে খাবারে সিসার মাত্রা কিছুটা কমলেও তা কখনোই নিরাপদ মাত্রার নিচে নামে না। এমনকি পূর্বব্যবহৃত সাতটি পাত্রের মধ্যে ছয়টিতে রান্না করা ভাতেও সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
রান্নার পাত্র কীভাবে পরিষ্কার করা হচ্ছে, তার ওপরও সিসা মিশে যাওয়ার মাত্রা নির্ভর করে। গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন পাত্র স্টিলের তারের মাজুনি দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করলে, না ঘষে ব্যবহারের তুলনায় খাবারে প্রায় ৫ গুণ বেশি সিসা মেশে। আবার রান্নার সময় ধাতব খুন্তি দিয়ে নাড়াচাড়া করলেও সিসা নির্গমনের পরিমাণ বেড়ে যায়।
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের শিশুরা সাধারণত প্রতিদিন যে পরিমাণ ভাত খায়, তা বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, এ ধরনের পাত্রে রান্না করা খাবার খেলে একটি শিশু এফডিএ নির্ধারিত দৈনিক সহনীয় সীমার চেয়ে ৫ গুণেরও বেশি সিসা গ্রহণ করতে পারে।
বাংলাদেশে পুরোনো অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র বদলে নতুন পাত্র নেওয়া কিংবা পুরোনো কাপড়ের বিনিময়ে হাঁড়ি-পাতিল নেওয়ার প্রচলন রয়েছে। গবেষণাটিতে সরাসরি এই বিনিময়প্রথা নিয়ে কাজ না হলেও ফলাফল বলছে, পাত্রটি নতুন বা চকচকে হলেই তা নিরাপদ ভাবার অবকাশ নেই। মূলত দেশে স্থানীয় পর্যায়ের অনেক পাত্র পুরোনো স্ক্র্যাপ বা ভাঙারি ধাতু গলিয়ে তৈরি করা হয়। এসব কাঁচামাল মানসম্মতভাবে পরীক্ষা না করায় চূড়ান্ত পাত্রে সিসা থেকে যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, রক্তে সিসার এমন কোনো সহনীয় মাত্রা নেই, যাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা চলে। সিসার সংস্পর্শ শিশুদের আচরণ ও শেখার ক্ষমতার ওপর অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনে।
গবেষকদের অভিমত, এ স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানোর দায় কেবল সাধারণ পরিবারের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। বাংলাদেশে সিসা দূষণের নানা উৎসের মধ্যে অতীতে হলুদে সিসা মেশানোর প্রমাণ মিলেছিল। এখন রান্নার পাত্র থেকেও মানুষ সিসার শিকার হতে পারে, ফলে এটিকেও জাতীয় গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-কে কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। গবেষকদের মতে, রান্নার নিরাপদ পাত্র নিশ্চিত করতে বিদ্যমান মান ও নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করা, স্ক্র্যাপ ধাতু পরীক্ষা এবং উৎপাদিত পাত্র থেকে রাসায়নিক নিঃসরণ হচ্ছে কি না তা কঠোরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে ক্ষুদ্র উৎপাদকদের নিরাপদ কাঁচামাল সরবরাহ ও মান পরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
উল্লেখ্য, এটি পরীক্ষাগারে পরিচালিত একটি সীমিত পরিসরের গবেষণা। এতে শিশুদের শরীরে সিসা প্রবেশের যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, তা শিশুদের সরাসরি শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে নয়, বরং খাদ্য গ্রহণের একটি গাণিতিক মডেলের ভিত্তিতে প্রাক্কলন করা হয়েছে। তাই বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র ও রান্নার দৈনন্দিন অভ্যাস নিয়ে আরও বিশদ গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।

বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্র (হাঁড়ি-পাতিল) থেকে খাবারে ক্ষতিকর সিসা মিশতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা। বিশেষ করে নতুন পাত্র প্রথম কয়েকবার ব্যবহারের সময় খাবারে বেশি মাত্রায় সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ গবেষণায় এ উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এক বিজ্ঞপ্তিতে গবেষণার তথ্য জানিয়েছে আইসিডিডিআরবি।
সিসা একটি মারাত্মক বিষাক্ত ধাতু, যা শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিসাধন করে। গবেষকরা এই স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে নিরাপদ রান্নার পাত্র উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং পরিবার পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতা বাড়ানোর ওপর তাগিদ দিয়েছেন।
গবেষণাটি সম্প্রতি নেচার পাবলিশিং গ্রুপের ‘জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজি’-তে প্রকাশিত হয়েছে। এতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র থেকে খাবারে কী পরিমাণে সিসা মিশছে, তা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি খাবারের অম্লতা (অ্যাসিডিটি), পাত্র মাজার ধরণ ও রান্নার পদ্ধতির প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হয়।
গবেষকরা দেশীয় বিভিন্ন পরিবার থেকে ব্যবহৃত ৭টি পুরোনো এবং বাজার থেকে কেনা ২০টি নতুন পাত্র নিয়ে পরীক্ষা চালান। প্রথমে পাত্রগুলোর ধাতুতে সিসার মাত্রা যাচাই করা হয়। এরপর সেগুলোতে সাদা ভাত ও খিচুড়ি রান্না করে বিশেষ পরীক্ষাগারে খাদ্য ও পানিতে সিসার পরিমাণ পরিমাপ করা হয়।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় হিউম্যান অ্যান্ড প্ল্যানেটারি হেলথের ‘প্রজেক্ট আনলেডেড’-এর পরিচালক ড. জেনা ফরসিথ বলেন, আমরা রান্নার পাত্র এবং তাতে রান্না করা খাবার– উভয় ক্ষেত্রেই সিসার মাত্রা পরীক্ষা করেছি। এর মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে, প্রতিদিনের রান্নায় ব্যবহৃত একটি সাধারণ পাত্র কীভাবে মানুষের শরীরে সিসা প্রবেশের কারণ হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষা করা প্রতিটি পাত্র থেকেই খাবারে সিসা নির্গত হয়েছে– তা পাত্রটি নতুন হোক বা পুরোনো। নতুন পাত্রে প্রথমবার রান্নার সময় প্রতি কেজি সাদা ভাতে সর্বোচ্চ ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম এবং খিচুড়িতে সর্বোচ্চ ৪২০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত সিসা শনাক্ত হয়েছে। অথচ শিশু ও ছোট বাচ্চাদের খাবারের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) নির্ধারিত নিরাপদ সীমা হলো প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ ১০ মাইক্রোগ্রাম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বারবার ব্যবহারে খাবারে সিসার মাত্রা কিছুটা কমলেও তা কখনোই নিরাপদ মাত্রার নিচে নামে না। এমনকি পূর্বব্যবহৃত সাতটি পাত্রের মধ্যে ছয়টিতে রান্না করা ভাতেও সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
রান্নার পাত্র কীভাবে পরিষ্কার করা হচ্ছে, তার ওপরও সিসা মিশে যাওয়ার মাত্রা নির্ভর করে। গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন পাত্র স্টিলের তারের মাজুনি দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করলে, না ঘষে ব্যবহারের তুলনায় খাবারে প্রায় ৫ গুণ বেশি সিসা মেশে। আবার রান্নার সময় ধাতব খুন্তি দিয়ে নাড়াচাড়া করলেও সিসা নির্গমনের পরিমাণ বেড়ে যায়।
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের শিশুরা সাধারণত প্রতিদিন যে পরিমাণ ভাত খায়, তা বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, এ ধরনের পাত্রে রান্না করা খাবার খেলে একটি শিশু এফডিএ নির্ধারিত দৈনিক সহনীয় সীমার চেয়ে ৫ গুণেরও বেশি সিসা গ্রহণ করতে পারে।
বাংলাদেশে পুরোনো অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র বদলে নতুন পাত্র নেওয়া কিংবা পুরোনো কাপড়ের বিনিময়ে হাঁড়ি-পাতিল নেওয়ার প্রচলন রয়েছে। গবেষণাটিতে সরাসরি এই বিনিময়প্রথা নিয়ে কাজ না হলেও ফলাফল বলছে, পাত্রটি নতুন বা চকচকে হলেই তা নিরাপদ ভাবার অবকাশ নেই। মূলত দেশে স্থানীয় পর্যায়ের অনেক পাত্র পুরোনো স্ক্র্যাপ বা ভাঙারি ধাতু গলিয়ে তৈরি করা হয়। এসব কাঁচামাল মানসম্মতভাবে পরীক্ষা না করায় চূড়ান্ত পাত্রে সিসা থেকে যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, রক্তে সিসার এমন কোনো সহনীয় মাত্রা নেই, যাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা চলে। সিসার সংস্পর্শ শিশুদের আচরণ ও শেখার ক্ষমতার ওপর অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনে।
গবেষকদের অভিমত, এ স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানোর দায় কেবল সাধারণ পরিবারের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। বাংলাদেশে সিসা দূষণের নানা উৎসের মধ্যে অতীতে হলুদে সিসা মেশানোর প্রমাণ মিলেছিল। এখন রান্নার পাত্র থেকেও মানুষ সিসার শিকার হতে পারে, ফলে এটিকেও জাতীয় গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-কে কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। গবেষকদের মতে, রান্নার নিরাপদ পাত্র নিশ্চিত করতে বিদ্যমান মান ও নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করা, স্ক্র্যাপ ধাতু পরীক্ষা এবং উৎপাদিত পাত্র থেকে রাসায়নিক নিঃসরণ হচ্ছে কি না তা কঠোরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে ক্ষুদ্র উৎপাদকদের নিরাপদ কাঁচামাল সরবরাহ ও মান পরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
উল্লেখ্য, এটি পরীক্ষাগারে পরিচালিত একটি সীমিত পরিসরের গবেষণা। এতে শিশুদের শরীরে সিসা প্রবেশের যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, তা শিশুদের সরাসরি শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে নয়, বরং খাদ্য গ্রহণের একটি গাণিতিক মডেলের ভিত্তিতে প্রাক্কলন করা হয়েছে। তাই বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র ও রান্নার দৈনন্দিন অভ্যাস নিয়ে আরও বিশদ গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।

অ্যালুমিনিয়ামের পাতিল থেকে খাবারে মিশছে বিষাক্ত সিসা: গবেষণা
নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্র (হাঁড়ি-পাতিল) থেকে খাবারে ক্ষতিকর সিসা মিশতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা। বিশেষ করে নতুন পাত্র প্রথম কয়েকবার ব্যবহারের সময় খাবারে বেশি মাত্রায় সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ গবেষণায় এ উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এক বিজ্ঞপ্তিতে গবেষণার তথ্য জানিয়েছে আইসিডিডিআরবি।
সিসা একটি মারাত্মক বিষাক্ত ধাতু, যা শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিসাধন করে। গবেষকরা এই স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে নিরাপদ রান্নার পাত্র উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং পরিবার পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতা বাড়ানোর ওপর তাগিদ দিয়েছেন।
গবেষণাটি সম্প্রতি নেচার পাবলিশিং গ্রুপের ‘জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজি’-তে প্রকাশিত হয়েছে। এতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র থেকে খাবারে কী পরিমাণে সিসা মিশছে, তা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি খাবারের অম্লতা (অ্যাসিডিটি), পাত্র মাজার ধরণ ও রান্নার পদ্ধতির প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হয়।
গবেষকরা দেশীয় বিভিন্ন পরিবার থেকে ব্যবহৃত ৭টি পুরোনো এবং বাজার থেকে কেনা ২০টি নতুন পাত্র নিয়ে পরীক্ষা চালান। প্রথমে পাত্রগুলোর ধাতুতে সিসার মাত্রা যাচাই করা হয়। এরপর সেগুলোতে সাদা ভাত ও খিচুড়ি রান্না করে বিশেষ পরীক্ষাগারে খাদ্য ও পানিতে সিসার পরিমাণ পরিমাপ করা হয়।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় হিউম্যান অ্যান্ড প্ল্যানেটারি হেলথের ‘প্রজেক্ট আনলেডেড’-এর পরিচালক ড. জেনা ফরসিথ বলেন, আমরা রান্নার পাত্র এবং তাতে রান্না করা খাবার– উভয় ক্ষেত্রেই সিসার মাত্রা পরীক্ষা করেছি। এর মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে, প্রতিদিনের রান্নায় ব্যবহৃত একটি সাধারণ পাত্র কীভাবে মানুষের শরীরে সিসা প্রবেশের কারণ হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষা করা প্রতিটি পাত্র থেকেই খাবারে সিসা নির্গত হয়েছে– তা পাত্রটি নতুন হোক বা পুরোনো। নতুন পাত্রে প্রথমবার রান্নার সময় প্রতি কেজি সাদা ভাতে সর্বোচ্চ ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম এবং খিচুড়িতে সর্বোচ্চ ৪২০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত সিসা শনাক্ত হয়েছে। অথচ শিশু ও ছোট বাচ্চাদের খাবারের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) নির্ধারিত নিরাপদ সীমা হলো প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ ১০ মাইক্রোগ্রাম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বারবার ব্যবহারে খাবারে সিসার মাত্রা কিছুটা কমলেও তা কখনোই নিরাপদ মাত্রার নিচে নামে না। এমনকি পূর্বব্যবহৃত সাতটি পাত্রের মধ্যে ছয়টিতে রান্না করা ভাতেও সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
রান্নার পাত্র কীভাবে পরিষ্কার করা হচ্ছে, তার ওপরও সিসা মিশে যাওয়ার মাত্রা নির্ভর করে। গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন পাত্র স্টিলের তারের মাজুনি দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করলে, না ঘষে ব্যবহারের তুলনায় খাবারে প্রায় ৫ গুণ বেশি সিসা মেশে। আবার রান্নার সময় ধাতব খুন্তি দিয়ে নাড়াচাড়া করলেও সিসা নির্গমনের পরিমাণ বেড়ে যায়।
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের শিশুরা সাধারণত প্রতিদিন যে পরিমাণ ভাত খায়, তা বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, এ ধরনের পাত্রে রান্না করা খাবার খেলে একটি শিশু এফডিএ নির্ধারিত দৈনিক সহনীয় সীমার চেয়ে ৫ গুণেরও বেশি সিসা গ্রহণ করতে পারে।
বাংলাদেশে পুরোনো অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র বদলে নতুন পাত্র নেওয়া কিংবা পুরোনো কাপড়ের বিনিময়ে হাঁড়ি-পাতিল নেওয়ার প্রচলন রয়েছে। গবেষণাটিতে সরাসরি এই বিনিময়প্রথা নিয়ে কাজ না হলেও ফলাফল বলছে, পাত্রটি নতুন বা চকচকে হলেই তা নিরাপদ ভাবার অবকাশ নেই। মূলত দেশে স্থানীয় পর্যায়ের অনেক পাত্র পুরোনো স্ক্র্যাপ বা ভাঙারি ধাতু গলিয়ে তৈরি করা হয়। এসব কাঁচামাল মানসম্মতভাবে পরীক্ষা না করায় চূড়ান্ত পাত্রে সিসা থেকে যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, রক্তে সিসার এমন কোনো সহনীয় মাত্রা নেই, যাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা চলে। সিসার সংস্পর্শ শিশুদের আচরণ ও শেখার ক্ষমতার ওপর অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনে।
গবেষকদের অভিমত, এ স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানোর দায় কেবল সাধারণ পরিবারের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। বাংলাদেশে সিসা দূষণের নানা উৎসের মধ্যে অতীতে হলুদে সিসা মেশানোর প্রমাণ মিলেছিল। এখন রান্নার পাত্র থেকেও মানুষ সিসার শিকার হতে পারে, ফলে এটিকেও জাতীয় গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-কে কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। গবেষকদের মতে, রান্নার নিরাপদ পাত্র নিশ্চিত করতে বিদ্যমান মান ও নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করা, স্ক্র্যাপ ধাতু পরীক্ষা এবং উৎপাদিত পাত্র থেকে রাসায়নিক নিঃসরণ হচ্ছে কি না তা কঠোরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে ক্ষুদ্র উৎপাদকদের নিরাপদ কাঁচামাল সরবরাহ ও মান পরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
উল্লেখ্য, এটি পরীক্ষাগারে পরিচালিত একটি সীমিত পরিসরের গবেষণা। এতে শিশুদের শরীরে সিসা প্রবেশের যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, তা শিশুদের সরাসরি শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে নয়, বরং খাদ্য গ্রহণের একটি গাণিতিক মডেলের ভিত্তিতে প্রাক্কলন করা হয়েছে। তাই বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র ও রান্নার দৈনন্দিন অভ্যাস নিয়ে আরও বিশদ গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।

বাংলাদেশে গরীবের চেয়ে ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার পরিমাণ বেশি







