দেড় হাজার টাকার এলপিজি মিলছে না আড়াই হাজারেও

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেড় হাজার টাকার এলপিজি মিলছে না আড়াই হাজারেও
এলপিজি সিলিন্ডার। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

দেশের বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) নিয়ে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। চলতি মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের খুচরা মূল্য ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। কিন্তু বাজারে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে সর্বোচ্চ আড়াই হাজার টাকায়। আবার কোথাও কোথাও বাড়তি দামেও মিলছে না গ্যাস ।

খুচরা বিক্রেতা ও পরিবেশকদের দাবি, সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছে। তবে অপারেটরা বলছেন, দেশে এলপিজির কোনো সংকট নেই।

চলতি মাসের ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। আগস্টে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন। অর্থাৎ মাসের একই পর্যায়ে আগের মাসের তুলনায় আমদানি কমেছে প্রায় ৪০ হাজার টন।

অপারেটররা বলছেন, আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরের মোট আমদানি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতিতে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় এলপিজি পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের কেউ কেউ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও সরবরাহ কমিয়েছে। ফলে আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে।

মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান এলাকায় এক বিক্রেতা বলেন, কয়েক দিন আগেও ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার ১ হাজার ৮৫০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকায় সিলিন্ডার বিক্রি করেছি। এখন একই সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ১০০ টাকা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা।

বাজারে বাড়তি দামের জন্য খুচরা বিক্রেতারা পরিবেশক ও ডিলারদের দায়ী করছেন। তবে পরিবেশকরা বলছেন, অপারেটরদের কাছ থেকে আমরা চাহিদা অনুযায়ী পণ্য পাচ্ছি না। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় দামের ওপর প্রভাব পড়েছে।

অন্যদিকে, অপারেটররা জানান, দেশে পর্যাপ্ত এলপিজি মজুদ রয়েছে। গতকাল জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মতবিনিময় সভায়ও তারা বাজারে সংকট না থাকার কথা জানিয়েছেন। সভায় পর্যাপ্ত মজুদ রাখা এবং গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহে কোনো ঘাটতি তৈরি না করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন অপারেটর জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির ফ্রেইট ও প্রিমিয়াম ব্যয় ব্যাপক বেড়েছে। বিইআরসি নির্ধারিত টনপ্রতি ১৬০ ডলারের প্রিমিয়ামের বিপরীতে বর্তমানে তা ২৫০ থেকে ৪৫০ ডলার পর্যন্ত উঠেছে। এ অবস্থায় আমদানিতে লোকসানের আশঙ্কায় কিছু প্রতিষ্ঠান এলপিজি আমদানি কমিয়েছে।

এলপিজির সংকটের প্রভাব পড়েছে অটোগ্যাস খাতেও। সংশ্লিষ্ট সংগঠনের হিসাবে, দেশে প্রায় ১ হাজার ১০০ অটোগ্যাস স্টেশনের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ বন্ধ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে লিখিতভাবেও আবেদন করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অটোগ্যাসের ব্যবসা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বাজারে এলপিজির সংকটের কথা আমরা শুনেছি। তবে আমদানি যে কমেছে সেটা কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। গত মাসে দেশে এসেছে ১ লাখ ৫৭ হাজার টন এলপিজি । এ মাসে এখন পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার টন এলপিজি। তবে ইন্টারন্যাশনাল মার্কেট থেকে এলপিজি আমদানিতে ফ্রেইট কস্ট বেড়েছে। আমরা এটা আগে কমিয়েছিলাম। এটা আমরা অবশ্যই বিবেচনা করবো। এর বাইরে এলপিজি সাপ্লাই শর্টেজ অভ্যন্তরীণ কোনো কারণেও হতে পারে।

ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, দেশে এলপিজি আমদানিতে বড় ধরনের সংকট রয়েছে বলে আমি মনে করি না।আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিইআরসি এলপিজির মূল্য নির্ধারণ করে। এ কারণে কোনো কোনো পক্ষ আগাম মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ নিতে পারে। তবে অপারেটররা দেশের বাজারে যাতে সরবরাহ সংকট তৈরি না হয়, সে বিষয়ে নিয়মিতভাবে কাজ করছে।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রে আমরা কোনো সংকট দেখছি না। বরং সরবরাহ ব্যবস্থার পরবর্তী ধাপ-পরিবেশক, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে সমস্যাটি তৈরি হচ্ছে। এটি কৃত্রিম সংকটেরই ইঙ্গিত।

তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে তৈরি হওয়া এ ধরনের সংকট মোকাবিলা করা অপারেটরদের একার পক্ষে সম্ভব নয়। বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। পাশাপাশি বিইআরসিকেও বাজার পরিস্থিতি নিয়মিত তদারকি করতে হবে। একইসঙ্গে এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে বিদ্যমান জটিলতাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

/এসবি/