ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে ১৩২ মেগাওয়াট উৎপাদনের সম্ভাবনা, বিনিয়োগ সুরক্ষার আহ্বান ক্যাবের

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে ১৩২ মেগাওয়াট উৎপাদনের সম্ভাবনা, বিনিয়োগ সুরক্ষার আহ্বান ক্যাবের
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে নাগরিক সংলাপে অতিথিরা

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, সিটি কর্পোরেশন ও পৌর এলাকায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ১৩২ দশমিক ৬১ মেগাওয়াট-পিক (এমডব্লিউপি) সম্ভাবনা চিহ্নিত করা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমানো, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণে এ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একইসঙ্গে বিনিয়োগের নিরাপত্তা, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক রিটার্ন নিশ্চিত করা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন এবং নীতিগত সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সহযোগিতায় আয়োজিত এক নাগরিক সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন।

‘ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগে সিটি কর্পোরেশন ও পৌর এলাকায় ছাদসহ বিভিন্ন স্থানে সৌরবিদ্যুৎ উন্নয়ন’ শীর্ষক এ সংলাপে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা, বিনিয়োগের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ, ক্যাবের সভাপতি এ. এইচ. এম. সফিকুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া, ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম. শামসুল আলম, ক্যাবের গবেষণা সমন্বয়ক প্রকৌশলী শুভ কিবরিয়াসহ আরও অনেকে।

অনুষ্ঠানে মূল আলোচনা উপস্থাপন করেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রভাষক প্রকৌশলী শিহাব উদ্দিন।

উপস্থাপিত প্রাক্কলন অনুযায়ী, ৩১টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ৫২ দশমিক ৫০, ১৫০টি কলেজ এলাকায় ৫১ দশমিক ১২, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ২৪ দশমিক ৬৩ এবং শৈলকুপা পৌর এলাকায় ৪ দশমিক ৩৬ মেগাওয়াট-পিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে।

বক্তারা বলেন, ভূমির সীমাবদ্ধতা ও ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদার প্রেক্ষাপটে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ একটি কার্যকর বিকল্প। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি ভবন, বাণিজ্যিক স্থাপনা, হাটবাজার ও উপযুক্ত জলাশয় পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা গেলে নতুন জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন কমিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।

অধ্যাপক এম. শামসুল আলম সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় কমানোর সম্ভাবনা, বিনিয়োগের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা এবং বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন।

উপস্থাপিত মূল্যায়ন অনুযায়ী, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় প্রতি ইউনিট ৪ দশমিক ০৪ টাকা এবং কলেজ এলাকায় ৪ দশমিক ১৫ টাকা। শৈলকুপা পৌর এলাকায় ছাদভিত্তিক ব্যবস্থায় প্রতি ইউনিট উৎপাদন ব্যয় ৪ টাকা এবং ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ৪ দশমিক ৭৫ টাকা। অন্যদিকে, রাজশাহী মহানগরে প্রতি ইউনিট উৎপাদন ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ দশমিক ০৪ টাকা। সবমিলিয়ে গড় উৎপাদন ব্যয় প্রতি ইউনিট প্রায় ৪ দশমিক ১০ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়।

প্রস্তাবিত পরিচালন ব্যয়ভিত্তিক মডেলে বিনিয়োগকারী সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও পরিচালনায় অর্থায়ন করবেন। উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রির মাধ্যমে তিনি বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার পাশাপাশি আয় করার সুযোগ পাবেন। এতে গ্রাহকের শুরুতেই বড় অঙ্কের মূলধন বিনিয়োগের প্রয়োজন কমবে।

প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো থেকে প্রথম বছরে প্রায় ১৯ দশমিক ৩ কোটি ইউনিট এবং ২০ বছরে প্রায় ৩৭০ দশমিক ৩ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। প্রকল্পগুলোর প্রকৌশল, ক্রয় ও নির্মাণ (ইপিসি) ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭৩১ কোটি টাকা। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ৭ টাকা ৫০ পয়সা ধরে ২০ বছরে সম্ভাব্য মোট বিক্রয়মূল্য হতে পারে প্রায় ২ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা।

আলোচনায় বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের নিরাপত্তা, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক রিটার্ন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন, সরকারি সংস্থার কার্যকর সহযোগিতা এবং নির্ধারিত ট্যারিফ ও প্রণোদনার ধারাবাহিকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অধ্যাপক এম. শামসুল আলম নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সম্মিলিত ভূমিকা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। এছাড়া বিনিয়োগকারীদের সমন্বয়ে একটি কমিটি বা টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাবও তুলে ধরা হয়।

বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ বলেন, বিদ্যুৎ খাতের বিদ্যমান ঘাটতি ও আমদানিনির্ভরতা মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ অপরিহার্য।

তিনি জানান, গত ১২ জুলাই মন্ত্রিসভার বৈঠকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি কৌশলপত্র অনুমোদিত হয়েছে। সরকার কর-সুবিধা, প্রণোদনা এবং অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। গত চার মাসে এ খাতে ৮ হাজার ৩৩৬ জন নতুন বিনিয়োগকারী যুক্ত হয়েছেন বলেও জানান তিনি।

আলোচনায় ২০২৭ সালের মধ্যে গ্রিড বিদ্যুতের চাহিদা ২০ শতাংশ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য তুলে ধরা হয়। প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে প্রথম বছরে প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার ৫০২ টন এবং ২০ বছরে প্রায় ২৩ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন এড়ানো সম্ভব হবে।

স্থানীয় পর্যায়ে সৌরবিদ্যুতের বিস্তার এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোকে প্রশিক্ষণ ও সেবা প্রদানের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সোলার শপ অ্যান্ড সার্ভিস সেন্টার’ স্থাপনের প্রস্তাবও তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানে ক্যাব সভাপতি এ. এইচ. এম. সফিকুজ্জামান বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম ও বিদ্যুৎ চুরি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের ব্যবসায়িক মুনাফার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সাধারণ ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এ সময় ক্যাবের জন্য একটি স্বতন্ত্র ভবন ও প্লট বরাদ্দের বিষয়ে সরকারের সহযোগিতা কামনা করা হয়।

/এমএইচএম/জেএইচ/