চার বছরে দারিদ্র্যসীমার নিচে ৮০ লাখের বেশি মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
চার বছরে দারিদ্র্যসীমার নিচে ৮০ লাখের বেশি মানুষ
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে দারিদ্র্য হ্রাসের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। করোনা মহামারীর পর থেকে দারিদ্র্যের চাপ বাড়তে থাকায় গত চার বছরে নতুন করে ৮০ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে। দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট, স্থবির মজুরি ও বিনিয়োগের দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরোও জটিল করে তুলছে। পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও আবাসনসহ মৌলিক চাহিদা পূরণে বঞ্চনার শিকার হচ্ছে বিপুলসংখ্যক মানুষ।

১৭ অক্টোবর আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস। ১৯৯২ সালে জাতিসংঘ দিবসটি ঘোষণা করে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য নিরাপদ আবাসন’।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ২৮০ কোটির বেশি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অপর্যাপ্ত আবাসন সমস্যায় রয়েছে। দারিদ্র্য ও সামাজিক বঞ্চনার শিকার জনগোষ্ঠীই এ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। যা ২০২৫ সালে বেড়ে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে গত এক বছরেই নতুন করে দরিদ্র হয়েছে ২১ লাখ মানুষ। বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণে প্রবৃদ্ধির মন্থরতা, শ্রমবাজারের দুর্বলতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে দারিদ্র্য বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব বাংলাদেশের বাজারেও পড়েছে। অন্য অনেক দেশ তুলনামূলক দ্রুত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলেও বাংলাদেশে এ চাপ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।

তিনি বলেন, কোভিড পরবর্তী সংকট ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর চাকরি হারানো, মজুরি না বাড়া এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির মতো বিষয় মানুষের জীবনযাত্রাকে আরোও কঠিন করেছে। বিনিয়োগে প্রত্যাশিত গতি না আসায় পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানও তৈরি হচ্ছে না। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অক্সফোর্ড পোভার্টি অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ বহুমাত্রিক দরিদ্র। অন্যদিকে, ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ জনগোষ্ঠী এ ধরনের দারিদ্র্যে পতিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।এছাড়া, পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) ১১টি সূচকভিত্তিক হিসেবে দেশে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার ২৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।

জিইডির তথ্য অনুযায়ী, বিভাগগুলোর মধ্যে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি সিলেটে। জেলাগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বান্দরবান, যেখানে এ হার ৬৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ, কক্সবাজারে ৪৭ দশমিক ৭০ শতাংশ, সুনামগঞ্জে ৪৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ, রাঙ্গামাটিতে ৪৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ ও ভোলায় ৪৫ দশমিক ১২ শতাংশ মানুষ এ বঞ্চনার মধ্যে রয়েছে।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দারিদ্র্যকে সাময়িক অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখার কারণে এর কাঠামোগত কারণ মোকাবেলায় ঘাটতি রয়ে গেছে। সংকটের মূল কারণ চিহ্নিত করে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে না পারলে পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে।

দারিদ্র্য কমাতে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচি নিয়েছে সরকার। একইসঙ্গে আগামী পাঁচ বছরে দারিদ্র্যের হার ১৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, মূল্যস্ফীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংকটজনিত ব্যয়বৃদ্ধির চাপ মোকাবিলায় কাজ করছে সরকার। সামাজিক সুরক্ষার ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য কমাতে শুধু ভর্তুকি ও আর্থিক সহায়তাই যথেষ্ট নয়। উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, টেকসই কর্মসংস্থান, আয় বৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হবে সংকট মোকাবেলার মূল চ্যালেঞ্জ।

/এসবি/