ঢাকার যত্রতত্র বিলবোর্ড, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি

 ঢাকার যত্রতত্র বিলবোর্ড, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি
রাজধানীর আজিমপুর মোড়ে সড়ক বিভাজকের মধ্যে স্থাপন করা বিলবোর্ড। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

২০১০ সালের ১৫ মার্চের ঘটনা। ওই দিন সন্ধ্যায় প্রচণ্ড ঝড়ে রাজধানীর গুলশান ১ নম্বরে বহুতল ভবন থেকে একটি বিলবোর্ড ধসে চারটি গাড়ি ও একটি মোটরসাইকেলের ওপর পড়ে। এতে দুইজন নিহত ও আটজন আহত হয়। এরপর ২০১৫ সালের ৪ এপ্রিলের অপর এক ঘটনায় রাজধানীর শাহবাগে ঝড়ে একটি বিলবোর্ড ধসে একটি যাত্রীবাহী বাসসহ তিনটি যানের ওপর পড়ে। এতে তিনজন গুরুতর আহত হয়।

এসব দুর্ঘটনার পর ঢাকা শহরে এনালগ বিলবোর্ড স্থাপন প্রায় ১০ বছর বন্ধ ছিল। তবে সম্প্রতি আবার ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বিলবোর্ড স্থাপন শুরু হয়েছে। বিশেষ করে মেট্রোরেলের নিচে সারি সারি বিলবোর্ড স্থাপনের পর বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

এভাবে যত্রতত্র বিলবোর্ড স্থাপন করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদেরা। তাদের আশঙ্কা, এসব বিলেবোর্ডে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়বে এবং রাজধানীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট হবে।

অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে একটি চক্র এসব বিলবোর্ড ইজারা দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এই চক্রের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের নেতারাও জড়িত। তবে এদের কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না প্রশাসন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর পল্টন থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত মেট্রোরেলের নিচে সড়কের মাঝখানে এবং শাহবাগ ও আজিমপুর মোড়ে বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। এসব বিলবোর্ডের বেশিরভাগেই বিজ্ঞাপন রয়েছে। শুধু আজিমপুর ও শাহবাগ মোড়ের কিছু বিলবোর্ড এখনো ফাঁকা।

১৫ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে দেখা গেছে, আজিমপুর মোড় থেকে ইডেন মহিলা কলেজের মূল ফটক পর্যন্ত ১০টি বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। আরও কয়েকটি বিলবোর্ড স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। তবে এগুলোর অধিকাংশেই বিজ্ঞাপন নেই। বিলবোর্ডে ছোট কাগজ সাটিানো। এসব কাগজে কল ফর অ্যাড লেখা আছে। এই কাগজে যোগাযোগের জন্য দুটি মুঠোফোন নম্বর দেওয়া আছে।

আজিমপুরে মোড়ের একটি বিলবোর্ডে দেওয়া মুঠোফোর নম্বরে সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের পক্ষ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর কল দেওয়া হয়। এই সময় খোকন নামের একজন ফোন ধরে বলেন, ‘আমরা সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে এই বিলবোর্ড স্থাপনের অনুমোদন নিছি। রাস্তা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা ও কাটা তারের বেড়া দেওয়া বাবদ সব খরচ আমাদেরই বহন করতে হবে। ডিএসসিসি প্রশাসক সাহেব আমাদের ডাকছে আমরা গিয়েছি। আমাদের কাজ দিছে। এটা লস প্রজেক্ট। বছরে তিন চার লাখ টাকা ট্যাক্স দিতে হবে।’ এসব বলেই তিনি কল কেটে দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার টিএসসির সামনে মেট্রোরেলের নিচে স্থাপন করা বিলবোর্ড। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার টিএসসির সামনে মেট্রোরেলের নিচে স্থাপন করা বিলবোর্ড। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

সরেজমিনে আরও দেখা গেছে, পুরানা পল্টন থেকে কারওয়ান বাজার মোড় পর্যন্ত ১০৭ টি বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে পুরানা পল্টন থেকে টিএসসি পর্যন্ত ৭৩ টি বিলবোর্ড এবং কারওয়ান বাজার থেকে শাহবাগের বারডেম হাসপাতাল পর্যন্ত ৩৪টি বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে।

প্রেসক্লাব থেকে শিক্ষাভবন মোড় পর্যন্ত গ্রি কোম্পানির বিজ্ঞাপন, শিক্ষা ভবন থেকে কার্জন হল পর্যন্ত বিলবোর্ডে আকিজ গ্রুপের বিজ্ঞাপন, কার্জন হল থেকে শাহবাগ মোড় পর্যন্ত বিলবোর্ডে বিকাশের বিজ্ঞাপন দেওয়া আছে। এছাড়া শাহবাগ মোড় থেকে কারওয়ান বাজার মোড় পর্যন্ত বিলবোর্ডেও বিভিন্ন কোম্পানির বিজ্ঞাপন দেখা আছে।

সৌন্দর্য বর্ধনের নামে বিলবোর্ডে বিজ্ঞাপন, নগরবাসীর প্রতিক্রিয়া

রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে নতুন করে বিলবোর্ড স্থাপনের বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ। কেউ এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। আবার কেউ কেউ করেছেন সমালোচনা।

মহসিন নামের এক রিকশা চালক সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘আমি ঢাকায় ২০১১ সাল থেকে আছি। আগে কখনো রাস্তায় এমন বিলবোর্ড দেখিনি। হঠাৎ সিটি করপোরেশন কেন এমন বিলবোর্ড স্থাপন করলো তা বুঝলাম না। এটার লাভ-ক্ষতি বুঝি না। আগে কখনো দেখি নাই । এখন হঠাৎ দেখে অবাক লাগছে।’

এ বিষয়ে আজিমপুর মোড়ে পথচারী মোস্তাকিমের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানালেন, ‘হঠাৎ করে রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে এমন বিলবোর্ড স্থাপন করা হচ্ছে কেন তা জানি না। সিটি করপোরেশনের টাকার এতটাই ঘাটতি হলো যে রাস্তার সৌন্দর্য নষ্ট করে, পথচারীদের ঝুঁকিতে ফেলে এমন কাজ তাদের করতে হবে।’

আনজুম নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বিলবোর্ড স্থাপনের কড়া সমালোচনা করেছেন। তার সঙ্গে ১৫ সেপ্টেম্বর সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের এই প্রতিনিধির কথা হয় টিএসসির সামনে। তিনি বলেন,‘রাজু ভাস্কর্যের দিকে তাকালে ভাস্কর্যের আগে চোখে পড়ে বিলবোর্ডে দেওয়া বিকাশের বিজ্ঞাপনে। একটা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কীভাবে বিলবোর্ড স্থাপন করা হয় তা আমাদের মাথায় আসে না। ঝুঁকিপূর্ণ এসব বিলবোর্ড দ্রুত অপসারণ করে মেট্রোরেলের নিচের সড়কের সৌন্দর্য বর্ধনে সিটি করপোরেশন কাজ করুক- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’

কার্জন হলের সামনের সড়কে বাসেত নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, এসব বিলবোর্ড দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এই চক্রের সঙ্গে অনেক রাজনৈতিক নেতাও জড়িত। তবে প্রশাসন এদের কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

কয়েকজন অবশ্য এই বিলবোর্ড স্থাপনের বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তারা বলছেন, বিলবোর্ডে কোম্পানির বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি চাকরির বিজ্ঞাপনও দিলে ভালো হয়।

নগর পরিকল্পনাবিদের বক্তব্য

এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান সিজেডএন টোয়েন্টিফোর কে বলেন, মেট্রোলের নিচের এই জায়গাগুলোকেতো মুক্ত রাখার কথা ছিল। বিলবোর্ডগুলো শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট করছে। কিন্তু সিটি কর্পোরেশন অর্থনৈতিক লাভটা খুঁজতে গিয়ে এই জায়গাগুলোতে বিলবোর্ডগুলো বসিয়েছে।

আদিল মুহাম্মদ খান আরও বলেন, ‘এর আগেও সিটি করপোরেশন এভাবে বিলবোর্ড স্থাপন করতে পারে কি না- এই বিষয় নিয়ে আলাচনা হয়েছে । আবার মেট্রোরেলের নিচে যে বিলবোর্ড বসানো হচ্ছে, সে ব্যাপারে কোনো ধরনের মনিটরিং করে না ডিএমটিসিএল (ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড)। সারা ঢাকা শহর তো এমনিতেই দৃষ্টি দূষণ চলছে। মেট্রোরেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্ট্রাকচার আমরা চেয়েছিলাম যে, এটি অন্তত নান্দনিক থাকে। শহরের মধ্য দিয়ে কিছু জায়গা যেন আমরা একটু নান্দনিক করে রাখতে পারি। কিন্তু সিটি করপোরেশন অল্প কিছু টাকার জন্য এই জায়গাটাও ধ্বংস করার জন্য বিলবোর্ড বসিয়েছে। এটা একদম ঠিক হয়নি।’

বিলবোর্ড স্থাপন বন্ধে উদোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, এখন এই জায়গাগুলোতে যাতে কখনো বিলবোর্ড না বসে-সে বিষয়ে ডিএমটিসিএল এবং সিটি করপোরেশনের যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত । এছাড়া যেগুলো আছে সেগুলো সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থাও করা উচিত।

রাজধানীর হাইকোর্টের সামনে মেট্রোরেলের নিচেও স্থাপন করা হয়েছে বিলবোর্ড। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
রাজধানীর হাইকোর্টের সামনে মেট্রোরেলের নিচেও স্থাপন করা হয়েছে বিলবোর্ড। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

ড. আদিল মুহাম্মদ খান আরও বলেন, ‘সিটি করপোরেশন নিজেইতো আমাদের নাগরিক সংস্থা। তারা নিজেরা যদি এই ধরনের জিনিসগুলো করে সেই অর্থে নাগরিকদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়। সেক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন যে সেবা সংস্থা, নাগরিকদের সংস্থা তার সে মূল স্পিরিট হারিয়ে যায়। অল্প কিছু টাকা আমাদের ক্ষতির কারণ হতে পারে না। আমাদের আশঙ্কা হয় বিলবোর্ডে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি যেমন বাড়বে তেমনি শহরের সৌন্দর্য নষ্টও হবে। আমরা চাই, এই বিলবোর্ডগুলো সরিয়ে ফেলা হোক।’

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, মেট্রোরেলের নিচে যে বিলবোর্ড গুলো স্থাপন করা হয়েছে মেগুলো আমি যোগদান করার আগেই স্থাপন করা হয়েছে। আমি আসছি কিছু দিন হলো। এর আগে যারা ছিল, তারা বলতে পারবে। আমি নিজেও ওই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখছি। এ বিষয়ে রাজস্ব কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করুন সব তথ্য পেয়ে যাবেন।’

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের পক্ষ থেকে ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জোনায়েদ কবির সোহাগের মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি ফোন ধরে বলেন, 'আমি অসুস্থ বাসায় আছি।' তবে পরে সোমবার (১৫ সেপ্টেম্বর) এ বিষয়ে কথা বলার জন্য তার মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

/বিবি/