শিখন পদ্ধতিসহ নানামুখী সংকটে প্রাথমিক শিক্ষা


শিখন পদ্ধতিসহ নানামুখী সংকটে প্রাথমিক শিক্ষা
গ্রাফিক্স: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

সকাল হলেই কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পথে ছোটে শিশুরা। কারও হাতে বই, কারও খাতায় আগের দিনের বাড়ির কাজ। শ্রেণিকক্ষে বসে তারা পড়া শোনে, বোর্ডে লেখা দেখে, অঙ্ক কষে। বাইরে থেকে দেখলে সবই স্বাভাবিক মনে হয়। শিশুরা বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, পাঠদান হচ্ছে, নেওয়া হচ্ছে পরীক্ষা। কিন্তু এই স্বাভাবিক দৃশ্যের আড়ালে থেকে যায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রশ্নগুলো হচ্ছে বিদ্যালয়ে গিয়ে শিশুরা আসলে কী শিখছে বা শিখতে পারছে এবং শিক্ষার আদর্শ মানদণ্ডের সঙ্গে তা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা পরিস্থিতি অনেকক্ষেত্রেই আশাব্যঞ্জক নয়। শিখন পদ্ধতি ও মূল্যায়নে রয়েছে ব্যাপক ঘাটতি। বেশ কিছু কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যেমন কোথাও শিক্ষক কম, কোথাও প্রধান শিক্ষক নেই। কোথাও দুই পালায় (শিফটে) চলছে পাঠদান, আবার কোথাও শ্রেণিকক্ষের সংকট। নিরাপদ স্যানিটেশনের সংকট কিংবা খেলার মাঠ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ। ফলে প্রাথমিক শিক্ষায় এখন শুধু বিদ্যালয়ে শিশুর উপস্থিতি নিশ্চিত করাই বড় সাফল্য নয়। শিশুর হাতে বই পৌঁছানোর পাশাপাশি সে কতটা পড়তে পারছে, শিখনফল কতটা এবং শেখার জন্য কেমন পরিবেশ পাচ্ছে-সেসব বিষয়ই হয়ে এখন হয়ে উঠেছে বড় চ্যালেঞ্জ।

বড় চ্যালেঞ্জ শিক্ষকের সংকট

দেশে ১ লাখ ১৮ হাজারের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৬৫ হাজার ৫৬৯টি। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ এবং শিক্ষক প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার। অর্থাৎ একজন শিক্ষক গড়ে প্রায় ২৮ জন শিক্ষার্থীকে পড়াচ্ছেন। জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর গড় অনুপাত সন্তোষজনক হলেও বিদ্যালয় ও অঞ্চলভেদে শিক্ষকদের সংখ্যায় বড় পার্থক্য রয়েছে।

শিক্ষক সংকটের বড় জায়গাগুলোর একটি হলো প্রধান শিক্ষকের পদ। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩৬ হাজার ২৩৫টি প্রধান শিক্ষক পদ দীর্ঘদিন শূন্য ছিল। ফলে অর্ধেকেরও বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকায় ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকদের প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি পাঠদানও সামলাতে হয়েছে। দাপ্তরিক কাজ, সরকারি কর্মসূচি, অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ ও একাডেমিক দায়িত্বের সঙ্গে শ্রেণিকক্ষের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। তবে প্রধান শিক্ষক পদ পূরণে এখন পদোন্নতি প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। প্রধান শিক্ষকের পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া শুরু করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। দীর্ঘদিনের শূন্য পদ পূরণ হলে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও একাডেমিক নেতৃত্বে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

শিক্ষক সংকট দূর করতে ২০২৬ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী গত ১ অক্টোবর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে যোগদান এবং ৪ অক্টোবর বিদ্যালয়ে পদায়নের কথা ছিল। তাদের মধ্যে নির্ধারিত সময়ে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন ১২ হাজার ৮৩০ জন। হিসাব অনুযায়ী- কাগজপত্র জমা দিয়ে নিয়োগপত্র হাতে পেয়েও সহকারী শিক্ষক পদে যোগদান করেননি ৯১৮ জন। নতুন শিক্ষকদের যোগদান ও পদায়নের ফলে শিক্ষক-সংকট কমবে। তবে দীর্ঘদিনের শূন্য পদ এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষক বণ্টনের ভারসাম্যহীনতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শিখনফল নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ২০২৫ সালের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) অনুযায়ী, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৫০ দশমিক ২ শতাংশের পড়ার দক্ষতা রয়েছে। বাংলাদেশে শিশুদের লেখা দেখে পড়া ও তা বোঝার মৌলিক দক্ষতা নিয়ে জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কিছু শিশুর ওপর করা এক যৌথ জরিপেও এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। সরাসরি শিশুদের ছোট গল্প পড়তে দিয়ে এবং সেটির অর্থ বুঝে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছে কি না তা দিয়ে এই মূল্যায়ন করা হয়।

ওই জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৬১.৬ শতাংশ শিশু পড়তে পারলেও, পড়ার পর সেটির অর্থ বুঝে সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পেরেছে মাত্র অর্ধেক ৫০ শতাংশ শিশু অর্থাৎ অনেকেই না বুঝে পড়ছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ২৮.২ শতাংশ শিশুর এই মৌলিক পঠন দক্ষতা ( বুঝে পড়া) রয়েছে, যা ২০১৯ সালে ছিল ২৪.৬ শতাংশ। যদিও ওপরের শ্রেণিতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এই হার কিছুটা বাড়ে। যেমন তৃতীয় শ্রেণিতে ৩৫.৪ শতাংশ, চতুর্থ শ্রেণিতে ৫৪.৭ শতাংশ এবং পঞ্চম শ্রেণিতে তা ৬২ শতাংশ হয়।

তবুও বড় একটি অংশ দেখে পড়ার মূল দক্ষতা অর্জন ছাড়াই ওপরের ক্লাসে উঠে যাচ্ছে, যা দেশের প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানের একটি বড় ঘাটতিকে নির্দেশ করে। অর্থাৎ এই বয়সী শিশুদের বড় একটি অংশ এখনো বয়সোপযোগী মৌলিক পড়া ও দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। শিক্ষকসংখ্যা, কার্যকর পাঠদানের সময়, শিক্ষকের দক্ষতা এবং শিক্ষার্থীর পারিবারিক ও আর্থসামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে এসব বিষয় সরাসরি যুক্ত। বিদ্যালয়ে কত শিশু যাচ্ছে, তার পাশাপাশি তারা সেখানে কী শিখছে সেটিই এখন প্রাথমিক শিক্ষা খাতের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে।

জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) এবং ইউনিসেফ অফিস অফ রিসার্চের-ইনোসেন্টির এক যৌথ গবেষণায়ও প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতার ঘাটতির এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। গত ৭ মে প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক স্তরে উত্তীর্ণ ৯১ শতাংশ শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণির গণিতের অর্ধেক প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারেনি। একইভাবে ওই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ বাংলাতেও খারাপ ফল করেছে।

দুই পালায় পাঠদান কার্যকর হয় না

এদিকে দুই পালায় (শিফট) বিদ্যালয় পরিচালনা করা হলে এটি কার্যকর পাঠদানের ক্ষেত্রে একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। একই অবকাঠামোতে একাধিক শিফটে পাঠদান করায় শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় ও জায়গা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। সরকার আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে এক পালায় পাঠদানের আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেছে। তবে এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ পরিবেশের অভাব

বিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ পরিবেশের অভাব রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৮৮ দশমিক ৯ শতাংশে নিরাপদ স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ১১ দশমিক ১ শতাংশ বিদ্যালয়ে এ ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবস্থার আওতা আরও কম। অর্ধেকেরও কম বিদ্যালয়ে এ সুবিধা রয়েছে। নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন এবং শিশুবান্ধব শ্রেণিকক্ষ নিশ্চিত করার বিষয়টি শিক্ষার গুণগত মানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে ।

পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই

খেলার মাঠের সংকটও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রায় ১১ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো খেলার মাঠ নেই। অন্যদিকে অবকাঠামোগত ঘাটতি দূর করতে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

নতুন শ্রেণিকক্ষ, লাইব্রেরি ও আইসিটি কক্ষ নির্মাণ, খেলার মাঠ, সীমানাপ্রাচীরসহ বিদ্যালয়ের বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু ভবন নির্মাণ করলেই শিক্ষার মান নিশ্চিত হবে না। পর্যাপ্ত শিক্ষক, কার্যকর পাঠদান, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং শিক্ষার্থীর শেখার উপযোগী পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।

ঝরে পড়ার হার বেশি

প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হারও এখনো উদ্বেগের বিষয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সর্বশেষ ২০২৪ সালের শুমারি অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ঝরে পড়ার হার ছিল ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। কিন্তু ২০২৪ সালে ঝরে পড়ার হার আবার বেড়ে হয় ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। এর মধ্যে ছেলেদের ঝরে পড়ার হার বেশি। প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়াতে তাই শুধু শিক্ষক নিয়োগ নয়, শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন, দুর্বল শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সহায়তা, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং শিশুবান্ধব বিদ্যালয় পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এসব বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রাণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘যেহেতু প্রধান শিক্ষকের পদটি ১০ম গ্রেডের, তাই বিধি অনুযায়ী এ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশ প্রয়োজন। বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আমরা ইতোমধ্যে পিএসসিকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে অনুরোধ করেছি। আশা করছি, প্রক্রিয়াটি দ্রুত এগিয়ে যাবে।’

তিনি আরও জানান, আগামী বছর প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ও ‘খেলাধুলা’ নামে দুটি নতুন বই যুক্ত করা হচ্ছে। শিশুদের দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শুধু একাডেমিক শিক্ষায় নয়, তাদের শারীরিক, মানসিক ও সৃজনশীল বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

/বিবি/