ঝটিকা মিছিল, অডিও ফাঁস– পুলিশের ভেতরের যোগাযোগ নিয়ে প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
ঝটিকা মিছিল, অডিও ফাঁস– পুলিশের ভেতরের যোগাযোগ নিয়ে প্রশ্ন
ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসি রাকিবুল হাসান ও গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীর ঝটিকা মিছিল। কোলাজ: সিজেডএন গ্রাফিক্স

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল, গোপন বৈঠক ও অনলাইন তৎপরতা নিয়ে নতুন করে সতর্ক হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসি রাকিবুল হাসানের একটি কথোপকথনের অডিও ফাঁস হওয়ার পর তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের ভেতরে থাকা আওয়ামী লীগপন্থি কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ থাকার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানে কয়েকশ নেতাকর্মীর ঝটিকা মিছিল এবং সেখানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে সংশ্লিষ্টদের। ঘটনার পর গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ও থানার ওসি প্রত্যাহার করা হয়েছে।

১১ সেপ্টেম্বর কূটনৈতিক জোন গুলশান-১ এলাকায় ওই মিছিলের ঘটনা ঘটে। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে গেলে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল থেকে ৫টি ককটেল উদ্ধার করা হয়। পরে এ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়। এ ঘটনায় ৭৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গুলশানের ওই ঘটনার মতো দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ঝটিকা মিছিল ও অনলাইন তৎপরতার মাধ্যমে নিজেদের সক্রিয়তা জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের কিছু নেতাকর্মী। সীমান্তঘেঁষা জেলা এবং রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকাকে কেন্দ্র করে কয়েক মিনিটের মিছিল করে এর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল নেওয়া হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ঝটিকা মিছিলের বিষয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপরও দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো এলাকায় এমন কর্মসূচি হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। ঘটনার পর গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ও থানার ওসি প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে এর বাস্তব প্রয়োগও দেখা গেছে।

এদিকে ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসি রাকিবুল হাসানের একটি কথোপকথন নিয়েও আলোচনা চলছে। ওই কথোপকথনে তাকে আওয়ামী লীগ আবার রাজনীতিতে ফিরবে এবং শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে পরিস্থিতি বদলে যাবে– এমন বক্তব্য দিতে শোনা গেছে। এ ঘটনায় তার ভূমিকা নিয়ে তদন্ত চলছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের একাংশের আশঙ্কা, আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে যে দলীয়করণ হয়েছিল, তার প্রভাবের কিছু অংশ এখনো রয়ে যেতে পারে। এসব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক কার্যক্রমে কোনো ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বিদেশে অবস্থানরত সাবেক কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য নিয়েও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরে আলোচনা রয়েছে। পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান ও চাকরিচ্যুত অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলাম সম্প্রতি বিদেশে বসে পুলিশের বর্তমান ভূমিকা ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তার বক্তব্যে পুলিশ বাহিনীর ভেতরে বিভ্রান্তি বা অসন্তোষ তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশ বাহিনীর শৃঙ্খলা ও মনোবল পুনর্গঠন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। আন্দোলনের সময় সংঘর্ষে পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায় বাহিনীর একাংশের মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। সেই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ বাহিনীর মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করতে পারে।

গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যানুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরকে ঘিরে মাঠপর্যায়ে অস্থিতিশীলতা তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে আশঙ্কা রয়েছে। আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন, বিশেষ করে যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নিষ্ক্রিয় কিছু সদস্যকে অর্থায়নের মাধ্যমে আবার তৎপর করার চেষ্টা চলছে বলেও গোয়েন্দা সূত্রের দাবি। এ ক্ষেত্রে পুলিশের ভেতরে থাকা আওয়ামী লীগপন্থি কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ থাকার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের তৎপরতা ঠেকাতে সরকারের প্রস্তুতি সম্পর্কে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। রাজধানীসহ দেশের প্রবেশপথ ও স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী যাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে মাঠপর্যায়ে সতর্কতা জোরদার করা হচ্ছে।

/এফসি/