৩ মাসে ২৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
৩ মাসে ২৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার
বাংলাদেশ ব্যাংকের লোগো

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয়ও বাড়ছে। তবে ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না রাজস্ব আয়। ফলে বাজেটের ব্যয় মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে সরকারের। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকার ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে সরকার ৬ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা পরিশোধ করেছিলো।

সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন বেতন কাঠামো বা পে স্কেল কার্যকরের উদ্যোগের কারণে সরকারের অর্থের চাহিদা বেড়েছে। গত জুলাই থেকে বকেয়া বেতন-ভাতাসহ নতুন বেতন কাঠামোর অর্থ পরিশোধ করা হবে। এর ফলে অক্টোবর মাসে সরকারের বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে, যা মেটাতে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। তবে ব্যাংক খাতে পর্যাপ্ত উদ্বৃত্ত তারল্য থাকায় আপাতত ঋণের সুদহারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়নি। দীর্ঘ সময় পর ট্রেজারি বিলের সুদহার ৮ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরের শেষে ব্যাংক খাতে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৯ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এই তিন মাসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ২৩ হাজার ২২৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। এতে বাণিজ্যিক ব্যাংক খাতে সরকারের মোট ঋণস্থিতি বেড়ে হয়েছে ৬ লাখ ১৪ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া ১ হাজার ১৭ কোটি টাকার ঋণের ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সরকারের ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯৫ হাজার ৬৯ কোটি টাকা।

ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের সংকটসহ বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতির প্রত্যাশিত উন্নতি হচ্ছে না। এর প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতেও। গত জুলাইয়ে এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশে। বেসরকারি খাতে কম সুদে ঋণ বিতরণে উৎসাহ দিতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হলেও তা থেকে প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।

তারা বলেন, বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে ব্যাংকগুলোর একটি বড় অংশের হাতে অব্যবহৃত অর্থ পড়ে রয়েছে। এই অর্থ লাভজনকভাবে কাজে লাগাতে বিভিন্ন ব্যাংক সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তবে সরকারের ঋণের চাহিদা বাড়ার খবরের পর বাজারে সুদহারের নিম্নমুখী প্রবণতায় পরিবর্তন আসছে। ফলে কমতে থাকা সুদহার আবারও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত নিলামে সরকার ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ সুদে অর্থ সংগ্রহ করেছে। ১৮২ দিন মেয়াদি বিলের সুদহার ছিল ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলের ক্ষেত্রে তা দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় এসব সুদহার বেশ কম। এর আগের নিলামে একই মেয়াদের বিলের সুদহার ছিল যথাক্রমে ৮ দশমিক ১৩, ৮ দশমিক ৩৭ ও ৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ। আগের মাসে সুদহার আরও বেশি ছিলো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না থাকায় ব্যাংক খাতে বর্তমানে উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে। এই অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজতে অনেক ব্যাংক সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড কেনার দিকে ঝুঁকছে। ব্যাংকগুলোর মধ্যে সরকারি ঋণপত্রে বিনিয়োগের প্রতিযোগিতা বাড়ায় এসব বিল ও বন্ডের সুদহার কমেছে। তবে সরকারের ঋণের চাহিদা আরও বাড়লে সুদহারের এই নিম্নমুখী প্রবণতা কতটা বজায় থাকবে, তা নির্ভর করবে বাজারের তারল্য ও সরকারি অর্থায়নের প্রয়োজনের ওপর।

/এসবি/