সৌদি সংঘাতে বড় ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
সৌদি সংঘাতে বড় ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
প্রতীকী ছবি

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নতুন মাত্রা পাওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের মধ্যেই ইয়েমেনকে ঘিরে সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত হুথিদের পাল্টাপাল্টি হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সৌদি ভূখণ্ডে হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং ইয়েমেনে সৌদির বিমান হামলার ঘটনায় বাড়ছে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স, জ্বালানি আমদানি ও সম্ভাব্য সৌদি বিনিয়োগে।

সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক শ্রমবাজার। বর্তমানে দেশটিতে ৪০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে কর্মসংস্থানের জন্য সৌদি আরবে যান ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জন। যা ওই বছর বিদেশে যাওয়া মোট কর্মীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে আরও ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৭৭ বাংলাদেশি সৌদি আরবে গেছেন।

শুধু শ্রমবাজার নয়, বাংলাদেশের রেমিট্যান্সেরও সবচেয়ে বড় উৎস সৌদি আরব।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটি থেকে এসেছে ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে সৌদি আরব থেকে এসেছে ৫৮ কোটি ৭৩ লাখ ডলার।

বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘ হলে সৌদি আরবের নির্মাণ, সেবা, কৃষি ও অন্যান্য শ্রমনির্ভর খাতে কার্যক্রম কমে যেতে পারে। এতে নতুন কর্মী নিয়োগের গতি কমার পাশাপাশি প্রবাসীদের আয় ও কাজের সুযোগও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশে ফেরত আসা কর্মীর সংখ্যা বাড়লে রেমিট্যান্স প্রবাহে চাপ তৈরি হতে পারে।

সৌদি পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবের জায়গা জ্বালানি। বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৬৫-৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল ব্যবহার করে। এর মধ্যে ১৪-১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করা হয়। সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত সৌদি আরামকো থেকে ‘অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড’ নামে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করে বাংলাদেশ। এসব তেল পরিশোধনের মাধ্যমে ডিজেল, পেট্রল, বিটুমিনসহ বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করা হয়।

ইতোমধ্যে হামলায় সৌদি আরবের তেল সরবরাহ অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে। ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইউরোপের কিছু রিফাইনারিতে সরবরাহ বন্ধ এবং কয়েকটি তেল কার্গো বাতিল করেছে সৌদি আরব। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন এখনই সৌদি অপরিশোধিত তেল সরবরাহ নিয়ে সংকটের আশঙ্কা করছে না। তবে সংঘাত দীর্ঘ হলে বাব এল-মান্দেব ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে।

এদিকে, সৌদি আরব থেকে বিনিয়োগ আনার উদ্যোগও রয়েছে বাংলাদেশের। বন্দরসহ বিভিন্ন খাতে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে সৌদি প্রতিনিধি দল। ফলে দেশটির নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ীভাবে অস্থিতিশীল হলে এসব বিনিয়োগের বাস্তবায়ন সময়সূচি অনিশ্চিত হতে পারে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়বে। বিশেষ করে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কৃষি, খামার ও ছোট ব্যবসায় যুক্ত। পরিস্থিতির অবনতি হলে তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া বা দেশে ফেরানোর প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ সৌদি অর্থনীতিতে সংকোচন তৈরি করলে বিদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশি কর্মীরা চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরলে শ্রমবাজারে নতুন চাপ তৈরির পাশাপাশি রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও প্রভাব পড়তে পারে।

/এসবি/