তিতুমীর কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচন চান শিক্ষার্থীরা

নাঈম তালুকদার
নাঈম তালুকদার
তিতুমীর কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচন চান শিক্ষার্থীরা
উপরের বাঁ দিক থেকে: নাফিস হাসান সাকি, মুহিবুল্লাহ সিফাত, নোমান ফকির ও তাহমিনা আফরোজ রুপা

সরকারি তিতুমীর কলেজের ইতিহাস দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৬৮ সালে ‘জিন্নাহ কলেজ’ নামে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পায় ‘তিতুমীর কলেজ’ নামে।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানের সময়ে জগন্নাথ কলেজের ডিগ্রি শাখা মহাখালীতে স্থানান্তরের মাধ্যমে কলেজটির যাত্রা শুরু হয়। তবে ১৯৭১ সালে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কলেজটির নামও পরিবর্তিত হয়। ইয়াহিয়া খানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণার পর ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা কলেজের ‘জিন্নাহ কলেজ’ লেখা সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলেন। পরে ২ মার্চ ১৯৭১ সালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা সৈয়দ মীর নিসার আলী তিতুমীরের স্মরণে প্রতিষ্ঠানটির নাম রাখা হয় ‘তিতুমীর কলেজ’।

প্রতিষ্ঠার পরপরই কলেজটিতে শুরু হয় ছাত্র সংসদের কার্যক্রম। ১৯৬৯-৭০ শিক্ষাবর্ষে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম ছাত্র সংসদ নির্বাচন। ওই নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন সিরাজউদ্দৌলা এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হন মফিজুল ইসলাম। শুরু থেকেই ছাত্র সংসদ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে ভূমিকা পালন করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামেও কলেজটির শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল।

তবে স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দলীয় প্রভাবসহ নানা কারণে ছাত্র সংসদের কার্যক্রমে ধীরে ধীরে স্থবিরতা দেখা দেয়। বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও তা নিয়মিত ধারায় অব্যাহত থাকেনি। সর্বশেষ ১৯৯৬-৯৭ শিক্ষাবর্ষে তিতুমীর কলেজ ছাত্র সংসদের পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন আক্কাছুর রহমান আঁখি এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হন আনোয়ারুল হক আনোয়ার।

এরপর পেরিয়ে গেছে প্রায় তিন দশক। কিন্তু আজও তিতুমীর কলেজে আর কোনো ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায় ও নেতৃত্ব বিকাশের অন্যতম প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত ছাত্র সংসদের নির্বাচন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় এর পুনরুজ্জীবন নিয়ে প্রশ্ন ও প্রত্যাশা রয়ে গেছে।

অবিলম্বে একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক ছাত্র সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানিয়ে রসায়ন বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আল নোমান ফকির বলেন, ছাত্র সংসদ শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত কণ্ঠস্বর। শিক্ষার্থীদের বাকস্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক চর্চা, একাডেমিক ও প্রশাসনিক সমস্যা সমাধান এবং অধিকার আদায়ের সবচেয়ে বড় ও বৈধ প্ল্যাটফর্ম হলো ‘ছাত্র সংসদ’। এ ছাড়া আবাসন সংকট, হলের পরিবেশ, খাবারের মান ও নিরাপত্তার মতো বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একটি নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বশীল কাঠামো অপরিহার্য।

অধিকার আদায়ের পাশাপাশি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, লাইব্রেরির সংস্কার ও সময়োপযোগী বই সংগ্রহ, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সাহিত্যচর্চার মতো কর্মকাণ্ড নিয়মিত পরিচালনায় ছাত্র সংসদ নেতৃত্ব দিয়ে থাকে।

তিনি আরও বলেন, অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, তিকসু ২০-২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে অকার্যকর থাকায় শিক্ষার্থীরা তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং তৈরি হচ্ছে এক গভীর নেতৃত্বহীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা।

ক্যাম্পাসে সহাবস্থান, নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীবান্ধব কার্যক্রম নিশ্চিত করতেও ছাত্র সংসদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তাহমিনা আফরোজ রুপা বলেন, আমরা দেখে আসছি, সরকারি তিতুমীর কলেজে দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে। ছাত্র সংসদ কেবল একটি সংগঠন নয়, এটি শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়, মতপ্রকাশ ও নেতৃত্ব চর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তাই আমি চাই, তিতুমীর কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হোক, শিক্ষার্থীদের মতামতের যথাযথ মূল্যায়ন হোক এবং তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হোক। এখানে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে প্রাধান্য পাবে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি ও সামগ্রিক কল্যাণ।

তিনি আরও বলেন, আমি এমন নেতৃত্ব চাই, যারা শিক্ষার্থীদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে। নির্বাচন হোক অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী নির্ভয়ে নিজের প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পাবে। ক্যাম্পাসে সহাবস্থান, নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীবান্ধব কার্যক্রম নিশ্চিত করতেও ছাত্র সংসদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, এটাই আমার প্রত্যাশা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। আমরা করুণা নয়, অধিকার চাই; প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়ন চাই। ছাত্র সংসদ নির্বাচন হোক শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর, গণতান্ত্রিক চর্চা ও নতুন নেতৃত্ব বিকাশের পথ।

অবিলম্বে সব পক্ষের অংশগ্রহণে তিতুমীর কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দাবি জানিয়ে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মুহিবুল্লাহ সিফাত বলেন, আজকের তরুণ শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশের মূল কারিগর। আর সেই ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তোলার সবচেয়ে বড় পাঠশালা হলো কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আনন্দমুখর ক্যাম্পাস। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারি তিতুমীর কলেজে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। কিন্তু অত্যন্ত কষ্টের বিষয়, এই প্রাণবন্ত ক্যাম্পাসে দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ রয়েছে। ১৯৯৬-৯৭ শিক্ষাবর্ষে সর্বশেষ এখানে তিতুমীর কলেজ ছাত্র সংসদ (তিকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর নানা রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আর কোনো নির্বাচন না হওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের কথা বলার প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্মটি হারিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, একটি প্রথম সারির কলেজে দীর্ঘদিন ছাত্র সংসদ না থাকায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মৌলিক সমস্যাগুলো আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। ক্যাম্পাসে মেস ও হলের আবাসন সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে, যা নিরসনে কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেই। ক্যাফেটেরিয়া ও হলের খাবারের নিম্নমান নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ থাকলেও তা শোনার মতো কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি নেই। পরিবহন সংকট, শ্রেণিকক্ষের স্বল্পতা এবং প্রশাসনিক ধীরগতির কারণে হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, ছাত্র সংসদ কেবল কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের জন্য নয়, বরং এটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের একটি অরাজনৈতিক ও বড় মঞ্চ। নিয়মিত নির্বাচনের মাধ্যমে যেমন সঠিক নেতৃত্ব তৈরি হয়, তেমনি ক্যাম্পাসে বজায় থাকে সুস্থ ধারার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহশিক্ষামূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি এবং মেধার বিকাশ ঘটাতেও ছাত্র সংসদের বিকল্প নেই। তাই সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে আমরা কলেজ প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।

ছাত্র সংসদ নির্বাচন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি উল্লেখ করে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাফিস হাসান সাকি বলেন, একজন সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি, ছাত্র সংসদ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মতামত, অধিকার ও প্রত্যাশার প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিফলন। এটি কেবল প্রতিনিধি নির্বাচনের কাঠামো নয়, বরং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, নেতৃত্বের বিকাশ ও দায়িত্বশীল নাগরিকত্ব চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ছাত্র সংসদ শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি করে এবং একাডেমিক পরিবেশের উন্নয়ন, সহশিক্ষা কার্যক্রমের প্রসার ও শিক্ষার্থীদের নানাবিধ সমস্যা সমাধানে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি, ছাত্র সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের একটি বাস্তব অনুশীলন, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা করেন। সরকারি তিতুমীর কলেজে সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেলেও নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা রয়ে গেছে। একটি কার্যকর কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠিত হলে শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত প্রত্যাশা ও যৌক্তিক দাবিগুলো আরও সুসংগঠিতভাবে উপস্থাপিত হবে। তাই শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে ছাত্র সংসদ গঠনের প্রত্যাশা রাখি। তিতুমীরের শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর, অধিকার ও সম্ভাবনার যথাযথ বিকাশে ছাত্র সংসদ নির্বাচন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

প্রসঙ্গত, দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। এদিকে, ছাত্র সংসদের জন্য নির্ধারিত কক্ষটি ছাত্রদল ও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের ব্যবহার করা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। এর আগে ৫ আগস্টের পূর্বে কক্ষটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ব্যবহার করতেন বলে জানা গেছে।

/এমআর/