আজ বিশ্ব বাঁশ দিবস

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
আজ বিশ্ব বাঁশ দিবস

ঘরের বেড়া থেকে আসবাব, ঝুড়ি থেকে চালুনি কিংবা বাদ্যযন্ত্র-বাঁশের ব্যবহার যেন শেষ হওয়ার নয়। কোথাও বাঁশ দিয়ে তৈরি হয় সাঁকো ও মাচা, কোথাও আবার এর কচি ডগা রান্না করে খাওয়া হয়। সহজ-সরল দেখতে এই উদ্ভিদটি মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে কতটা গভীরভাবে জড়িয়ে আছে, তার উদাহরণ ছড়িয়ে আছে বিশ্বের নানা প্রান্তে।

প্রতি বছর ১৮ সেপ্টেম্বর পালিত হয় বিশ্ব বাঁশ দিবস। পরিবেশ রক্ষা, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং মানুষের জীবিকায় বাঁশের অবদান সম্পর্কে বিশ্বজুড়ে সচেতনতা তৈরিই এ দিবসের অন্যতম লক্ষ্য।

২০০৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো বিশ্ব বাঁশ দিবস পালন করে ওয়ার্ল্ড ব্যাম্বো অর্গানাইজেশন (ডব্লিউবিও)। বাঁশকে কেবল গ্রামীণ জীবনের পরিচিত একটি উদ্ভিদ হিসেবে না দেখে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই সম্পদ হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ।

তবে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাঁশ নিয়ে সংগঠিতভাবে কাজ করার ভাবনা আরও আগে থেকেই শুরু হয়েছিলো। ১৯৯১ সালে থাইল্যান্ডের চিয়াং মাইয়ে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক বাঁশ কর্মশালায় বৈশ্বিক পর্যায়ে বাঁশ নিয়ে কাজ করা একটি সংগঠন গঠনের ধারণা উঠে আসে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও সংগঠনের কার্যক্রমের মাধ্যমে সেই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হয়।

বাঁশের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর দ্রুত বেড়ে ওঠার ক্ষমতা। একই সঙ্গে এর রয়েছে বিস্তৃত ব্যবহার। বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনে দীর্ঘদিন ধরেই ঘর নির্মাণ, বেড়া দেওয়া, মাচা তৈরি, সাঁকো বানানো, মাছ ধরার সরঞ্জাম এবং বিভিন্ন ধরনের গৃহস্থালি সামগ্রী তৈরিতে বাঁশ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গ্রামীণ অর্থনীতি ও ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পেও এর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

সময়ের সঙ্গে বাঁশের ব্যবহারও বদলেছে। এখন শুধু গ্রামবাংলার ঘরবাড়ি বা হস্তশিল্পেই নয়, আধুনিক নির্মাণ, আসবাবপত্র, অভ্যন্তরীণ নকশা, কাগজ, বস্ত্র এবং বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরিতেও বাঁশের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। টেকসই বিকল্প উপকরণ হিসেবে বিশ্বজুড়েই বাঁশকে ঘিরে আগ্রহ বাড়ছে।

খাবার হিসেবেও বাঁশ বেশ জনপ্রিয়। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাঁশের কচি ডগা বা বাঁশের কুঁড়ি রান্না করে খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। অঞ্চলভেদে এটি দিয়ে তৈরি হয় তরকারি, আচার, ফারমেন্টেড খাবারসহ নানা পদ।

পুষ্টির দিক থেকেও বাঁশের কুঁড়ি নিয়ে আগ্রহ রয়েছে গবেষকদের। বিভিন্ন গবেষণা পর্যালোচনায় এতে খাদ্যআঁশ, প্রোটিন, কিছু ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের উপস্থিতির কথা উঠে এসেছে। পাশাপাশি এতে ফেনলিক যৌগ ও ফাইটোস্টেরলের মতো কিছু জৈব উপাদানও পাওয়া যায়। খাদ্যআঁশের উপস্থিতির কারণে এটি সুষম খাদ্যতালিকার একটি অংশ হতে পারে। তবে বাঁশের কুঁড়িকে কোনো রোগের চিকিৎসা বা ওষুধ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

খাবার হিসেবে বাঁশের কুঁড়ি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতাও জরুরি। কাঁচা বাঁশের কুঁড়িতে সায়ানোজেনিক গ্লাইকোসাইড থাকতে পারে। যথাযথ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রান্নার মাধ্যমে এসব যৌগের মাত্রা কমানো যায়। তাই খাদ্য হিসেবে গ্রহণের আগে সঠিকভাবে প্রস্তুত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাঁশের বৈচিত্র্য এখানেই শেষ নয়। একই উদ্ভিদ কোনো জায়গায় মানুষের বাসস্থান তৈরির উপকরণ, আবার অন্য কোথাও ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের কাঁচামাল। কোথাও এটি হস্তশিল্পের প্রধান উপাদান, আবার কোথাও আধুনিক স্থাপত্য ও নকশায় পরিবেশবান্ধব উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এই বহুমুখী ব্যবহারই বাঁশকে অন্যান্য অনেক উদ্ভিদ থেকে আলাদা করে তুলেছে। প্রকৃতি থেকে পাওয়া একটি সহজলভ্য সম্পদ কীভাবে মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস ও অর্থনীতির সঙ্গে একসঙ্গে যুক্ত হতে পারে, বাঁশ তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

বিশ্ব বাঁশ দিবস তাই শুধু একটি উদ্ভিদকে স্মরণ করার উপলক্ষ নয়। এই দিনটি প্রাকৃতিক সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথাও মনে করিয়ে দেয়। আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও প্রকৃতির বহু পুরোনো সম্পদ যে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে, বাঁশ তারই এক অনন্য উদাহরণ।

/এসবি/